প্রিয় নগরী ঢাকার জন্য প্রার্থনা

Send
ড. জেবউননেছা
প্রকাশিত : ১৭:০৭, এপ্রিল ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৮, এপ্রিল ৩০, ২০২০

ড. জেবউননেছালকডাউনের দিনগুলোতে ঘুম ভাঙায় পাখিরা। সারাদিন জানালা দিয়ে দেখি শালিক, টুনটুনি, দোয়েল, বুলবুলি এমন আরও অনেক পাখির উড়াউড়ি আর শুনি পাখির সুমধুর গান। শুনেছি ঢাকা শহরে শতক প্রজাতির ওপরে পাখি রয়েছে। এত বছর ধরে ঢাকায় বাস করি একসঙ্গে এত পাখির উড়াউড়ি চোখে পড়েনি। বারান্দার টবে রাখা গাছগুলোও তরতর করে বেড়ে উঠছে। ওদিকে ঢাকা গত ২২ মার্চ এয়ার ভিজ্যুয়াল-এর বায়ুমান সূচকে ১৮ নম্বরে এসেছে, যেখানে গত ছয় মাস ধরে প্রথম স্থানে ছিল ঢাকা। কারণ একটিই, ঢাকায় করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ রয়েছে। যদিও ইটভাটাগুলো চালু আছে।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নগরায়ণ হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, ঢাকায় গত ৪০ বছরে লোকসংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ৫২ লাখ। যেখানে ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আদমশুমারিতে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৬ লাখের মতো। ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হবে। বছরে ঢাকা শহরে নতুন করে ৬ লাখ ১২ হাজার লোক যুক্ত হয়। দিনে যুক্ত হয় ১৭শ’ মানুষ। ঢাকা মহানগরীতে প্রতিবছর ১ লাখ ২০ হাজার বাসগৃহ প্রয়োজন। কিন্তু তার চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ডেভেলপাররা সরবরাহ করতে পারে ২৫ হাজারের মতো। তাও মূলত উচ্চবিত্তের জন্য। ঢাকা শহরে যতটুকু জলাভূমি ছিল, তা গত ৪০ বছরে ৭৫ শতাংশ হারিয়ে গিয়েছে। এসব জলাভূমি ভরাট করে বাড়িঘর স্থাপন করা হয়েছে। যে কারণে ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে। ওদিকে নদ-নদী দখলদারিত্ব করেছে ৪৯ হাজার ১৬২ জন। তার মধ্যে ঢাকার তুরাগ নদ, বুড়িগঙ্গা নদী দখলদারিত্বে প্রায় ধ্বংসের পথে।

নানা প্রতিষ্ঠান ক্লিনিক, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকা তার নান্দনিকতা হারিয়েছে। ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৮টি। সর্বোচ্চ সংখ্যক ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলও ঢাকায় রয়েছে। ঢাকায় কলেজ রয়েছে ২২২টি। মাদ্রাসার ২৮ শতাংশ অর্থাৎ ৩০ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী ঢাকায় পড়াশোনা করে। অথচ ভারতের নয়াদিল্লিতে ১০টি পাবলিক এবং বাকিগুলো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়। তার চেয়ে তিন গুণ বড় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ১৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাতটি বেসরকারি। ঢাকার চেয়ে সাতগুণ বড় জাপানের রাজধানী টোকিওতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৪১টি। ঢাকায় বিভিন্ন কারখানা রয়েছে ১ হাজার ৫৫৫টি ।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৩০৪টি যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৩টি। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী ঢাকায় নিবন্ধিত ৩ লাখ রিকশা চলাচল করে। অথচ ঐতিহ্যবাহী টমটম নামে খ্যাত দূষণমুক্ত ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে প্রায় ৭০ থেকে ৭৩-এর মধ্যে। বিআরটিএ’র হিসাব মতে, সিএনজির সংখ্যা ১৩ হাজার।

অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালে ঢাকার নগরীতে ২.৭৫ লাখ বস্তিবাসী ছিল। ১৯৭৫ সালে জানুয়ারি মাসে রাজধানীর প্রায় ৭৫ হাজার বস্তিবাসীকে ডেমরা, টঙ্গী ও মিরপুরে সরকারি জমিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালে প্রথম ঢাকায় বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ শুরু হয়েছিল। পরে তা আর সফল হয়নি। দিনে দিনে ঢাকা শহরে গড়ে উঠেছে ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তি। ২০১৫ সালের বস্তিশুমারিতে বলা হয়, ঢাকায় বস্তিবাসীর সংখ্যা ১০ লাখ ৬১ হাজার ৬৯৯ জন। জানা যায়, রাজধানী ঢাকার বস্তিতে ৭৫ শতাংশ মানুষ এক কক্ষে বাস করে। এতে করে নানা ধরনের রোগ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। গত এক দশকে নদীভাঙনে ৬৮ লাখ মানুষ গৃহহীন গিয়েছে। ২০১০ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলাতেই ১৩ লাখ ৪২ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছে। এদের মধ্যে একটি বড় অংশ কাজের জন্য রাজধানীতে এসেছে।

ঢাকায় ইটভাটা রয়েছে ৪৮৭টি। ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশ উৎস ইটভাটা থেকে নির্গত হচ্ছে। এ কারণেই ঢাকা শহরে প্রতিবছর ১ হাজার ২৫০টি শিশু মৃত্যুবরণ করে। ইট তৈরিতে ১৮০ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ইটভাটায় প্রায় ৮০ লাখ টন কাঠ ও কয়লা পুড়ছে, যা থেকে পরিবেশে আনুমানিক ২ কোটি টন কার্বন নির্গত হচ্ছে। বায়ুদূষণের ফলে ঢাকার গাছপালায় ৪৩৬ টন ধুলা জমে। সেই হিসাবে প্রতিমাসে ১৩ হাজার টন ধুলা জমে। ঢাকার রাস্তায় ধুলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। এসব ভারী ধাতু মানুষের চুলের চেয়ে ২৫ থেকে ১০০ গুণের বেশি ক্ষুদ্র।

বিশ্বব্যাংক বলছে, দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়, যা মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। জলাভূমি দখল, ক্ষতিকর বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নারী শিশু এবং দরিদ্র মানুষের ক্ষতি হচ্ছে বেশি। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গার্মেন্টস খাত থেকেই ২৮ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়। ঢাকার ৭০০০টি রেস্তোরাঁ এবং ২৩ লাখ ৭৬ হাজার ফ্ল্যাট থেকে প্রতিদিনই প্রায় ৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়।

মাত্রাতিরিক্ত গাড়ি, ধুলো, রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি, ভবন নির্মাণ, শিল্পকারখানা, ইটভাটার ধোয়া বায়ুদূষণের মাত্রা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমতাবস্থায়, বাসাবাড়ি, খেলার মাঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা প্রবেশ করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পরিস্থিতি-২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে। অপরদিকে, স্বাস্থ্যগত প্রভাব সূচকে ৫৪.৮৭ নম্বর পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১২২তম। পানি ও স্যানিটেশনে ১৩১তম স্থানে থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে ২২.৫৬ নম্বর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ সংস্থার জরিপ মতে, ঢাকার বাতাসে সিসাজনিত দূষণ জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কমপক্ষে হাজার গুণ।

বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশে রাজধানীর ছয়টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ২৪.৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ফুসফুসের সক্ষমতা কমছে। নরওয়েভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতর গবেষণা করে দেখেছে, বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ, রাস্তার ধুলাবালি, মাটি দূষণ ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস ৬ শতাংশ দায়ী। এমতাবস্থায়, দেশের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমায় ভুগছে, ৭৫ লাখ মানুষ ব্রংকাইটিস এবং সিওপিডিতে আক্রান্ত। আর তার প্রধান কারণ দূষণ। শুধু কি তাই, ঢাকার বাতাসে শীত মৌসুমে ক্ষতিকর বস্তুকণা ৪০৩ পিপিএম। যেখানে ৩০১-৫০০ এর মধ্যে পিপিএম থাকলে পরিবেশকে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বলা হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি নগরবাসীর জন্য ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত জায়গা প্রয়োজন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় ২১.৫৭ শতাংশ উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে। যার মধ্যে ০.৮৯ শতাংশ পার্ক, নগরের গাছপালা ০.০২ শতাংশ, বাগান ০.৯ শতাংশ, কৃষি ১২.১২ শতাংশ। ঢাকা কাঠামো পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্মুক্ত জায়গা থাকার কথা ২০ শতাংশ। কিন্তু পার্ক, গাছপালাসহ আছে ১৫ শতাংশের কম। ঢাকা মেট্রোপলিটন উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেখা যায়, পুরাতন ঢাকায় ৫ শতাংশ এবং নতুন ঢাকায় ১২ শতাংশ উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে। যেখানে রাস্তা, ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ, খাল এবং পুকুর রয়েছে ১৭-১৮ শতাংশ। যে পরিমাণে রাজধানীতে মানুষ বাড়ছে, সে পরিমাণ যদি উন্মুক্ত জায়গা, গাছপালা বৃদ্ধি না করা হয়, তাহলে পরিবেশ এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্য সমস্যা হুমকির মুখে পড়বে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় জনসংখ্যার পরিমাণ ১ কোটি ৮৮ লাখ ৯৮ হাজার। উত্তর-দক্ষিণে দুইটি সিটি করপোরেশন। দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে উত্তরে আছে পার্ক ২৮টি, খেলার মাঠ ১৫টি। দক্ষিণে পার্ক ২৭টি, খেলার মাঠ ৯টি। কিন্তু সব মাঠ আর পার্ক ব্যবহারের উপযোগী নয়। মাঠে বা পার্কে পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস ও গাছ নেই।

এত কিছুর পরেও আশা জাগায় সরকারের ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ বা ‘গ্রাম হবে শহর’ কর্মসূচি। অর্থাৎ নগরের সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রামেই পাওয়া যাবে। জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা-১৯৯৩, ২০০৮ ও পুনঃঅনুমোদিত নীতিমালা ২০১৬-তে দেশের সকল মানুষের জন্য মানসম্মত গৃহ বা আবাসন আয়োজনের সুপারিশ রয়েছে। ঢাকা শহরের জন্য সংশোধিত পরিবহন কৌশল পরিকল্পনা (২০১৬-৩৫)-এর মাধ্যমে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ চলছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০,‘সবার জন্য আশ্রয়’ ‘কাউকে পিছনে ফেলে নয়’ এই আহ্বানে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষি অঞ্চল, বনাঞ্চল, উন্মুক্ত জায়গা, ভারী এবং দূষণকারী এলাকাসহ শিশুদের কথা বিবেচনা রেখে ১,৫২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদে পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। তবে এর বাস্তবায়নে রয়েছে ধীরগতি। ঢাকার উন্নয়নে সরকারের ভিশন-২০২১, ভিশন-২০৪১ ও শতবর্ষের ডেল্টা প্ল্যান নিয়ে কাজ চলেছে। রাজধানীর ওপর চাপ কমানোর জন্য দেশে ১০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোনে শ্রমজীবী মানুষের আবাসনের কাজ চলছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরে যাওয়ায় ৬০ একর জায়গা ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাজউক। ২০২৫ সালের মধ্যে ভবন নির্মাণে ঢালাই ইট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অপরদিকে, ভূমি পুনঃউন্নয়নের বিষয়টি ব্যবহার করে জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়ার অনেক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ঢেলে সাজানো হয়েছে। ভারত আগামী ২০২২ সাল নাগাদ গ্রামাঞ্চলে তিন কোটি বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।

রাজধানী ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে হলে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বিভিন্ন কারখানা থেকে অবিরাম পরিবেশ বিনষ্টকারী কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাস বিস্তার রোধ করা দরকার। কঠিন বর্জ্য-আবর্জনা জনমানব শূন্য এলাকায় পোড়ানো, চামড়া শিল্প, রংয়ের কারখানা, রাসায়নিক গবেষণাগার, কয়লা-পেট্রোল-কেরোসিনের কারখানা, ছোটবড় অটোমোবাইল, স্প্রে পেইন্টিং এবং ওয়েল্ডিং, কারখানা, পয়ঃশোধনাগার জনমানবহীন স্থানে স্থাপন করতে হবে। ইটভাটাগুলোকে ১২০ ফুটের বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট করে গড়ে তোলা, ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ইটভাটায় কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে নজরদারির ব্যবস্থা করা, যানবাহনে সিসামুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা, পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করা, নদীর তীরে শিল্পকারখানা নির্মাণ বন্ধ করা, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবহার করা, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা, বন উজাড় রোধ করা, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পকারখানা স্থাপন করা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করা, মাটি দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণে ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রাম পর্যায়ে ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো, অবকাঠামোর উন্নয়ন, সর্বক্ষেত্রে গভর্ন্যান্সের উন্নয়ন, দরিদ্রদের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গ্রামে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে শহরের ভাসমান মানুষগুলো গ্রামে ফিরে যেতে পারে। গ্রামে চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থার মানউন্নয়ন করা। প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা, সেক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, জাতীয় পরিবেশ নীতির সফল বাস্তবায়ন করা, সর্বোপরি, পরিবেশ সুরক্ষার কাজে যারা নিয়োজিত তাদের স্বচ্ছ, জবাবদিহিসম্পন্ন এবং দায়িত্বশীল হিসেবে কাজ করার মানসিকতা বাড়ানোর মাধ্যমে আইসিইউতে থাকা রাজধানী ঢাকা বেঁচে থাকতে পারে।

লকডাউনে থাকা বর্তমানের রাজধানীর পরিবেশ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর কর্মপন্থা নির্ধারণের মোক্ষম সময় এখনই। নাহলে ঐতিহ্যের এই নগরী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুখী স্বাস্থ্যসম্মত রাজধানী এবং বাংলাদেশ উপহার প্রদান করার জন্য আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে, এই হোক করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের অঙ্গীকার। শিল্প নগরী প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জে আমার জন্ম হয়েছিল, ইটকাঠে বড় হওয়া এখন আমিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, জীবনের শেষ সময়টা সবুজে বাস করব, গ্রামে চলে যাবো। গ্রামেই মুক্তি, সবুজেই তৃপ্তি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদেরও পরামর্শ প্রদান করে থাকি, তাদের জীবনটাকে যেন গ্রামে গড়ে তোলে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে—গ্রাম নগর বৈষম্য কমাতে হবে, ‘গ্রাম হবে শহর’। গ্রামের লোকদের পেছনে ফেলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বাসযোগ্য হবে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শহর এবং মসজিদের শহর ঢাকা। হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরে পাক এই প্রাচীন প্রিয় নগরী, এই প্রার্থনাই করে যাচ্ছি দিনমান।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, লোক প্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ