সবাই মিলেই নিরাপদ করে তুলি আমাদের বাংলাদেশ

Send
রাশেক রহমান
প্রকাশিত : ১০:৪৩, মে ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩১, মে ২৫, ২০২০

রাশেক রহমানআজ পবিত্র ঈদুল ফিতর। করোনাভাইরাস ও আম্পান ঝড়ের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি হারিয়ে ঈদের আনন্দ হারিয়ে ফেলেছে অসংখ্য মানুষ। তবু সকলকে জানাই ঈদ মোবারক। 
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে। অন্য সবার মতো আমিও ব্যক্তিগতভাবে উদ্বিগ্ন এই বিষয়ে। একদিকে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে আর অন্যদিকে আমরা দেখছি অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মানছেন না, যেটা দুঃখজনক।
তবে সম্প্রতি কিছু বিষয় আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় চীনের অভিজ্ঞ চিকিৎসক দল পাঠানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছে বেইজিং। ২০ মে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে এ বিষয়ে কথা বলেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের জন্য সব ধরনের কাজই করে যাচ্ছেন। আমি মনে করি চীনের এই বিশেষজ্ঞ দলের বাংলাদেশের আসার প্রয়োজনীয়তা আছে। তার মানে কিন্তু এই না যে এখানে আমি মনে করছি বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন না। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির বাস্তবতায় নলেজ শেয়ারিং ও অভিজ্ঞতা শেয়ারিং একটা বিশাল বিষয়।

বাংলাদেশে মহামারি মোকাবিলা করায় সবচেয়ে বড় যে বিষয় তা হলো, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিত প্রটোকলের বাস্তবায়ন। সেটা মোকাবিলা করতে গেলে চীন থেকে এই মহামারি মোকাবিলায় যে বিশেষজ্ঞ দল আসার কথা হচ্ছে তার প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

কারণ, পৃথিবীর যেকোনও দেশেই মহামারি যখন দেখা দেয় তখন সেই দেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি), যা অন্য নামেও পরিচিত হতে পারে, সেই সংস্থাগুলোর অধীনে জনপ্রশাসনসহ অন্যান্য সকল প্রশাসনের প্রয়োজনীয় যে শাখাগুলো সেগুলোর অ্যাকটিভ হওয়া জরুরি। তাতে ব্যক্তির প্রাণ বাঁচানোর জন্য যে প্রটোকলগুলো প্রয়োজন সেগুলো একমুখীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং নির্দেশনা দেওয়া যায়।

এখানে উল্লেখ থাকে যে সংক্রামক ব্যাধি আইনের অধীনে বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা সত্ত্বেও দেখা গেলো যে মসজিদের বিষয়ে নির্দেশনাগুলো আসছিল ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে। একই সঙ্গে গার্মেন্ট বিষয়ক নির্দেশনা আসছিল অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে। সেই ক্ষেত্রে এই মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় কিন্তু পরিলক্ষিত হয়নি। তবে এটা ইচ্ছেকৃত কোনও ভুল বা ক্ষতি করার জন্য, এমনটা আমরা মনে করতে চাই না।

এটা সম্পূর্ণভাবে আমাদের অনভিজ্ঞতার জায়গা থেকে হয়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের মহামারিকে নিকট অতীতে আমরা যেহেতু মোকাবিলা করিনি সুতরাং আমরা আসলে জানি না যে সংক্রামক ব্যাধি আইনের অধীনে কীভাবে সরকারের কোন কোন শাখাগুলো চলে আসে। যদি কোনও শাখা নাও আসে কিন্তু তার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় তবে তাকে অন্তর্ভুক্ত করাও কিন্তু সেই আইনের বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ সংক্রামক ব্যাধি আইন অনুযায়ী যাকে যখন প্রয়োজন রাষ্ট্র চাইলেই তাকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

পূর্বে বিভিন্ন সময়ে আমি মোবাইল আর্মি সার্জিক্যাল হাসপাতাল বা অ্যাডহক ভিত্তিতে হাসপাতাল করার কথা বলেছিলাম। সেক্ষেত্রে আমি বলেছিলাম প্রয়োজন হলে ৬৪ জেলার সব স্টেডিয়ামও ব্যবহার করা যেতে পারে প্রয়োজন সাপেক্ষে। সেই সক্ষমতা আমাদের আছে।

সেই সক্ষমতাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে দিকনির্দেশনা দরকার হয়তো বা চীন থেকে সেই বিশেষজ্ঞ দলে তেমন কেউ থাকবেন। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে সাথে নিয়ে এ ধরনের ফিল্ড হাসপাতাল বিভিন্ন স্থানে করা যেতে পারে। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে যে করোনাভাইরাসের সঙ্গে বহুদিন থাকতে হবে। এটা যে একেবারে কেউ জাদু দিয়ে শেষ করে দিয়ে যাবেন তেমন কোনও বিষয় না। সেক্ষেত্রে আমাদের এটার বিরুদ্ধে যেহেতু মোকাবিলা ও প্রতিরোধ করেই যেতে হবে তাই আমার হাসপাতালে বেডের সংখ্যা যেভাবেই হোক বাড়াতে হবে। সেটা হতে পারে ফিল্ড হাসপাতালের মাধ্যমে অথবা বর্তমানে যে হাসপাতাল ব্যবস্থা আছে তার আওতা বাড়িয়েও।

এক্ষেত্রে চীনের বিশেষজ্ঞ দল যদি আসে তবে তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে দেবে নিশ্চিতভাবে। কারণ তারা কিন্তু ইতোমধ্যেই এটা মোকাবিলা করে বিভিন্ন ধাপে ধাপে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

আরেকটা বিষয় যা উল্লেখ না করলেই নয়। যেহেতু আমরা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন পর্যায়ে আছি তাই আমাদের আসলে টেস্টের সংখ্যাও বাড়ানো- এটা একটা বিবেচ্য বিষয়। রাতারাতি আরটি পিসিআর মেশিনের মাধ্যমে করা ল্যাব সংখ্যা তো বাড়ানো যায় না। তাও সরকার চেষ্টা করেছে ও করে যাচ্ছে ল্যাব সংখ্যা বাড়াতে। এই ক্ষেত্রে টেকনোলজিস্টের সংখ্যাও তো রাতারাতি বাড়ানো যাবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে যদি নির্ভরযোগ্য র‌্যাপিড টেস্ট কিট পাওয়া যায় তবে সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আসলে আরটি পিসিআর টেস্ট বাড়াবে নাকি র‌্যাপিড টেস্ট করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আসলে আমি বিশেষজ্ঞদের ওপরে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আমি মনে করি টেস্ট করা প্রয়োজন ও টেস্টের ফলাফল জানাও প্রয়োজন। ঠিক একই সঙ্গে তিনদিনের মধ্যে করোনামুক্ত বলে ছেড়ে দেওয়ার নতুন যে সংজ্ঞা স্বাস্থ্য অধিদফতর তৈরি করেছেন এটাও যথেষ্ট পরিমাণ টেস্ট না করার মতোই একটি বিপদজনক একটি প্রস্তাব বলে আমি মনে করি। এক্ষেত্রে সেই ভাইরাস নিয়েই মানুষের ছদ্মবেশী সুস্থ হয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। যেভাবে আসলে সেই ব্যক্তিও ক্যারিয়ার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এক্ষেত্রেও কিন্তু চীনের বিশেষজ্ঞ দল আমাদের কিছু গঠনমূলক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন বলে মনে করি।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেক্সিমকোর পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রেমডিসিভির গোত্রের বেমসিভির ওষুধটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে আছে। বাংলাদেশেও খুব দ্রুততার সঙ্গে সবার আগে এই ওষুধ উৎপাদন করে সরকারের পাশে দাঁড়ানোয় আমি ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাই বেক্সিমকো গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান এবং ওনাদের প্রতিষ্ঠানের সবাইকে। সবচেয়ে বড় কথা, ওনারা এই মহামারির সময়ে এই ওষুধ সরকারকে দিচ্ছেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এটা আসলে আমাদের সবার জন্য একটা বিশাল অনুপ্রেরণা।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই সামগ্রিকভাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী শুধু শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবেই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এই বাহিনী মানবিকতার যে উদাহরণ তৈরি করে যাচ্ছেন তাতে আমি আসলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ একজন নাগরিক হিসেবে। বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে পুলিশ বাহিনী। বাংলাদেশ পুলিশের সুদক্ষ, ক্রিয়েটিভ আইজি বেনজীর সাহেবের নেতৃত্বগুণে সাম্প্রতিক সময়ে আরও অনেক গতি পেয়েছে বাহিনীতে। এক্ষেত্রে আমার কাছে আরেকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে আর তাহলো অনেক পুলিশ সদস্যের আক্রান্ত হওয়া। আমি মনে করি, যদি সুযোগ থাকে তাদের জন্যেও অতিদ্রুততার সঙ্গে পিপিই প্রোভাইড করা উচিত। যদিও অনেকে বলতে পারে যে তারা তো আর চিকিৎসক না। তবু তারা যখন আসামিকে ধরে গ্রেফতার করছে, তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময়েও কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। এরপরেও যখন আসামিকে নিয়ে থানায় যাচ্ছে ও আদালতে নিয়ে যাচ্ছে তখনও কিন্তু তারা জনসমাগমের সংস্পর্শে আসছে। তাদের এই জনবান্ধব কর্মকাণ্ডগুলোকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন তাদের সুস্থও থাকা। সেই সুস্থ থাকার জন্য তাদের পিপিই দেওয়া আসলে বড় কিছু না। নতুবা একটা সংকট তৈরি হতে পারে।

পাঠক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোকপাত করার পরে কিছু কথা বলে শেষ করতে চাই। আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর। দেশের অনেকেই নানাভাবে আলোচনা করছেন। অনেকেই বাড়ি যেতে চাইছেন আবার অনেকেই ঘরে থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবার প্রতি সম্মান রেখেই এ বিষয়ে একটা কথা বলতে চাই। আমরা যদি সুস্থভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারি তবে ভবিষ্যতে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে আরও অনেক ঈদ করতে পারবো। বর্তমান অবস্থায় আসলে বাংলাদেশে উপসর্গহীন অনেক কোভিড-১৯ সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আসলে কার মধ্যে সংক্রমণ আছে আর কার মধ্যে নেই তাও বোঝা কষ্টকর। সেক্ষেত্রে যদি উপসর্গ নিয়ে যাওয়া হয় স্বজনদের মাঝে তবে তাদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। আর এক্ষেত্রে আমি আশা করি আমরা সবাই আসলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবার ঈদ পালন করবো। একই সঙ্গে নিরাপদে রাখবো আমাদের পরিবার ও স্বজনদের। এভাবেই আসলে আমাদের সম্মিলিতভাবে লড়াই করে যেতে হবে এই অদৃশ্য শক্তি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে।

সবাই মিলে যদি সচেতন হয়ে উঠি তবে নিশ্চিতভাবে আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো এই সংকট। তাই দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও আহ্বান জানাই একজন নাগরিক হিসেবে। এভাবেই সবাই মিলে আমাদের দেশটাকে আবার নিরাপদ করে গড়ে তুলতে পারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।

লেখক: রাজনীতিবিদ

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ