প্লিজ বন্ধ করুন এই ভয়াবহতা

Send
রাশেক রহমান
প্রকাশিত : ১৬:১৩, মে ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৯, মে ০৭, ২০২০

রাশেক রহমানখবরটা আমার কাছে অনেকটা আকাশ থেকে পড়ার মতো ছিল। রবিবার দুপুর থেকেই পাচ্ছিলাম। নিশ্চিত হলাম ওই দিনের বিভিন্ন টেলিভিশন এবং পরদিনের পত্রিকায়। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে একদিনেই ঘরে ফিরেছেন ৮৮৬ জন। ঠিক একদিন আগেই সংখ্যাটি ছিল ১৭৭। এই সংখ্যার ওপর শুরু থেকেই নজর রাখছিলাম বলেই খটকা লাগলো। যদিও তথ্যটা বিশ্বাস করতে পারলে খুশিই হতাম।
এই খবর পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আক্রান্তের হার এবং সেরে ওঠার হার নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্নই ছিলাম। খুবই মনে হচ্ছিল, যে পরিমাণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন সেই পরিমাণ সেরে উঠছেন না। সেই ক্ষেত্রে এই খবরটি আমার কাছে উদযাপন করার মতো হওয়ার কথা ছিল। তাই বলে সেটা ১৭৭ থেকে ১০৩৬? একে তো লম্ফ বলতে হবে। তাই খটকা কাটাতে কিছু খোঁজ-খবর নিলাম। যেসব তথ্য পেলাম, সবই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি বলবো, একটা ঘোর বিপর্যয়ের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে গোটা জাতির।

এরই মধ্যে গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কাদের সুস্থ বলা হবে সে ব্যাপারে নতুন একটি গাইড লাইন তৈরি করেছে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেই আলোকেই সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরাদের তালিকা এত দীর্ঘ হলো। যদিও কী আছে সেই গাইড লাইনে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি প্রেস ব্রিফিংয়ে। তবে সাংবাদিকরা স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জনিয়েছেন, পর পর তিন দিন কোনও রোগীর করোনা লক্ষণ দেখা না গেলে এখন থেকে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে দেবে।

পাঠক চলুন দেখে আসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কখন একজন করোনা আক্রান্তকে সুস্থ বলছে। তাদের হিসাবে, কোনও করোনা আক্রান্তকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তাকে কমপক্ষে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এই সময়ে তার লক্ষণ দেখা দিতে পারে আবার নাও পারে। এরমধ্যে পর পর দুইবারের পরীক্ষায় তিনি নেগেটিভ হলেই কেবল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে পারেন। কিন্তু তার পরেও তিনি যেন অন্যদের মধ্যে করোনা না ছড়াতে পারেন সে জন্যে ১৪ দিনের সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকবেন। পরে আরেক দফা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবেন তিনি করোনা আক্রান্ত নন। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার বিভিন্ন টেলিকনফারেন্স এবং প্রেস কনফারেন্সে বলছেন বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মেনে চলছে। আমরাও এতদিন করোনা ফেরত ১৭৭ জনের ক্ষেত্রেও তা-ই দেখলাম। কিন্তু কেন এই অযাচিত গাইডলাইন? কে এটা দিলো? কেন দিলো? এসবের ন্যূনতম যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। যা পেয়েছি, একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করছি এসবই অপব্যাখ্যা।

প্রিয় পাঠক, যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদফতর সুস্থ হওয়ার গাইডলাইন বদল করার কারণ ব্যাখ্যা করেননি তাই আলোচনার সুবিধার জন্যে আমরা এর সম্ভাব্য একটি কারণ চিহ্নিত করতে পারি। সেটি হতে পারে, প্রতিদিন যে পরিমাণ রোগী শনাক্ত হচ্ছে, তাদের চিকিৎসার জায়গা দেওয়ার সংকট সংক্রান্ত। চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট তো আছেই। সুতরাং যত দ্রুত রোগীর শয্যা খালি করা যাবে তত দ্রুত আরেকজনের চিকিৎসা শুরু করা যাবে।

এটি যে সংকট নয় কোনোভাবেই আমি তা বলছি না। আমার বক্তব্য হচ্ছে, সেই সংকটের সমাধান রোগীদের এভাবে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া নয়। এই অমানবিক আচরণ কোনও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র করতে পারে না। সমস্যা কাটিয়ে ওঠা দেখানোর এই জোড়াতালি প্রক্রিয়ায় গিয়ে লাভ নেই। এতে ওয়াল্ডোমিটারে সুস্থতার তালিকা বাড়নো যেতে পারে, কিন্তু পরে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার যে আশঙ্কা, সেটা কোনোভাবেই দূর হবে না। যেখানে সংকট আছে, সেখানে সমাধানের পথও খোলা থাকে। তাই আমি মনে করি, চিকিৎসার সক্ষমতা অর্জন করাই সেই সমাধানের পথ। 

এই মুহূর্তে আমার ৮০’র  দশকে ম্যাশ (MASH) বা Mobile Army Surgical Hospital নামে একটি তথ্যচিত্রের কথা মনে পড়ছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রচার করেছিল সেই চিত্র। সেখানে আমরা দেখেছিলাম অবিশাস্য দ্রুততায় কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি হয়। দীর্ঘদিন পর আমরা সেটারই অনুশীলন দেখলাম চীনের উহানে। অথচ আমরা কেন সেই পথে এখনও হাঁটছি না। আমাদের প্রতিটি জেলায় সুরক্ষিত স্টেডিয়াম আছে। দেশে দক্ষ চিকিৎসক আছেন। আছে সুরক্ষিত সামরিক বাহিনী। পাশাপাশি প্রত্যেকটা বাহিনীর মেডিকেল কোর তো আছেই। সুতরাং প্রতিটি স্টেডিয়াম এক সপ্তাহের ব্যবধানে হয়ে উঠতে পারে একটি কার্যকর ফিল্ড হাসপাতাল।

আমার ব্যক্তিগত মত, এখন পর্যন্ত করোনায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি দেশ।

লেখক: রাজনীতিবিদ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ