হাইয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানানোয় বিপদে এরদোয়ান

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৪২, জুলাই ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, জুলাই ১৪, ২০২০

আনিস আলমগীরপ্রথমে ছিল গির্জা, তারপর মসজিদ, এরপর জাদুঘর—এখন আবার হতে যাচ্ছে মসজিদ। তুরস্কের অন্যতম টুরিস্ট আকর্ষণ হাইয়া সোফিয়াকে নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের নতুন এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমা বিশ্ব ভালো চোখে দেখছে না। ইউনেস্কো, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, গ্রিস, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ এই সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা জানিয়েছে। ব্যথিত হয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস। অবশ্য এরদোয়ান বলছেন, মসজিদ হলেও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে স্থাপনাটি।
আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে এটিকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল গির্জা হিসেবে। ষষ্ঠ শতকে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সময়ে তৈরি করা হয় এটি। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে এর ধর্মীয় রূপও বদল হয়েছে। গির্জা হিসেবেও প্রথমে এটি ছিল গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ। প্রতিষ্ঠার ৫৩৭ সাল থেকে ১২০৪ সাল পর্যন্ত তাই ছিল। এরপর ১২০৪ থেকে ১২৬১ সাল পর্যন্ত থাকে রোমান ক্যাথলিক চার্চ হিসেবে। ১২৬১ থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত আবার গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ হিসেবে ফিরে আসে।

১৪৫৩ সালে অটোমানরা কনস্টান্টিনোপল (বর্তমানে ইস্তাম্বুল) জয়ের পর দ্বিতীয় সুলতান মেহমেদ এই চার্চকে মসজিদে রূপান্তর করেন। আধুনিক তুরস্কের স্থপতি মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক এটিকে জাদুঘরে পরিণত করেন ১৯৩৫ সালে। এরপর থেকে অসাম্প্রদায়িক তুরস্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল হাইয়া সোফিয়াকে। শুধু তাই নয়, ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ এটিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়। কিন্তু গত ১০ জুলাই ২০২০, শুক্রবার সেই সিদ্ধান্তকে বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির একটি আদালত। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এরদোয়ান স্থাপনাটিকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য এক নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি জানান, ২৪ জুলাই থেকে সেখানে নামাজ আদায় করা যাবে।

হাইয়া সোফিয়ার স্ট্যাটাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টানাপড়েন চলছে। ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা অনেকদিন ধরে মুসলিমদের নামাজ পড়ার জন্য খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। অটোমানদের কনস্টান্টিনোপল জয়ের বার্ষিকী উপলক্ষে হাইয়া সোফিয়ার ভেতরে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থাও করা হয় গত মাসে। ইস্তাম্বুলের মেয়র ও তুরস্কের বৃহত্তম বিরোধী দলের সদস্য একরেম ইমামোগলু এই মুহূর্তে এটা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়ার দরকার ছিল না বলে মনে করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কামাল আতাতুর্কের ত্যাগের কথা তুরস্কের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের মূল ভূখণ্ডভিত্তিক একটি রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্য তখন মিত্রশক্তির সঙ্গে যুদ্ধরত। তিনি আনাতোলিয়ায় তুর্কি সেনাবাহিনীকে একত্রিত করে মিত্রশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করতে ছিলেন। ওসমানিয়া খেলাফত কামালের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তিকে সাহায্য করছিল। দেশের ওলামায়ে কেরামেরা খলিফার আহ্বানে একত্রিত হয়ে কামালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। অনেকটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজাকার-আলবদরদের মতোই তথাকথিত আলেমরা মিত্রশক্তি ও খলিফার পক্ষে বাহিনী গঠন করে কামাল আতাতুর্কের পথ রোধ করার চেষ্টা করেছিলেন।

রাশিয়ার সমুদ্রে যাওয়ার বসফরাস প্রণালী ছাড়া কোনও পথ নেই। রাশিয়া চেয়েছিল বসফরাস প্রণালী দখল করতে, কারণ বসফরাস প্রণালী তুরস্কের অধিকারে। ইতালি চেয়েছিল ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশ দখল করতে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা মূলত আর যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক ছিল না। সেই কারণে কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে যুদ্ধে কোনও রণাঙ্গনে তারা সুবিধা করতে পারেনি। ১৮৭৮ সালে ইউরোপ তুরস্ককে নিয়ে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। রাশিয়ার জার তুরস্ককে বলতো ইউরোপের রুগ্‌ণ মানুষ। তুরস্ককে ভাগাভাগি করে নেওয়ার ইচ্ছা রাশিয়ার বহুদিন ধরে পোষণ করতো।

তুরস্ককে নিয়ে এসব ষড়যন্ত্রের সময় তুরস্কের মানুষ উপলব্ধি করলো, তুরস্ক আধুনিক জীবন পদ্ধতি মেনে না নিলে তাকে পিছিয়ে থাকতে হবে এবং তার ললাটের দুঃখ যাবে না। তাই কামাল আতাতুর্ক যুদ্ধে জিতে আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠার পর তিনি খেলাফত বিলুপ্ত করে দিলেন, আর ইসলামিক গ্রুপ যারা খলিফা নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর পক্ষে তাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল তাদের তিনি বিচারও করেছিলেন। এসব কারণেই ইসলামপন্থীরা কখনও কামাল আতাতুর্ক সহ্য করতে পারেনি, কিন্তু যেহেতু কামাল আতাতুর্ক দেশটিকে যুদ্ধ করে মিত্রশক্তির গ্রাস থেকে রক্ষা করেছিলেন সেই কারণে তুরস্কে লোকেরা আতাতুর্ক বা জাতির পিতার আসনে তাকে বসিয়ে তার অনুসৃত পথেই চলছিলেন।

কামাল আতাতুর্ক যদি তুরস্কের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে না পারতেন, তবে তুরস্কের মুসলমানদের অবস্থা স্পেনের মুসলমানদের মতোই হতো। মুসলমানের সাত শত বছর ক্ষমতায় ছিল আর এখন স্পেনে কেবলা কোন দিকে জিজ্ঞেস করার মতো একজন মুসলমান পাওয়া যাবে না। অনুরূপ দুর্ভোগের হাত থেকে কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে মুসলমানদের রক্ষা করেছিলেন। তিনি তুরস্ককে এক ধর্মে বিশ্বাসী লোকের দেশ বানানোর জন্য গ্রিসের সঙ্গে ৭ লাখ লোক বিনিময় করেছিলেন। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে ৭ লাখ লোক গ্রিসে পাঠানো আর গ্রিস থেকে ১৪ লাখ তুর্কি মুসলমানকে তুরস্কে নিয়ে আসা কম সাহসের কথা ছিল না। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় কষ্টের কাজ হলো লোক বিনিময়।

কনস্টান্টিনোপল পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী। রোম সম্রাট যখন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন তখন খ্রিস্টধর্ম রাজধর্মের মর্যাদা লাভ করে। হাইয়া সোফিয়া কনস্টান্টিনোপল খ্রিস্টানদের শ্রেষ্ঠ উপাসনালয়। ১৪৫৩ সালে উসমানিয়া খলিফা মুহাম্মদ আল ফাতিহ-এর হাতে, যাকে দ্বিতীয় সুলতান মেহমেদও বলা হয়, রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতনের মাধ্যমে পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের পতন হয়। কনস্টান্টিনোপল হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর সময়েও বিখ্যাত নগরী ছিল। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটা হাদিস আছে, তাতে তিনি বলেছেন, মুসলমানদের মধ্যে যিনি প্রথম নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি কনস্টান্টিনোপল জয় করবেন। তাদের জন্য বেহেশত অবধারিত।

কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর হাইয়া সোফিয়াতে নামাজ আদায় হতো। কামাল আতাতুর্ক তা বন্ধ করে দেন। ৮৬ বছর বন্ধ থাকার পর এখন এক মামলার রায়ে হাইয়া সোফিয়াতে নামাজ আদায়ের পক্ষে আদালত রায় প্রদান করলে পুনরায় সেখানে জামাত চালু হবে।

এই সিদ্ধান্ত চরম বিতর্কের সৃষ্টি করেছে পশ্চিমা দুনিয়াতে। রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের প্রধান কিরিল এই পদক্ষেপটিকে ‘পুরো খ্রিস্টীয় সভ্যতার জন্য হুমকি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। রবিবার ভ্যাটিকানে প্রার্থনার পরে পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, ‘হাইয়া সোফিয়ার ঘটনায় আমি ব্যথিত। ইস্তাম্বুলের কথা বারবার মনে পড়ছে।’ জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো তুর্কি কর্তৃপক্ষকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের সাইটটির সর্বজনীন মানকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিরুদ্ধে’ সতর্ক করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেশী গ্রিস থেকে ক্রেমলিন সরকার, ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত উদ্বেগ ও প্রতিবাদের নোট জারি করেছে।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে নন। তিনি ধর্ম পোষণ করে চলার লোক। দীর্ঘদিন ধর্মনিরপেক্ষ থাকার পর তুরস্ক তার আবস্থান পরিবর্তন করলো। কিন্তু ৯৮ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষ লোকরা দুর্বল নয়। সমানে সমান। একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে তারা। একদিকে হিজাব আরেকদিকে স্কার্ট।

২০১৬ সালে তুরস্ক সফরকালে আমার হাইয়া সোফিয়া সফর করা হয়েছিল। এটিকে তুরস্কের সম্পদ হিসেবে না দেখে এরদোয়ানের উচিত ছিল দুর্দান্ত সুন্দর কারুকার্যমণ্ডিত স্থানটিকে বিশ্বের উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা। যখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে অনেকের মতো তুরস্কও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, যখন ৯৭ শতাংশ পর্যটন হিমশীতল হয়ে গেছে, হোটেলগুলো বন্ধ রয়েছে, যখন পর্যটন হ্রাস পেয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে, তখন তার এই বিতর্কটির জন্ম দেওয়ার দরকার ছিল না।

তার ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য কয়েক বছর আগে দেশটির সামরিক বাহিনীর একাংশ অভ্যুত্থান করে এরদোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করেছিল। এখন ‘হাইয়া সোফিয়াকে কী কাজে ব্যবহার করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া তুরস্কের সার্বভৌম অধিকার’ বলে এরদোয়ান যতই দাবি করুন না কেন, হাইয়া সোফিয়াকে নিয়ে তার এই সিদ্ধান্তের পর পশ্চিমা বিশ্ব এরদোয়ানকে পুনঃপুনঃ ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চালাবে। হাইয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ