আমরা সবাই করোনা পজিটিভ!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৮:০৮, মে ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১১, মে ১২, ২০২০

প্রভাষ আমিনকয়েকদিন আগে একজন ফোন করে বললেন, দাদা আমার জ্বর, গলা ব্যথা, গায়ে ব্যথা। সব করোনার লক্ষণ। তাই আমি বললাম, তাহলে টেস্ট করান। তিনিও টেস্ট করাতে চান। কিন্তু তার অনেক সংশয়। প্রথম কথা হলো, তিনি কোনও হাসপাতালে গিয়ে টেস্ট করাতে চান না। তার ভয়, হাসপাতালের যে পরিবেশ। আর সেখানে সারাক্ষণ করোনা রোগীর আনাগোনা। তাতে করোনা না থাকলেও হাসপাতালে টেস্ট করতে যাওয়া বা আসার পথে তিনি করোনা সংক্রমিত হতে পারেন। আমি বললাম, তাহলে আইইডিসিআর-এ ফোন করে বলুন, যাতে তারা বাসায় এসে নমুনা সংগ্রহ করেন। তাতেও তার ঘোরতর আপত্তি। তার যুক্তি হলো, দাদা আইইডিসিআর-এর অ্যাম্বুলেন্স যদি বাসায় আসে, তাদের পিপিই পরা টেকনোলজিস্টরা বাসায় আসা-যাওয়া করলে পুরো এলাকায় জানাজানি হয়ে যাবে। সবাই ধরে নেবে আমি করোনা রোগী। দুদিন পর যদি রিপোর্ট নেগেটিভও আসে, তাও মানুষকে বিশ্বাস করানো যাবে না। সবাই করোনা রোগী ধরে নিয়ে আমাদের সমাজবিচ্ছিন্ন করে দেবে। এমনকি বাসায় থাকতেও সমস্যা হতে পারে। তার সমস্যা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। সমস্যাগুলো যৌক্তিক। কিন্তু এই সমস্যার কী সমাধান। শেষ পর্যন্ত তিনি দ্বিধা দূর করতে পারেননি, টেস্টও করা হয়নি। যদিও বাসায় থেকে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খেয়ে তিনি ভালো হয়ে গেছেন। তবে লক্ষণ দেখে আ‌মার মনে হয়েছে তিনি হয়তো করোনা সংক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। এমন আরও কত লোক শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছেন, আমরা কি জানি?

সেই ভদ্রলোক কিন্তু সৌভাগ্যবান। টেস্ট না করিয়ে বাসায় থেকেই সুস্থ হয়ে যেতে পেরেছেন। কিন্তু সব দ্বিধা ঝেড়ে তিনি যদি সত্যি টেস্ট করতে চাইতেন, তাহলে তার কী হতো? করোনা পাওয়া যেতো কিনা জানি না, তবে হয়রানি আর মানসিক চাপে তিনি আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যেতে পারতেন। এখন তো আইইডিসিআর বাসায় গিয়ে স্যাম্পল সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তিনি যখন অসুস্থ ছিলেন, তখনও সেই সুবিধা ছিল। কিন্তু আইইডিসিআর-এর হটলাইনে ফোন পাওয়া, তাদের দীর্ঘ ইন্টারভিউ শেষে টেস্টের জন্য যোগ্য বিবেচিত হওয়া আর আমেরিকার ভিসা পাওয়া নাকি সমান কষ্টকর ছিল। শুরুর দিকে প্রশ্ন থাকতো, আপনি কি বিদেশ থেকে এসেছেন? বা আপনার কোনও আত্মীয় বিদেশ থেকে এসেছেন, যার সাথে আপনার দেখা হয়েছে? লক্ষণ যাই হোক, এই দুই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হলে কেউ টেস্টের যোগ্য হতেন না। পরে বিদেশের বিষয়টি শিথিল হলেও ইন্টারভিউ আরও কড়া হয়। আইইডিসিআর-এর প্রাথমিক ইন্টারভিউয়ে টেস্ট করার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, এমন অনেকে দুদিন পর টেস্টে পজিটিভ হয়েছেন। আইইডিসিআর-এর ইন্টারভিউতে তো যোগ্য হলেন, এবার টেস্টের জন্য অপেক্ষা। যথেষ্ট অসুস্থ হয়ে, লক্ষণ নিয়ে আইইডিসিআর-এর সাক্ষাৎকারে যোগ্য হওয়ার পর তিন থেকে চারদিন লাগতো সিরিয়াল পেতে।

আমার পরিচিত একজনের সিরিয়াল আসতে আসতে তিনি আইসিইউতে চলে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছিলেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর পর তিনদিন চেষ্টা করেও করোনা টেস্ট করাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কারণ না জেনেই তাকে মরতে হয়েছে। অবশ্য সিটি করপোরেশন নানামুখী চেষ্টায় মৃত্যুর পর তাকে পজিটিভ প্রমাণ করতে পেরেছিল। আইইডিসিআর-এর হটলাইনে সংযোগ পাওয়া আর করোনা টেস্ট করতে চাওয়া নিয়ে কত যে হয়রানির গল্প আছে, তার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। গত সপ্তাহে এক প্রভাবশালী প্রকাশক ফোন করলেন। জানালেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের তদবিরে আইইডিসিআরে তার বোন এবং ভগ্নিপতির টেস্ট করাতে পেরেছেন। কিন্তু ছয়দিন পরও রিপোর্ট পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা করে রিপোর্ট পাওয়া গেল। কিন্তু সেই রিপোর্ট তারা বিশ্বাস করেননি। তাদের ধারণা, এই ছয় দিনে স্যাম্পল নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ, তাদের শঙ্কা ছিল ভগ্নিপতি বাইরে যান, তাই তার করোনা হতে পারে, সেখান থেকে বোনের হলেও হতে পারে। রিপোর্ট এসেছে বোন পজিটিভ, ভগ্নিপতি নেগেটিভ। রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল আরও। সিটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা পরপর দুইবার নেগেটিভ হলেও মৃত্যুর পর জানা গেল তিনি আসলে করোনা পজিটিভ ছিলেন। তখন জানা গেল আইইডিসিআর-এর অধিকাংশ কর্মী আক্রান্ত। তখনও তাদের কাছে ৮০০ স্যাম্পল জমে আছে টেস্টের অপেক্ষায়। এই জমে থাকা ৮০০ স্যাম্পলের সবক’টি টেস্ট সঠিক নাও হতে পারে।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান প্রদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে আর বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ মার্চ। আমরা অনেক ভাগ্যবান যে করোনা মোকাবিলার জন্য প্রায় আড়াই মাস সময় পেয়েছিলাম। কিন্তু এই অতি মূল্যবান আড়াইটি মাস সময় আমরা কোনও কাজেই লাগাইনি, ব্যয় করেছি ‘চাপাবাজিতে’। মুফতে পাওয়া ভাগ্যকে আমরা পায়ে ঠেলেছি। আইইডিসিআর নিয়মিত আমাদের ‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’র গল্প শুনিয়েছে। অথচ করোনা লড়াইয়ের অতি প্রাথমিক অস্ত্র টেস্টিং কিট আমাদের প্রায় ছিলই না। ১৮ কোটি মানুষের দেশে দুই হাজার কিট থাকা না থাকা সমান কথা। কিট সংকটের কারণেই টেস্ট করার সুযোগকে লটারি বানিয়ে রেখেছিল আইইডিসিআর। আর সেটা তারা এমনভাবে যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছিল, যেন টেস্ট ছড়িয়ে দিলে করোনাও ছড়িয়ে যাবে। আর আইইডিসিআর এমনভাবে সবাইকে বোঝাচ্ছিল, করোনার পিসিআর টেস্ট যেন জটিল কিছু, হাতছাড়া করা যাবে না। সবই মানলাম, কিন্তু আড়াই মাস সময়ে আপনারা করোনা টেস্টের জন্য পর্যাপ্ত কিট সংগ্রহ করেননি কেন? করোনার ঢেউ যে আসছে, সেটা তো আপনারা জানতেন, তাহলে বসে থাকলেন কেন? আইইডিসিআর-এর আন্তরিকতা নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাদের দক্ষতা, চেষ্টা নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে। তাদের সামর্থ্য হলো সিএনজিচালিত তিন চাকার বাহনের, কিন্তু তাতে তারা ইঞ্জিন লাগাতে চেয়েছে ২০ টনি লরির। তাদের সামর্থ্য হাজারের, দায়িত্ব নিয়ে বসে আছে ১৮ কোটির। তাতে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। পুরো আইইডিসিআরই এখন আক্রান্তপ্রায়। আইইডিসিআর গবেষণার কাজটা করে, মাঠপর্যায়ের কাজটা শুরু থেকে ছেড়ে দিলেই পারতো। বাধ্য হয়ে যখন ছেড়েছে, করোনার দৈত্য ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। আইইডিসিআর যদি সারা দেশ নয়, শুধু বিমানবন্দরটা ভালো করে মনিটর করতো, তাহলে জাতিকে আজ এত চড়ামূল্য দিতে হতো না। আক্রান্ত দেশ থেকে যারা এসেছেন, তাদের সবার করোনা টেস্ট করা বা যথাযথ কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করতে পারলে আজ গোটা জাতিকে লকডাউনে থাকতে হতো না।

রবীন্দ্রনাথের জুতা আবিষ্কারের গল্পটা জানলে শুধু বিমানবন্দরে কঠোর হলেই গোটা দেশ তছনছ করতে হতো না। বিমানবন্দরেই আমরা করোনার দৈত্যটাকে বোতল থেকে ছেড়ে দিয়েছি। এখন দেশজুড়ে সেই দৈত্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু দৈত্যকে বোতল থেকে ছাড়া যত সহজ বোতলে ঢোকানো ততটাই কঠিন।

একপর্যায়ে আইইডিসিআর করোনা টেস্টের কর্তৃত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু যখন ছেড়েছে, ততদিনে করোনার আতঙ্কও ছড়িয়ে গেছে দেশজুড়ে। তাই টেস্টের বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সঙ্গে হয়রানিরও বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে। ৩/৪ দিন আগে এক সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার ফোন করে বললেন, তার একটু জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা আছে। করোনার টেস্ট করাতে চান। তাকে আশ্বস্ত করে আমি আমাদের রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি জানালেন, ওনাকে সকাল ১০টায় মুগদা হাসপাতালে যেতে বলেন। আমি সেই ক্রিকেটারের সঙ্গে রিপোর্টারের যোগাযোগ করিয়ে দিলাম। পরদিন সকালে তিনি হাসপাতালে গেলেনও। আমি তো ভেবেছি তিনি স্যাম্পল দিয়ে চলে এসেছেন। দুপুরের দিকে সেই ক্রিকেটার ফোন দিলেন, ভাই জ্বর নিয়া দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি। আপনার রিপোর্টার খুব চেষ্টা করছেন, তবে কাজ হবে বলে মনে হয় না। দুই শতাধিক মানুষ লাইনে আছে। লাইন ভাঙার চেষ্টা করলে ক্রিকেটার-রিপোর্টার সবাইকে মার খেতে হবে। আমাদের রিপোর্টার ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে তাকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে আসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিবার ক্লিনিকে প্রতিদিন করোনা টেস্ট করতে আসা মানুষের ভোগান্তির যে চিত্র তা অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়, অসহনীয়। গত সপ্তাহে দেখলাম লাইনে দাঁড়ানো মানুষ দুই দফা বৃষ্টিতে ভিজেছেন। এক লোক জানালেন, তিনি সেহরি খেয়ে ভোর ৪টায় এসেও লাইনের প্রথম হতে পারেননি। তার আগে আরও ৪৬ জন লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার মানে তাদের টেস্ট পর্যন্ত যেতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। তাও লাইনে দাঁড়ানো সবাই টেস্ট করার সুযোগ পান না। প্রতিদিনই দেড় দুইশ’ মানুষকে ফিরে যেতে হয়, পরদিন আরও আগে লাইনে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে। আইইডিসিআর-এ ইন্টারভিউ দিয়ে টেস্ট করাকে যদি আপনার আমেরিকার ভিসা পাওয়ার মতো মনে হয়, তবে বিএসএমএমইউ'র ফিবার ক্লিনিকে ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টেস্ট করার সুযোগ পাওয়াকে তুলনা করতে পারেন কয়েক বছর আগের ইন্ডিয়ান ভিসা পাওয়ার লাইনের সঙ্গে। তবে ভিসার লাইনে দাঁড়ানো সবাই সুস্থ, আর করোনা টেস্টের লাইনে দাঁড়ানো সবাই অসুস্থ। জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, গায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্টের মতো কোনও না কোনও করোনার লক্ষণ দেখা দিলেই মানুষ টেস্ট করতে যায়। কোনও সুস্থ মানুষের টেস্ট করার কোনও সুযোগ নেই। তার মানে অসুস্থ মানুষগুলোকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, দফায় দফায় বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, রোদে পুড়তে হয়। একবার ভাবুন, ১০০ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে কেউ যদি টেস্ট করার লাইনে দাঁড়ায় এবং ৬/৭ ঘণ্টা রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকে; তাহলে তিনি হয়তো বাসায় ফিরবেন ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে। তাছাড়া যারা টেস্ট করতে যান, তারা সবাই সন্দেহভাজন। এখন ৫/৬শ’ সন্দেহভাজন যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই লাইনে থাকে, ধাক্কাধাক্কি করে, তাহলে যারা পজিটিভ তারা তো অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। হতে পারে টেস্ট করতে যাওয়ার সময় আপনি নেগেটিভ, ফেরার সময় আপনি পজিটিভ হয়ে ফিরলেন।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৬০ জন। এই সংখ্যাটা কিন্তু শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির। আমার ধারণা আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি, যারা টেস্ট করার সুবিধার আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডাক্তার, পুলিশ, সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার খবর দেখি, উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু আমার ধারণা, এই তিন পেশায় শনাক্তের সংখ্যা বেশি, কারণ তারা টেস্ট করার ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পান। টেস্ট সুবিধা সহজলভ্য হলে রিকশাওয়ালা, কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ী, গার্মেন্ট শ্রমিক, বিভিন্ন বস্তি বা জেনেভা ক্যাম্পে শনাক্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে এখন পর্যন্ত টেস্ট হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৬৫ জনের, এরমধ্যে শনাক্ত ১৫ হাজার ৬৯১ জন।

আমি একটাই আশার আলো দেখি, টেস্ট করা মানুষের মধ্যে শনাক্ত হওয়ার হার মাত্র ১২ ভাগ। যে ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৬৫ জনের টেস্ট হয়েছে, তাদের সবাই নিশ্চয়ই কোনও না কোনও লক্ষণ নিয়েই টেস্ট করাতে গিয়েছিলেন। তার মানে লক্ষণ আছে, এমন মানুষের মধ্যেও করোনা সংক্রমণের হার মাত্র ১২ শতাংশ। আর শনাক্ত হওয়া ১৫ হাজার ৬৯১ জনের মধ্যে মারা গেছেন ২৩৯ জন, শতকরা দেড় ভাগ। তাই অত ভয় না পেলেও চলবে।

করোনার বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল সর্বব্যাপী টেস্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই বলে আসছিল, টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। কারণ, টেস্টের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই করোনার বিস্তার কমিয়ে রাখা সম্ভব ছিল। অনেক দেশ এভাবে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেও। আমাদের মতো ঘনবসতির দেশে হয়তো এটা পুরোপুরি সম্ভব নয়। তবে আইইডিসিআর শুরু থেকেই ‘নো টেস্ট, নো করোনা’ বা ‘কম টেস্ট, কম করোনা’ লাইনে এগিয়েছে এবং সাফল্যের সঙ্গে করোনাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। টেস্ট সুবিধা আস্তে আস্তে বেড়েছে আর করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।

৫৪ জেলার দেশে এখন ৩৭টি ল্যাবে করোনা টেস্ট হচ্ছে, যার বেশিরভাগ আবার ঢাকায় বা এর আশপাশে। এটা ঠিক, পিসিআর ল্যাব দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে করোনা টেস্টের সুবিধা ছড়িয়ে দিতে হলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আবিষ্কৃত র‌্যাপিড টেস্টিং কিটটি দ্রুত বাজারে আনা দরকার। কিন্তু সরকার যাচাইয়ের অনুমতি দেওয়ার ১০ দিন পরও বিএসএমএমইউ যাচাই শুরুই করেনি। কার গাফিলতির কারণে টেস্টিং কিট যাচাই বিলম্বিত হচ্ছে জানি না। কিন্তু এটা দুর্ভাগ্যজনক। জাতির এই দুঃসময়ে একটা কিটের যাচাই শুরু করতেই ১০ দিন লাগিয়ে দেওয়াটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক। মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ধমক ছাড়া এই গিট্টু খুলবে না। যার সন্দেহ হবে, তিনিই যাতে করোনা টেস্ট করতে পারেন; তা নিশ্চিত করা উচিত।

আগে আমি কোনও লক্ষণ দেখা দিলেই সবাইকে টেস্ট করার পরামর্শ দিতাম। কিন্তু আইইডিসিআর আর বিভিন্ন হাসপাতালে হয়রানির গল্প শুনে ক্লান্ত হতে হতে এখন আতঙ্কিত হয়ে গেছি। এখন আমি আর কাউকে টেস্ট করার কথা বলি না। বরং সাবধান থাকতে বলি। সেদিন একজন টেস্ট করাতে চাইলে আমি তাকে বললাম, টেস্ট করে কী লাভ? আর টেস্ট তো কোনও চিকিৎসা নয়। এটা করলেই আপনি ভালো হয়ে যাবেন না, না করলেও মরে যাবেন না। আমি তাকে বললাম, ধরুন আপনার টেস্ট করে পজিটিভ হলো। তখন আপনি কী করবেন? ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবেন? তিনি বললেন, না, সাবধান থাকবো, বাসায় থাকবো, ওষুধ খাবো, বিচ্ছিন্ন থাকবো। শুনে আমি তাকে বললাম, করোনা পজিটিভ হলে আপনি যা যা করতেন, হয়েছে ধরে নিয়ে তা-ই করতে থাকুন। আর সুযোগ পেলে টেস্ট করিয়ে নেবেন। কিন্তু টেস্ট করাতে গিয়ে নিজেকে আরও অসুস্থ করবেন না।

আসলে আমাদের সবাইকে এখন নিজেদের করোনা পজিটিভ ধরে নিতে হবে, ধরে নিতে হবে আপনার সামনের মানুষটিও করোনা পজিটিভ। সরকার বাধ্য হয়ে আস্তে আস্তে অঘোষিত লকডাউন তুলে নিচ্ছে। করোনা না গেলেও কয়েকদিন পর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন হয়তো টেস্টের বাইরে থাকা শনাক্ত না হওয়া অনেক করোনা পজিটিভ আমাদের আশপাশেই ঘুরে বেড়াবে। তাই আসলে সবাইকে পজিটিভ ধরে নিয়ে আমাদের করোনার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। করোনার স্বাস্থ্যবিধিকে আমাদের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলতে হবে। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মানতে হবে। পরিচ্ছন্ন মাস্ক ও চশমায় ঢেকে রাখতে হবে মুখ, নাক, চোখ। সম্ভব হলে হাত ঢেকে রাখতে হবে বা ঘন ঘন ধুতে হবে। নাকে মুখে বা চোখে হাত লাগানো যাবে না এবং অতি অবশ্যই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সাবধানের মার নেই। নিজেকে রক্ষা করতে হলে আগামী অনেক দিন, সম্ভব হলে সারা জীবন আমাদের সাবধান থাকতে হবে। বদলে ফেলতে হবে লাইফস্টাইল।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ