করোনার পিক-টাইম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:০২, মে ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৫, মে ০৮, ২০২০

সালেক উদ্দিনসামনে ঈদুল ফিতর। এ সময় দেশব্যাপী মুসলমান সম্প্রদায়ের নতুন পোশাক পরিচ্ছদ কেনার যেমন ধুম পড়ে তেমনই ব্যবসায়ীদের জন্য বছরের অন্যতম উপার্জন সময়ও এটি। সম্ভবত এসব বিবেচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০ মে থেকে দেশের  হাটবাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট ও শপিং মল খুলে দিচ্ছে। তবে শর্ত দেওয়া হয়েছে দোকানপাট ও শপিং মল সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে, কেনাবেচার সময় পারস্পরিক শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে, মলে প্রবেশের সময় হাত ধোয়ো, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে, শপিং মলে আগত যানবাহন জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যা লকডাউনের মধ্যেও সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনী নামিয়েও কাঁচাবাজারসহ খোলা থাকা জায়গায় পরিপালন করা সম্ভব হয়নি।
গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর চীন, ইতালি, আমেরিকা, স্পেনসহ পৃথিবীর নানা দেশে এর ভয়াবহ সংক্রমণ ও করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার মানুষের অসহায় মৃত্যু লক্ষ করে দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এলাকাভিত্তিক লকডাউন ঘোষণা করা হয়। বলতেই হবে এটা ছিল সরকারের যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। ২৬ মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকারি বেসরকারি অফিসের ছুটির মেয়াদ দফায় দফায় ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই সময়ে এমন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

করোনা সংক্রমণের পূর্বাভাস সম্পর্কে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন বাংলাদেশে মে মাসে এই সংক্রমণ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তার কিছুটা নমুনাও আমরা দেখতে পাচ্ছি।

এই প্রতিবেদনটি যখন লিখছি তখন সরকারি হিসাবে দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৭১৯ জন। ৮ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত  পৌনে ২ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪১৬। আর এরপরে মাত্র ১০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৬ হাজার ৩০৩ জন। শুধু তা-ই নয়, সরকারি হিসেবেই বর্তমানে প্রতিদিন যে ৪/৫ হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে তাতে ৬-৭শ’ নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিদিনে এই সংখ্যা ১ থেকে ২ হাজারে বর্ধিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

কথাগুলো উল্লেখ করছি এ কারণেই যে এ দেশে করোনা সংকটের সম্ভাব্য চরম সময় মে মাসেই রোজা ও ঈদ উপলক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট, শপিং মল খুলে দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীন, ইতালি, আমেরিকা, স্পেনসহ পৃথিবীর নানা দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল লক্ষ করে গত ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এর আগে এই ছুটি ৫ দফা বাড়ানো হয়েছে। এবার ষষ্ঠ দফায় ১৬ মে পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো রয়েছে।

সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ বাহিনী নামিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছিল। হাসপাতাল, কাঁচাবাজার ইত্যাদি অত্যাবশ্যক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অফিস আদালত, শপিং মল থেকে শুরু করে প্রায় সব বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে অনেকটা কাজও হয়েছে।

এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও জনসমাগম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। মসজিদে শুধু ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মসজিদের কর্মচারী ছাড়া সাধারণ মানুষের জামাতে নামাজ পড়ার অনুমতি ছিল না। শুক্রবারে জুমার নামাজেও একই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পবিত্র রমজানে তারাবিহ নামাজে রোজাদাররা যেতে চাইলেও পারছিলেন না অথবা যাচ্ছিলেন না। জাতীয় দুর্যোগের এমন মুহূর্তে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ মেনে নিয়েছিলেন এই কারণে, তারা করোনা সংকটের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে অনেক। ধারণা করা যায়, শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যা যদি দিনে ৫০ হাজার হতো তবে আক্রান্তের সংখ্যাও হতো ৮ থেকে ১০ হাজার। তবে নমুনা পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার জন্য আমরা করোনা রোগীর সংখ্যা সঠিক নির্ণয় করতে যে পারছি না তা অস্বীকার করা যাবে না। দেশে বর্তমানে রোগীর যে সংখ্যা আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতপক্ষে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

মানুষের জীবন রক্ষা এবং দেশে অর্থনীতির কথা দুটোই সরকারকে ভাবতে হয়। তবে আমাদের দেখতে হবে কোনটার গুরুত্ব কতটুকু। জীবন বেঁচে থাকলে এবং উন্নয়নের সঠিক পলিসি থাকলে একটি দেশের অর্থনীতিতে সাময়িক যে বিপর্যয় ঘটে তা কাটিয়ে ওঠা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বর্তমান সরকারের গৃহীত উন্নয়ন পদক্ষেপগুলোর ওপর চোখ রাখলেই তার প্রমাণ মেলে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা করেই হোক আর মানুষের ঈদ উৎসবের কেনাকাটার কথা বিবেচনা করেই হোক, এ দেশে করোনার চূড়ান্ত মৌসুমে  হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট, শপিং মল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেখানে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাওয়াই অনিশ্চিত সেখানে ঈদের কেনাকাটার যুক্তি হাস্যকর ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

বিষয়টি দেশের মানুষ সহজভাবে নেয়নি, যার প্রতিফলন এসেছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব মাধ্যমে যে কথাগুলো ঘুরেফিরে এসেছে তা হলো, জনসমাবেশ থেকে করোনা যে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দিল্লি ও মালয়েশিয়ায় তাবলিগ জামাতের জনসমাগমে, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রার্থনা সভা থেকে, লন্ডনের একটি মন্দিরের জনসমাবেশ থেকে করোনার বিস্তার লাভের কাহিনি এই ক’দিন আগের ঘটনা। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের দেশে যখন করোনার প্রকোপ দেখা দিলো তখন আমরা মসজিদে ওয়াক্তের জামাতে জনসমাগম, জুমার নামাজের জনসমাগম, তারাবিহ নামাজের জনসমাগম অর্থাৎ সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জনসমাগম বন্ধ করে দিলাম।

ধর্মপ্রাণ মানুষ যেখানে মসজিদে ওয়াক্তের জামায়াতের নামাজে, জুমার নামাজে, তারাবিহ নামাজে মসজিদে যেতে পারছেন না। পূজা পার্বণে মন্দিরে জনসমাবেশ সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল অবলম্বনও যেখানে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, সেখানে রোজার ঈদের কেনাকাটার জন্য শপিং মলগুলো খুলে দিয়ে কীভাবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে কেনাকাটা সম্ভব হবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভাবছে? তারা কি দেখেনি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার লকডাউনের বাইরে রেখে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কোনোক্রমেই সম্ভব হচ্ছে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দোকানপাট, শপিং মল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর ধর্ম মন্ত্রণালয় মসজিদে ওয়াক্তে জামাতে নামাজ পড়ার,  জুমার নামাজ আদায় করার, তারাবিহ নামাজের জামাত করার অনুমতি দিলো। এটিও একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

ভাবতে ভয় লাগছে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা যেখানে মে মাসকে বাংলাদেশে করোনা সংকটের সম্ভাব্য চরম সময় বলছে, অথচ সেই মাসেই হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট, শপিং মল খুলে দিয়ে, মসজিদে জামাতের অনুমতি দেওয়া হলো। বলার অপেক্ষা রাখে না এতে সর্বস্তরে জনসমাগম বহুলাংশে বেড়ে যাবে। দেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত করোনার পিক-টাইমে আলোচিত সিদ্ধান্ত দুটি পুনর্বিবেচনা করা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ