জন ভাবনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৮:২১, আগস্ট ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৩, আগস্ট ১১, ২০২০

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অনেক বিষয়ের সমাধান হয়েছে। বিশেষ করে স্থল সীমান্ত ও সমুদ্র সীমানার মতো জটিল বিষয়গুলো বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কোনও ধরনের সংঘাত ও সহিংসতা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা সত্যিই বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
শুধু সীমান্ত সমস্যার সমাধান নয়, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের বৃহত্তম বাণিজ্যের ও উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে ভারত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ভারতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের লাখ লাখ বাড়িঘর এবং কারখানা আলোকিত করছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আরেক দৃষ্টান্ত হচ্ছে, বিগত যে কোনও সময়ের চেয়ে স্থল, জল, বিমান, রেল ও পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই যোগাযোগ বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তনে বিরাট ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়েও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মানুষরা বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের ওই সক্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও তিস্তার পানি বণ্টনের ইস্যুকে মূলত ভারতবিরোধীরা বাংলাদেশি জনগণকে ভারতের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে ব্যবহার করছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতির মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশের সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপিসহ প্রধান সব রাজনৈতিক দল ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ইস্যু দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় ভারতবিরোধী একটি গোষ্ঠী আবারও বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতির জিকির তোলার সাহস পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ওই গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে ভালোভাবেই ধরতে পেরেছে। 

কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভারতবিরোধী না হলেও সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুর সমাধান চায়। এক্ষেত্রে ভারতবিরোধী ও ভারতপন্থী উভয় পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। আর ওই ঐকমত্যের সুযোগই ভারতবিরোধী গোষ্ঠী ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরাতে চাইছে।   

ভারত সরকারের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের কাছে বাংলাদেশের প্রাপ্য ন্যায্য হিস্যা চায়। অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর দ্রুত মীমাংসার পাশাপাশি সীমান্তে হত্যাকাণ্ড নিয়েও তারা সোচ্চার। বাংলাদেশের মতো ভারতের সাধারণ মানুষও যে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের বিপক্ষে তা বিভিন্ন সময়ে ভারতে এই বিষয়ে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে বোঝা যায়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে এবং তিনিও সাধারণ মানুষের আবেদনকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে ওই ঘোষণা যেন শুধু কাগজে কলমে না থেকে বাস্তবে দৃশ্যমান হয় তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া। সত্যি যদি ভারত ও বাংলাদেশের সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে তাহলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতির ৮০ শতাংশের মৃত্যু ঘটবে। তবে পাশাপাশি অমীমাংসিত পানি বণ্টন চুক্তির সমাধানও করতে হবে। 

বিভিন্ন সময়ে ভারত সফরের সময়ে ভারতের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও তিস্তার পাণি বণ্টন চুক্তিসহ ভারত ও বাংলাদেশের নানা দ্বি-পাক্ষিক ইস্যুতে বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষের অবস্থান একেবারেই অভিন্ন। বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের রাজ্যগুলোর মানুষেরা বাংলাদেশের নাম শুনলে অন্য রকম এক আবেগে ভাসে। তারা বাংলাদেশকে তাদের অতি আপন মনে করে। 

মনে পড়ছে, বেশ কয় বছর আগে ভারতের কোচবিহারের অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে সম্মেলন বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করি। সম্মেলেনের বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্যগুলো থেকে সেমিনারে আগত অতিথিদের বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিসহ নানা বিষয়ে আগ্রহ এবং বাংলাদেশ নামটি শোনার পর তাদের চোখেমুখে যে আবেগ-অনুভূতি দেখেছি তা ভাষায় বলে বোঝানো যাবে না। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নীলরতন রায়, শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা শক্তিপদ, কলেজ শিক্ষক অতনুসহ অনেকের সঙ্গে আলাপ করে মনে হয়েছে, তারাও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মতো বিএসএফের সীমান্তে নিরীহ মানুষকে হত্যা করাকে সমর্থন করে না। এদেশের মানুষের মতো তারাও ফেলানীর হত্যাকারী বিএসএফ সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। তারা চায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতে সব অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান। ভারতে বাঁধের কারণে বাংলাদেশের মেরুকরণের বিষয়টিও তারা জানে। তাই এই বিষয়টি আলোচনায় উত্থাপিত হলে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার কট্টর সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনেককে মমতার পানি নীতির সমালোচনা করতে শুনেছি। তাদের মনোভাবও বাংলাদেশিদের মতো। তিস্তা, গঙ্গাসহ অভিন্ন ৪৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশ যেন পায়, সেই বিষয়টি এখনও মীমাংসিত না হওয়ায় তাদের উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি। 

পথে-ঘাটে-দোকানে যার সঙ্গেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয়েছে প্রায় সব ভারতবাসীই বলেছে, তারা বাংলাদেশের প্রতি ভারতের রাজনীতিবিদদের অনেক ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণকে সমর্থন করে না। তারা চায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গাঢ় হোক। বাংলাদেশ-ভারত হাতে হাত রেখে পাশাপাশি এগিয়ে যাক। বিভিন্ন সময়ে অনেক প্রবীণকেই আলাপে তাদের পূর্ববঙ্গের স্মৃতি রোমন্থন করে আবেগে আপ্লুত হতে দেখেছি। তরুণদের বাংলাদেশের প্রতি অনুভূতিও চোখে পড়ার মতো। তবে তারাও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মতো ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারাও চায় বাংলাদেশ ও ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হোক। বাংলাদেশ সরকারের নিকট অনুরোধ থাকবে ভারত যেভাবে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করেছে তেমনি ভারতীয়দের বাংলাদেশে আসার ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করা হোক। এক্ষেত্রে ভারত সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতীয়দের জন্য বাংলাদেশের ভিসা আরও সহজ করা যায় কীভাবে সেই বিষয়ে কথা বলতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ধরে রাখতে দুই দেশের তরুণদের মধ্যে যোগাযোগের বিকল্প নেই। তারাই আগামী দিনের নেতা। তাই তাদের একে অপরের দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে পরস্পরকে জানা অতি প্রয়োজন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত আছে। তার কারণ অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভারতবিরোধীদের ভারতবিরোধী প্রচারণা। সাধারণ মানুষের অনেকেই ওই প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে ভারতবিরোধী হয়। বাংলাদেশে ভারতবিরোধীদের ভারতবিরোধী প্রচারণা থেকে ওই সব ধারণা অনেকের মনে গেঁথে গেছে। তাই বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে ভারতের সরকার ও রাজনীতিবিদদের শুধু বাংলাদেশের সরকার বা রাজনীতিবিদদের মনোভাব নয় সাধারণ মানুষের মনোভাবকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ভারতের রাজনীতিবিদরা যদি বড় ভাই সুলভ আচরণ পরিত্যাগ করে ভারতের সাধারণ মানুষের মতো চিন্তা করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত সহযোগীর ভূমিকা পালন করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য যেন আদর্শ হয়ে ওঠে। আর এক্ষেত্রে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে। অচিরেই অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর আন্তরিকতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করতে হবে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, তিস্তা ও গঙ্গাসহ অভিন্ন ৪৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাংলাদেশ ভারত বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে প্রচার প্রভৃতি বিষয়ে কার্যকরী ও আন্তরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

অনেক সাধারণ মানুষ সব সময় এই আতংকে ভোগে যে, ভারত ভৌগোলিকভাবে বড় রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশের ওপর সব সময়ই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে। ভারত সরকারকে মনে রাখতে হবে,বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষ একে অপরকে অতি আপনজন মনে করেন। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ সহ নানা বিষয়ে ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সোচ্চার হওয়া যার বড় প্রমাণ। 

সাধারণ মানুষের এই সম্পর্ক ও চিন্তাকে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিবিদরা আমলে নিলেই বাংলাদেশ ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থায়ী রূপ পাবে। 

লেখক: সামরিক ইতিহাস গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ