বিভ্রান্তির লকডাউন!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৮:০৩, জুন ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৪, জুন ১৭, ২০২০

প্রভাষ আমিনগত রবিবার রাতে এক ব্যবসায়ী ফোন করে কণ্ঠে গভীর উদ্বেগ নিয়ে বললেন, ভাই কয়টা থেকে লকডাউন? আমার অফিস তো রেড জোনে, আমি কি অফিস খুলতে পারবো? স্টাফরা কি আসতে পারবে? অনেক দিন পর কিছু কাজকর্ম পেয়েছিলাম। এখন যদি আবার অফিস বন্ধ রাখতে হয় তাহলে তো ধ্বংস হয়ে যাবো। চুপ করে তার উদ্বেগের কথা শুনলাম এবং বললাম, দেশের বিভিন্ন স্থানকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনের কথা ভাবা হচ্ছে বটে, তবে এখনও কোন এলাকা কোন জোনে তা ঘোষণা করা হয়নি। পূর্ব রাজাবাজার ছাড়া আর কোথাও কোনও লকডাউনের ঘোষণা নেই। শুনে তিনি রীতিমতো ক্ষেপে গেলেন, ধুর মিয়া আপনি একটা ‘ভুয়া সাংবাদিক’। সব পত্রিকা, অনলাইন, টিভিতে লকডাউনের ব্রেকিং নিউজ যাচ্ছে। আর আপনি বলছেন লকডাউন নেই। আপনাকে ফোন করাটাই সময় নষ্ট। দেখি কোনও ‘ভালো সাংবাদিকের’ কাছে খবর পাই কিনা। হতাশ হয়ে তিনি ফোন রেখে দিলেন। আমি হতভম্ব হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তবে তার ক্ষোভটা আমি অনুভব করার চেষ্টা করেছি এবং স্বীকার করছি এই বিভ্রান্তির জন্য সরকার যেমন দায়ী, গণমাধ্যমের দায়ও কম নয়। সরকারি ঘোষণার আগেই রেড জোনের তালিকা প্রকাশ করে, লকডাউনের ঘোষণা দিয়ে মানুষকে ব্যাকুল করে তুলেছি আমরাই। শুধু সেই ব্যবসায়ী নয়, গত কয়েকদিনে অসংখ্য ফোন পেয়েছি; কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী; কারও সন্তান অসুস্থ, কারও বাড়ি যাওয়ার তাড়া।

অনেকের অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতূহল, ব্যাপক বিভ্রান্তি। সব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে তো নেই, আমার ধারণা কারও কাছেই নেই। প্রশ্নগুলো একটু শুনুন, দেখুন আপনার কাছে জবাব আছে কিনা। লকডাউন কবে থেকে কার্যকর হবে? কয়দিনের জন্য হবে? লকডাউন মানে কি আগের মতো সাধারণ ছুটি, নাকি পূর্ব রাজাবাজারের মতো জেলখানা? কোন এলাকা কোন জোনে? আমি রেড না ইয়েলো? বাসা রেড জোনে আর অফিস গ্রিন জোনে হলে অফিসে যাবো কীভাবে? এখন তো সবাই অজুহাত খুঁজছে, অফিসে না যেতে পারলে যদি ছাঁটাই করে তার দায়িত্ব কে নেবে? গ্রিন টু গ্রিনের মাঝখানে যদি রেড থাকে তাহলে চলাচল কীভাবে হবে? ধানমন্ডি বা মতিঝিল বা মিরপুর এমন এলাকা যদি রেড জোনে পড়ে, তাহলে কি পুরো এলাকায় লকডাউন হবে?

এ তো গেলো প্রশ্ন। এবার শুনুন ক্ষোভের কথা। এই লকডাউন তো সাধারণ ছুটির সময় করা উচিত ছিল। এখন করোনাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন কতটা কার্যকর হবে। যে ৪৫টি এলাকা রেড জোন হবে বলে শোনা যাচ্ছে, সেগুলোতে লকডাউন দেওয়ার চেয়ে তো পুরো ঢাকাকেই লকডাউনে আনা সহজ। এখন যদি এই কড়া লকডাউন করা যায়, তখন কেন ঢিলেঢালা সাধারণ ছুটি পালন করা হলো। ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতেই নিঃস্ব, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, এমনকি অনেক মধ্যবিত্তেরও সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে; এখন আবার লকডাউন দিলে করোনার আগে তাদের না খেয়ে মরতে হবে। ঢিলেঢালা সাধারণ ছুটিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানুষকে আবার ঘরে ঢুকিয়ে লকডাউনে বাধ্য করা সহজ হবে না বলেই কারও কারও মত। কেউ বললেন, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। কেউ বললেন, টিউব থেকে একবার বেরিয়ে যাওয়া টুথপেস্ট আবার ঢোকানো যায় না। কেউ কেউ গান শুনিয়ে দিলেন, সময় গেলে সাধন হবে না...।

এত প্রশ্ন, এত ক্ষোভ, এত বিভ্রান্তি আমারই মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। আমি একটু ঘটনাক্রম সাজানোর চেষ্টা করি। করোনা প্রথম শনাক্ত হয় গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে। প্রথম মৃত্যুর খবর আসে ১০ জানুয়ারি। বাংলাদেশে প্রথম সংক্রমণের খবর আসে ৮ মার্চ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় ১৭ মার্চ। বাংলাদেশে প্রথম মৃত্যুর খবর আসে ১৮ মার্চ। সারা দেশে সাধারণ ছুটি শুরু হয় ২৬ মার্চ। টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি শেষে সীমিত আকারে অফিস খোলে ৩১ মে। ১ জুন সচিবালয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় দেশকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করা হবে। তারপর থেকে চলছে জোনিং আর ম্যাপিংয়ের কাজ। ৯ জুন থেকে পূর্ব রাজাবাজারে চলছে পরীক্ষামূলক লকডাউন। কিন্তু এই লেখা পর্যন্ত (বুধবার) জোন ভাগ করা বা অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনের কোনও ঘোষণা আসেনি। এরইমধ্যে গত রবিবার মানে ১৪ জুন ছড়িয়ে পড়ে সোমবার থেকেই লকডাউন আসছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য রেড জোন হিসেব ঢাকার ৪৫টি এলাকার নামও ছাপা হয়। পুরো বিষয়টি বিভ্রান্তিকর হলেও গুজব কিন্তু নয়। গণমাধ্যম অতি আগ্রহী হয়ে সবার আগে খবর দেওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে গোপন তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছে। কিন্তু তালিকায় হেরফের হলেও রেড জোন এবং লকডাউন আসছে, এটা নিশ্চিত।

তবে এই বিভ্রান্তি ছড়ানোতে সরকারেরও অবদান আছে। গুজবের ভাইরাস করোনার চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। মহামারিকালে সরকারের উচিত সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। সেখানে সরকার উল্টো নানাভাবে মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে। এই করোনাকালেও কারও নামে ডিজিটাল আইনে মামলা হচ্ছে, কারও ব্যাংকের হিসাব নিয়ে টানাটানি হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত কোন কোন এলাকা রেড জোন, কবে থেকে লকডাউন, কয়দিনের লকডাউন, লকডাউনের সময় কী কী বিধিনিষেধ থাকবে তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়া, যাতে বিভ্রান্তি দূর হয়। কিন্তু রবিবার ব্যাপক বিভ্রান্তির পর সোমবার সকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, রেড ও ইয়েলো জোনে সাধারণ ছুটি থাকবে। পরে আবার প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে বলা হয়, সাধারণ ছুটি থাকবে শুধু রেড জোনে। কিন্তু জোন ঘোষণার আগেই সাধারণ ছুটির ঘোষণা, এ যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া। সরকার বিভ্রান্তি কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দেয়। পত্রিকায় পড়লাম, সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন আর ফেসবুকের তালিকা মিলিয়ে সম্ভাব্য রেড জোন এলাকার অনেকে ছুটি উপভোগ শুরু করে দিয়েছেন। আর মঙ্গলবার ঢাকার দুই মেয়র জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর তাদের তালিকা দেওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর লকডাউন কার্যকর হতে পারে। মেয়রদের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে স্বাস্থ্য অধিদফতর তালিকা দেওয়ার তিনদিন পর থেকে সম্ভাব্য রেড জোন এলাকায় লকডাউন শুরু হবে। আর কেমন হবে, সেটা জানার জন্য পূর্ব রাজাবাজারের দিকে একটু নজর দিতে পারেন।

করোনার যেহেতু কোনও ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়নি, যেহেতু কোনও সুনির্দিষ্ট ওষুধও নেই; তাই এখন পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্নতাই একমাত্র সমাধান। বিশ্বের অন্যান্য দেশে তো বটেই, বাংলাদেশেও ঢাকার টোলারবাগে, মাদারীপুরের শিবচরে লকডাউনে ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল। আমার খালি আফসোস সাধারণ ছুটির নামে ৬৬টি দিন অপচয় না করে তখন যদি আমরা ৩০ দিনের রাজাবাজার স্টাইলের লকডাউন কার্যকর করতে পারতাম, তাহলে প্রতিদিন দুপুর আড়াইটায় আমাদের মৃত্যু আতঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তো না। তখন আমরা মনের সুখে বাড়ি গেছি, গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে পিংপং বল খেলেছি, পুলিশের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলেছি; আর এখন হাসপাতালের জন্য হাহাকার করছি। আমার পরিচিত যত পরিবার তখন সরকারের আদেশ না মেনে ঘোরাফেরা করেছে, শপিং করেছে; তাদের সবাই এখন অসুস্থ। আমি তখন চিৎকার করেছি, কেউ আমার কথা শোনেনি।

নিয়ম হলো পানি আসার আগেই বাঁধ শক্ত করতে হয়। প্রবল জোয়ারে পানি বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। লকডাউন হলো বাঁধের মতো। মার্চে করোনার অল্প জোয়ারে লকডাউন দিলে যতটা কার্যকর হতো, এখন করোনার সুনামির মতো ছড়িয়ে গেছে, এখন হয়তো লকডাউন ততটা কার্যকর নাও হতে পারে। তবু হাল ছেড়ে বসে বসে লাশ গোনা তো আর কাজের কথা নয়। মানুষকে বাঁচানোর জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। আগে করা যায়নি বলে এখন লকডাউন করা যাবে না, এমন কোনও কথা নেই। বেটার লেট দ্যান নেভার। তবে লকডাউন কার্যকর করার আগে, পূর্ব রাজাবাজারের মতো কমিউনিটি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের খাবার নিশ্চিত করতে হবে। সবার জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো স্বেচ্ছাসেবী নিশ্চিত করতে হবে।

জোনিং ও লকডাউনেই সমাধান- এটাই যদি সরকারের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে এটা অবিলম্বে কার্যকর করা হোক। সুনার ইজ বেটার। ১ জুন জোনিং করে লকডাউনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন ১৭ জুন। এই ১৭ দিনে তো সংক্রমণ ও মৃত্যু লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই জরুরি পরিস্থিতিতেও যদি একটা সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে ১৭ দিন লাগে, তাহলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে? হয় লকডাউন দিন, নয়তো নয়। কিন্তু যা করার তাড়াতাড়ি করুন। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ