‘কার্যকারণ’ ও ‘সাহেদবাদ’

Send
জুবায়ের বাবু
প্রকাশিত : ১৯:৩৪, জুলাই ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৬, জুলাই ২২, ২০২০

জুবায়ের বাবুকথায় বলে ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’, আর দর্শনশাস্ত্রে বলে ‘কার্য-কারণবাদ’, আর এই শাস্ত্রে কার্য-কারণবাদ একটি অন্যতম প্রতিপাদ্য ও জনপ্রিয় তত্ত্ব। দুটি ঘটনা বা দুটি বস্তুর মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ে এই তত্ত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ– যাকে আমরা কার্যকারণ সম্পর্ক বলে থাকি। যেকোনও ঘটনার ‘কারণ’ থাকে, আবার ‘কারণ’ আছে মানেই তার কোনও না কোনও ‘ফলাফল’ আছে। দুটি ঘটনার মধ্যে যে ঘটনাটি আগে ঘটে তাকে ‘কারণ’ এবং ওই ঘটনার প্রেক্ষাপটে যে ঘটনাটি ঘটে থেকে তাকে ‘কার্য’ বলা যায়। যেমন, ধোঁয়া যদি ‘কার্য’ হয় তবে ‘কারণ’ হলো আগুন।
একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া যদি ‘কার্য’ হিসেবে দেখি তবে তার ‘কারণ’ হিসেবে আমেরিকার রাজনৈতিক দৈন্য কিংবা দম্ভতাকেই ব্যাখ্যা করতে পারি। দেশি ঘটনায় ব্যাখ্যা করলে সাহেদ যদি ‘কার্য’ বা ‘ফলাফল’ হয়, তবে আমাদের বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কারণ হিসেবে দেখতে পারি। কার্যকারণ সম্পর্কটাই এমন যে ‘কার্য’ আবার অন্য একটি ঘটনার কারণ হতে পারে। যেমন, সাহেদ যদি কারণ হয় তবে নকল করোনা সার্টিফিকেটকে আমরা কার্য হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। তার মানে যেকোনও ঘটনার কারণ আছে, আবার যেকোনও কারণের প্রতিক্রিয়া আছে। অর্থাৎ কারণটি সবসমই কার্যের চেয়ে বড় এবং পূর্ব ঘটনা। সাহেদের যে কারণ, তা নিঃসন্দেহে আরও বড় ঘটনা, যা পূর্বেই সংঘটিত হয়েছে। সেই কারণটি যদি অন্য একটি ঘটনার কার্য হয়, তাহলে ‘কারণে’র কারণটি আরও বড় ঘটনা।
খুব বেশি দিন হয়নি ক্যাসিনোর ঘটনার। ক্যাসিনোর কারণ হিসেবে ধরা পড়ে সম্রাট, খালেদ, জি কে শামীমসহ অনেকে। ক্যাসিনো হলো তাদের কার্য, ঠিক তেমনি তারা ক্যাসিনোর কারণ আর ব্যর্থ পুলিশ প্রশাসনের কার্য। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ কী? নিঃসন্দেহে সেই কারণটি আরও বড় ব্যর্থতা। নরসিংদীর মতো একটি মফস্বল শহর থেকে আসা পাপিয়া কী কারণে এত বড় পাপের ঘটনা ঘটিয়েছে? পাপিয়া যদি ‘কার্য’ হয় তবে দেশের নষ্ট রাজনীতি কি তার কারণ নয়? ব্যাংক লুটের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছিলেন অনেকেই, কিন্তু যাদের কারণে এই লুটপাট, সেই কারণ এখনও সবার অজানা। ইয়াবা সম্রাট আমিন হুদা মৃত্যুর মাধ্যমে হয়তো একটি কার্যের সমাপ্ত হলো, কিন্তু কারণ রয়ে গেলো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কার্য, নতুন নতুন আমিন হুদা। এই আমিন হুদারা আবার পাড়ায় পাড়ায় তৈরি করছে শত শত কার্য নিজে কারণ হয়ে। আমিন হুদা যদি নষ্ট সমাজের কার্য হয়, তবে এই নষ্ট সমাজের কারণ কী?
কার্য কারণ সম্পর্কে দুটি ধারা প্রচলিত আছে, একটি ভাববাদ আর অন্যটি বস্তুবাদ। ঘটনার সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক আপেক্ষিক, এই সম্পর্ক কল্পনাপ্রসূত বলে রাজনৈতিক ভাববাদীরা এসব বিষয় উড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতার বিলাসিতায় ভাসতেই পারেন। বস্তুগতভাবে ‘বাটপার শাহেদ’কে যেমন দেখা যায় ঠিক একইভাবে সেলফিতে অজস্র নেতানেত্রীকেও দেখা যায়; কিন্তু তাদের ভেতর যে গভীর সম্পর্ক, তা কিন্তু দেখা যায় না। সুতরাং এসব ‘তত্ত্ব’ গ্রহণযোগ্য নয়, একথা বলে দার্শনিক হিউমের মতো সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদরা কার্যকারণ সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারেন।
যাহোক, উৎপত্তি বিশ্লেষণে তারাও আবার সৎ কার্যবাদী ও অসৎকার্যবাদী। অর্থাৎ একদল মনে করেন সাহেদ রাজনৈতিক ‘কার্য’ হলেও তা নতুন রূপ।  রাজনীতি শাহেদকে জন্ম দিলেও রাজনীতির কোনও দোষ নেই, রাজনীতি নিষ্পাপ, নির্মোহ। কিন্তু অন্য দল মনে করে, রাজনীতির মাঝেই শাহেদের অস্তিত্ব নিহিত। কাঁঠালের বিচি বপনে কি আম গাছ হয়?
বাচস্পতি মিশ্র তাঁর তত্ত্বকৌমুদী বইয়ে লিখেছিলেন, পেষণের দ্বারা তিল থেকে যেমন তেল হয়, আঘাতের দ্বারা যেমন ধান থেকে চাল হয়, দোহনের দ্বারা যেমন গাভী থেকে দুধ হয়- সেই সূত্র ধরে আমরা বলতেই পারি, ধর্ষণের দ্বারা রাজনীতি থেকে শাহেদ হয়। যাক, সেসব তর্কে যাবো না, ‘সতঃসজ্জায়ত’- অর্থাৎ, সৎ বস্তু থেকে সৎ বস্তু উৎপন্ন হয়, এটাই ভাবতে চাই।
সাহেদ আসলে সামান্য একটি কার্য, তাই সাহেদ কোনও উদ্দেশ্য হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো সাহেদের কারণ যদি নষ্ট রাজনীতি হয়, তবে এই নষ্ট রাজনীতি অন্য একটি কারণের কার্য। আর হয়তো সেই কারণেও একটি কারণ রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে নিশ্চিতভাবে এমন একটি ঘটনায় কিংবা বস্তুতে পৌঁছানো সম্ভব, যে কারণের আর কোনও কারণ নেই, যা নিজেই কার্যের কারণ। ঠিক সেই ঘটনা বা বস্তুটিকেই আমাদের এখন খুঁজে বের করতে হবে, নতুবা সাহেদ, সম্রাট কিংবা সাবরিনায় ভরে যাবে দেশ।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ