ফুলের জলসায় কবির নীরব হওয়ার দিন

Send
গৌতম রায়
প্রকাশিত : ১১:৪৪, জুলাই ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৫, জুলাই ০৯, ২০২০

গৌতম রায়নজরুল সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘নজরুলের দু’কক্ষ ঘরের দু’প্রান্তে দুটি অলিন্দ। এক কক্ষে বিদ্রোহ আরেক কক্ষে প্রেম। অলিন্দ দুটির একটি মানবমমতা আরেকটি প্রকৃতিপ্রীতি। ছাদে ওঠবার সিঁড়ি হচ্ছে গান। আর ছাদ হচ্ছে অতীন্দ্রিয় আনন্দভূমি।’ (জ্যৈষ্ঠের ঝড়-অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। আনন্দধারা প্রকাশন। ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ। পৃষ্ঠা: ১৮৪)
এই মানুষটিকে ঘিরে মিথের শেষ নেই। নজরুলের সৃষ্টি, চেতনাকে ছাপিয়ে তাঁর দীর্ঘ নীরব জীবন ঘিরেও মানুষের একদিকে যন্ত্রণা, আরেকদিকে কৌতূহল।
প্রচলিত ধারণা এইরকম যে, ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই রেডিওতে অনুষ্ঠান করতে করতে নির্বাক হয়ে যান কবি। স্থবির, জঙ্গম এক মানুষে পরিণত হন। নজরুলের জীবন ঘিরে অতিকথনের এতো বেশি সমাহার যে, সেদিনের অনুষ্ঠানের ভেতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও পরবর্তীকালে তিনি যে নির্বাক হয়ে গেলেন, সেটি কিন্তু সেই দিন হঠাৎ করে ঘটেনি। রেডিওতে তিনি অনুষ্ঠান করতে পারেননি অসুস্থ হয়ে পড়ায়। সেখানে কবির অসুস্থতার কথা ঘোষণা করে পরে আবার সেই অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। যদিও আর কখনোই সেই অনুষ্ঠান হয়নি। তবে তার পরের দিন, অর্থাৎ ১০ জুলাই, সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি তাঁর শাশুড়ি গিরিবালা দেবীর প্রশ্নের উত্তরে রাতে খারাপ লাগার কথা বলেছিলেন (নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায়-জুলফিকার হায়দার। পৃষ্ঠা: ৫৫)।

অত্যন্ত বেদনার হলেও এই কথা আজ সকলেরই জানা প্রয়োজন যে, রেডিও স্টেশনে ৯ জুলাই অসুস্থ হওয়ার আগে থেকেই কবির শরীর ভালো যাচ্ছিল না। জিভে কেমন একটা আড়ষ্টতা দেখা দিয়েছিল। ফলে প্রাণোচ্ছ্ল নজরুলের কথাগুলো কেমন জড়িয়ে এসেছিল। ’৪২-এর মে মাসে রেডিওতে নজরুল যে অনুষ্ঠান করেন, সেই অনুষ্ঠানে কবির কথা যে জড়িয়ে যাচ্ছে সেটা লক্ষ করেছিলেন নজরুল ঘনিষ্ঠ নিতাই ঘটক। কবিপত্নী প্রমিলা এবং কবির শাশুড়ি গিরিবালাও লক্ষ করেছিলেন কবির কণ্ঠ মাঝে মাঝেই আটকে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে। নজরুলের সেই সময়ের প্রতিবেশী বরদাপ্রসাদ গুপ্ত ও এই বিষয়টা লক্ষ করেছিলেন।

নজরুলের কখনও তোতলামি ছিল না। বড় রকমের অসুস্থতার পূর্বাভাসই যে ছিল তাঁর ’৪২ সালের প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে কথা আটকে যাওয়ার বিষয়টি, এটা তাঁর আত্মীয় পরিজনেরা সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। আর যদি দেখতেনও, তাহলেও যে কঠোর অর্থনৈতিক সমস্যার ভেতর দিয়ে নজরুলের তখন দিন কাটছিল, তাতে তাঁর পক্ষে বড় রকমের চিকিৎসা তো দূরের কথা, একজন ডাক্তার দেখানোও অসাধ্য ব্যাপার ছিল।

’৪২ সালের ৯ জুলাই। অভিশপ্ত একটা দিন। রাতের বেলা ছোটদের একটি অনুষ্ঠান করবেন কবি। কবিপত্নী এবং গিরিবালা দেবী কবির অসুস্থতার কারণেই খুব উদগ্রীব ছিলেন রেডিওর অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে। বাড়ি বসেই তাঁরা রেডিওতে শুনলেন, কবি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

অসুস্থ হয়ে পড়াতে তাঁকে রাত দশটা নাগাদ বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন বন্ধু তথা সাহিত্যিক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। রাতে খেতে পারলেন না কবি। ঘুমও সেভাবে হলো না। পরের দিন বেশ আগে আগেই তিনি উঠে পড়লেন। সেদিন অসুস্থ অবস্থাতেও জুলফিকার হায়দারকে কবি একটা ছোট্ট চিঠি লেখেন।

কবি লিখেছিলেন:

‘প্রিয় হায়দার, তুমি এখনই চলে এসো। অমলেন্দুকে আজ পুলিশে arrest করেছে। আমি কাল থেকে অসুস্থ—নজরুল।’

চিরকুটটি ১০ জুলাই লেখা হলেও কবি সেখানে তারিখ লিখছেন, ৯ জুলাই। যে ‘অমলেন্দু’র নাম কবি এখানে উল্লেখ করেছেন, সেই অমলেন্দু দাশগুপ্ত ছিলেন নজরুলের ‘নবযুগে’র সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। যে সময়ে নজরুল ওই চিরকুটটি লিখছেন, সেই সময়ে কিন্তু পুলিশ অমলেন্দু বাবুকে গ্রেফতারই করেনি।

অর্থাৎ কবির ভেতর যে একটা হ্যালুসিনেশন কাজ করছে, তা এই চিরকুটে ভুল তারিখ এবং অমলেন্দুর গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে পরিষ্কার। তার সঙ্গে আর একটি বিষয়ও পরিষ্কার যে, ব্রিটিশ পুলিশের উপর্যুপরি গ্রেফতার, হেনস্তার দরুন একটা প্রবল মানসিক যন্ত্রণার ভেতরে তখন কবি আছেন।

এই যে হ্যালুসিনেশনের ভেতরে কবির মানসিক অবস্থান, তাকে নিয়েও কিন্তু বেশ কিছু অতিকথন আছে। বরদাচরণ মজুমদার নামক কোনও ব্যক্তিতান্ত্রিক আচারের নামে কবির ওপর এতখানি প্রবল সম্মোহন বিদ্যা প্রয়োগ করেছিলেন যাতে নজরুলের মনে হয়েছিল, তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তান, অকালপ্রয়াত বুলবুলকে একদম রক্তমাংসের শরীরে দেখতে পাচ্ছেন। এই ঘটনা কিন্তু নজরুলের মতো কোমল কবি মনে একটা তীব্র যন্ত্রণাময় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।

অসুস্থ হয়ে পড়ার পরের দিন গিরিবালা দেবীর অনুরোধে নজরুলের তৎকালীন বাড়িওয়ালা ডিএল সরকার প্রথম কবিকে দেখেন। ডা. সরকার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানুষ হলেও তখন সে সব ছেড়ে হোমিওপ্যাথি করছিলেন। ডাক্তারের হাতটি জড়িয়ে ধরে কাতরভাবে জড়ানো গলায় নজরুল বলেছিলেন; হাতটা কাঁপছে। ডা. সরকার প্রায় দিন পনেরো কবির চিকিৎসা করেন। এই সময়কালে কবি সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে যাননি। জিভের আড়ষ্টতা কোনোদিন কম থাকতো। কোনোদিন বৃদ্ধি পেতো। এই সময়ে কবি কয়েকটি চিঠি লিখলেও, সেগুলো ছিল আঁকাবাঁকা হাতে লেখা।

নবযুগের তৎকালীন সহ সম্পাদককে ১৫ জুলাই কবি যে চিঠি লেখেন, সেখানেও বেশ কিছু বিভ্রান্তি আছে তাঁর অসুস্থতার দরুন। অসুস্থতার অষ্টম দিনে জুলফিকার হায়দারকে নজরুল লিখছেন, ‘...আমার nerves shattered হয়ে গেছে। ৭ মাসম (মাস) ধরে হক সাহেবের কাছে গিয়ে ৫৬ ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে এসেছি। হিন্দু- মুসলিম equity’র টাকা কারু বাবার সম্পত্তি নয়। বাঙলার বাঙালীর টাকা।...কথা বন্ধ হয়ে গিয়ে অতি কষ্টে দু একটা কথা বলতে পারি বললে যন্ত্রণা সর্ব শরীরে। হয়ত কবি ফেরদৌসির মত ঐ টাকা আমার জানাজার নামাজের দিন পাব। কিন্তু ঐ টাকা নিতে নিষেধ করেছি আমার আত্মীয় স্বজনকে।’

ফজলুল হককে যে আর্থিক কারণে নজরুল অভিযুক্ত করেছেন এখানে সেটি সম্ভবত তাঁর অসুস্থতাজনিত ভ্রান্তি। কারণ, পরবর্তীকালে কবিকে যখন রাঁচি মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন সেখানকার চিকিৎসক ড. আর বি ডেভিস তাঁকে পরীক্ষা করে বলেন; রোগের প্রথম দিকে কবির ভেতর একটি সন্দেহ বাতিক দানা বেঁধেছিল। তাঁকে আর্থিকভাবে ঠকানো হচ্ছে—এই সন্দেহটা খুব বেশি রকমভাবে সেই সময়ে কবির ভেতর বাসা বেঁধেছিল (কবি নজরুলের অসুস্থতা: তর্ক-বিতর্ক ও দলিলপত্র- ইসমাইল খান সম্পাদিত গ্রন্থে ডা. ডেভিসের পর্যবেক্ষণটি আছে। পৃষ্ঠা-৩৭-৩৯)।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও গবেষক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ