বিষয়টি ব্যক্তিগত নয়

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৭:৫৭, মে ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৪৮, মে ১৮, ২০২০

রুমিন ফারহানাআমি তখন ঢাকার একটা নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছি। উচ্চবিত্ত, অভিজাত পরিবারের সন্তানেরাই সেখানে পড়ে। তারা আসেন সন্তানদের স্কুলে দিতে, ছুটির পর নিয়ে যেতে আর আসেন প্যারেন্টস ডে’তে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। এক ঝকঝকে তরুণী মা’কে দেখতাম কিছু দিন পরপরই কপালে বা গালে কাটা দাগ কিংবা হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় আসতে। জিজ্ঞেস করলে বলতো বাথরুম বা বারান্দায় পড়ে ব্যথা পেয়েছেন। আমারও বয়স তখন কম, যা বলতো  একবাক্যে বিশ্বাস করতাম, কখনোই সন্দেহ করিনি। শুধু ভাবতাম উনিই কেন কিছু দিন পরপর দুর্ঘটনার শিকার হন? পরে অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি নিয়মিত বিরতিতে তিনি তার স্বামীর নির্যাতনের শিকার। স্বামীকেও আমি দেখেছি, কথাও হয়েছে কয়েকবার। মাল্টিন্যাশনাল একটা কোম্পানিতে উচ্চপদে চাকরি করতেন তিনি। দেখে, এমনকি কথা বলে বোঝার কোন উপায় নেই তিনি এমন কাণ্ড ঘটাতে পারেন। পরে জানতে পারি স্ত্রীও যথেষ্ট শিক্ষিত এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট বিত্তশালী, অভিজাত পরিবারের সন্তান।

আমি তখন সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে আইন পড়তে বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায়। বারবার মনে হতো শিক্ষা, অর্থ, পারিবারিক সামর্থ্য সব থাকার পরও কেন ভদ্র মহিলা এই ধরনের অত্যাচার মেনে নেন? অনেক পরে বুঝেছি সব থাকার পরও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, পারিবারিক আবহ, পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো এবং সর্বোপরি নারী এই বিদ্বেষী সমাজ বাধ্য করে একটি মেয়েকে এ ধরনের অবস্থা মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে। ঘটনাটি বললাম এই কারণে যে, গ্রামের দরিদ্র, স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত পরিবারের অসহায় মেয়েটির বাস্তবতা আর শহুরে, আধুনিক, শিক্ষি্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েটির বাস্তবতায় আদতে কোনও পার্থক্য নেই। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরের কথা। আসলে পারিবারিক সহিংসতা ধর্ম, বর্ণ, জাতি, শিক্ষা, বিত্ত, পারিবারিক অবস্থান কোনও কিছুর ওপরই নির্ভর করেনা। পূর্ব থেকে পশ্চিম পৃথিবীর সব গোলার্ধের গল্পটি একই। 

অতি প্রচলিত কিছু নারীবিদ্বেষী প্রবচন যেমন ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে’, ‘পুড়বে কন্যা উড়বে ছাই, তবে কন্যার গুণ গাই’, ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’, ‘ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার মরে গরু’, ‘পতি বিনে গতি নাই’ হয়তো আগের মতো এখন আর মুখে মুখে শোনা যায় না। কিন্তু যে মানসিকতার হাত ধরে এসব প্রবচনের সৃষ্টি তা কিন্তু বদলায়নি এতটুকু। অস্থি মজ্জায় মিশে যাওয়া এই কথাগুলো আমাদের বুঝতে শেখায় ঘরের কথা ঘরেই থাকতে হয়। স্বামী সময় সময় চোখ রাঙাবে, খোটা দেবে, যতভাবে সম্ভব মানসিকভাবে ভেঙে  স্ত্রী’র আত্মবিশ্বাস চিরতরে নষ্ট করবে, চাই কি ক্ষেত্রবিশেষে দুই চারটা চড় চাপড়ও মারতে পারে। লক্ষ্মী বউ সাত চড়ে রা কাড়ে না। এমন কি তথাকথিত কিছু উচ্চশিক্ষিত পরিবারে আমি এমনটিও বলতে দেখেছি স্বামী রেগে গেলে ‘কিছু শাসন’ করতেই পারে, তাতে কিছু মনে করতে নেই, ছেড়ে আসাতো বহু পরের কথা। ‘কিছু শাসন’-এর পরিধি কতটুকু তা অবশ্য জানতে পারিনি কোনোদিন। তবে দেখেছি যতক্ষণ পর্যন্ত রক্তাক্ত হয়ে প্রতিবেশীর কান পর্যন্ত আওয়াজ না পৌঁছায় ততক্ষণ পর্যন্ত সব শান্ত, সব ঠিক আছে। 

আর তাই সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশে প্রথমবারের মতো নারী নির্যাতন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১১’ নামে একটি জরিপ প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনও না কোনও সময়ে, কোনও না কোনও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ৬৫ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক আর ৫৩ শতাংশ নারী অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করা নারীর ওপর করা সহিংসতা বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সবচেয়ে ব্যাপক রূপ হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা। যেহেতু বহু যুগের পুরনো ধ্যান-ধারণা আজও আমাদের ভাবতে শেখায় যে এই ধরনের সহিংসতা একেবারেই পারিবারিক বিষয়, যা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ থাকা উচিত। কারণ, এর সঙ্গে পরিবারের সম্মান, অসম্মান জড়িত, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলাই করা হয় না। অসংখ্য ঘটনার ভিড়ে যে অল্প কিছু ঘটনায় মামলায় হয় তার প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটি মামলাই আদালতে উত্থাপিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, তারপর শুরু হয় বিচারিক প্রক্রিয়া। এরমধ্যে মাত্র ৩.১ শতাংশ ভুক্তভোগী নিজেদের পক্ষে বিচার পায়, বাকি ৯৬.৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে এই অতি অল্প সংখ্যক মামলার মধ্যেও আদালত মামলা খারিজ করে দেওয়ার বা অপরাধীকে খালাস দেয়ার সম্ভাবনা ৩২ শতাংশ। পারিবারিক সহিংসতার হার এত উচ্চ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের ৭২.২ শতাংশ নারী তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলেন না। মাত্র ২.১ শতাংশ নারী স্থানীয় নেতাদের কাছে অভিযোগ করেন আর মাত্র ১.১ শতাংশ নারী পুলিশের কাছে সাহায্য চান।

এটি যে কেবল বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা-ই নয়; বরং ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মতো অতি উন্নত দেশের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন বলছে, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি চার জন নারীর মধ্যে একজন স্বামীর হাতে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। যে কোনও দুর্যোগে সবার আগে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েন নারী। করোনার এই মহামারিও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশ্ব যখন করোনা মোকাবিলায় যুদ্ধ করছে অবিরাম, ভ্যাক্সিন বা ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টায় লড়ছে, তখন এই পারিবারিক সহিংসতার বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য হয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, এই দুর্যোগের সময় নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা হু হু করে বাড়ছে। যেখানে তাদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা এই সময়ে, সেটি নারীদের জন্য বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলা কৌশলে এটিও যুক্ত করতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

২০২০ সাল বিশ্বের বুকে অন্ধকার নিয়ে এসেছে। জীবন ও জীবিকার অনিশ্চয়তা, ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা মানুষকে ফেলেছে তীব্র মানসিক চাপে। আর এই চাপের প্রথম শিকার হচ্ছেন পরিবারের নারী, শিশু আর বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা। করোনাকালে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও বারবার উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। নতুন ধারার জীবনযাপন যাকে আমরা বলছি নিউ নরমাল, সামাজিক দূরত্ব মানার নতুন অভ্যাস, নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা হিসাবে নতুন সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার, খুব প্রয়োজন ছাড়া সার্বক্ষণিক বাড়িতে থাকা মানুষকে অনেক বেশি ভালনেরেবল করে তুলেছে, যার প্রধান ভিকটিম হচ্ছেন পরিবারের নারী সদস্যরা। যার প্রমাণ মেলে সম্প্রতি করা কয়েকটি বিদেশি গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে কোথাও কভিড-১৯ পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ আবার কোথাও ৫০ শতাংশের মতো পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুধু মার্চ মাসেই বগুড়া, জামালপুর ও কক্সবাজার জেলায় ৬৪টি ধর্ষণ আর ৩ শতাধিক পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নারীশ্রমিক কেন্দ্র পরিচালিত জরিপ থেকে জানা যায়, ৯৪ শতাংশ নারী করোনার এই সময়ে ঘরে অবরুদ্ধ থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবার সকল মনোযোগ এখন করোনা ঘিরে। তাই নিজের ঘরে নারীর নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। ঘরে থাকার এই সময়কে কে কীভাবে কাজে লাগাবে সেটি কিন্তু একেবারেই তার বিবেচনা। লকডাউনে কারও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে আবার কেউবা জড়িয়ে পড়ছেন পারিবারিক সহিংসতায়। করোনা নিয়ে যেমন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করছে বিভিন্ন গণমাধ্যম, তেমনি পারিবারিক সহিংসতা নিয়েও এই ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করা উচিত, উচিত হেল্পলাইনগুলো চালু রাখা। যে নারী ঘর থেকে বের হতে বাধ্য হয়েছে তার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। এই দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের কাঁধেই বর্তায়। বহুল আলোচিত একটি স্লোগান হলো “the personal is political”. যে পারিবারিক সহিংসতাকে আমরা ব্যক্তিগত বলে ভাবছি তা কিন্তু কোনোভাবেই ব্যক্তিগত নয়। এই সহিংসতার আঁচ যেমন লাগে ব্যক্তি, পরিবারের গাঁয়ে, তেমনি এর দায় আসে সমাজ আর রাষ্ট্রের কাঁধেও। এই দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ