পাটের পুনর্জাগরণ সম্ভব

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৭:৪৯, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫১, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাঅব্যবস্থাপনা, বিপুল দুর্নীতি এবং সীমাহীন লোকসান আর টানতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সমাজের সচেতন মহল সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। স্বাগত জানানোর একটি বড় কারণ এই যে, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিতে শুরু করেছে এবং এই পাটকলগুলোকে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আবার জাগিয়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। অনেকেই জনপ্রিয় থাকতে বলার চেষ্টা করে যে, পাটকল বন্ধ না করে দুর্নীতি বন্ধ করা উচিত ছিল। সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানই যে ব্যবসা করতে পারে না, এবং সেসবে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি যে কখনও বন্ধ হয় না, সেটা তারা বুঝেও হয়তো বুঝতে চাইবেন না।
তবে এখন যখন দেখছি, বেসরকারি খাতের পাটকলগুলোও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করছে, তখন চিন্তিত হতে হয়। পাট সোনালি, রুপালি নাকি বর্ণহীন আঁশ সে বিতর্ক আজ অর্থহীন। তবে স্বচ্ছ পানিতে ধোয়া পাটের আঁশ দুপুরের রোদে এখনও ঝলক দেয়। তাই পাট অবশ্যই হতে পারে বাংলাদেশের বড় মূল্য সংযোজনকারী এক বড় পণ্য। বলা হয়, পাট এমনই একটি ফসল, যার কোনও কিছুই ফেলনা নয়। 

করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনীতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনাভাইরাসের আপৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের অন্যান্য রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক থাকা সত্ত্বেও পাট খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে রফতানিমুখী খাতগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। পাটজাত পণ্য রফতানিকারকরা বলছেন কোভিড-১৯ এর কারণে গত মার্চ-মে মাস পর্যন্ত লকডাউন না থাকলে রফতানি প্রবৃদ্ধি ২০ থেকে ২২ শতাংশ হতো। উৎপাদন, রফতানি ও রফতানি আয়, মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট ও পাটশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাহলে প্রশ্ন জাগে, তবুও কেন আশঙ্কার কথা উচ্চারিত হচ্ছে? 

একদিকে করোনা, অন্যদিকে প্রলম্বিত বন্যা। এর বাইরে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। এসব কারণে পাটের উৎপাদন কমেছে। আশঙ্কা আছে যে, এ কারণে চলতি অর্থবছরে পাটের উৎপাদন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কম হবে। এর ফলে মিলগুলোতে পাটের সরবরাহ অনেক কম থাকবে, যার জন্য মিলগুলো পাট সংগ্রহ ও পাটজাত পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হবে।

যারা ব্যক্তি খাতে পাটশিল্প গড়ে তুলেছেন তারা যে সমস্যার কথা বলছেন যেটা নীতিনির্ধারকদের শুনতে হবে। বাজারে পাটের সংকট চলছে। বিজেএমসির এতগুলো মিল বন্ধ হয়ে গেলো, তবুও মৌসুমের শুরুতে পাটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে প্রতিমণ পাটের দাম ২৬০০-২৭০০ টাকা হয়েছে এবং দিন দিন তা বাড়ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের পাটকলগুলো চাহিদামতো পাট সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটা অতি মুনাফালোভী মধ্যস্বত্বভোগী কারবারিচক্র অধিক মুনাফার আশায় এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে বেশি দামে পাট সংগ্রহ করে মজুত করছে। 

একটা বড় শঙ্কা এই যে, পাটের মূল্য বেশি বাড়তে থাকলে আনুপাতিক হারে পাট থেকে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বাড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটজাত দ্রব্যের মূল্য অন্যান্য বিকল্প পণ্যের মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। তাই দেশের পাটশিল্পকে বাঁচাতে কাঁচাপাটের সরবরাহ সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি এবং সেটা করতে গেলে পাটের পাচার বন্ধ করতে হবে এবং কাঁচাপাট রফতানি নিরুৎসাহিত করতে হবে। কাঁচাপাট রফতানি নিরুৎসাহিত করা না গেলে কাঁচাপাটের অভাবে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের পরেই দেশের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশে পাটই একমাত্র পণ্য যা শতভাগ মূল্য সংযোজন করে প্রস্তুত করা হয়। কাঁচাপাট থেকে পাটপণ্য করে রফতানি করলে ৫০০ থেকে ৫০০০ ডলার পর্যন্ত মূল্য সংযোজন হয় বলে দাবি করছে বেসরকারি খাতের দুই সমিতি—জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন ও জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন। 

ভারতের মিলগুলো বাংলাদেশ থেকে পাট ক্রয় করে ঘাটতি চাহিদা পূরণ করছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট রফতানি হয়, তবে বাংলাদেশের পাটকলগুলো কাঁচাপাটের সংকটে পড়বে এবং বাংলাদেশে পাট আমদানি নিষিদ্ধ থাকায় অধিকাংশ পাটকল পাটের সংকটে বন্ধ হয়ে যাবে।

পাটজাত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো। সেটি করতে পারলে পাটকলগুলোকে আর প্রতিবছর হা হুতাশ করতে হবে না।  এক্ষেত্রে নীতির স্থিরতা গুরুত্বপূর্ণ। পাটশিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের শিল্পকে বাঁচাতে পাট রফতানিতে মণপ্রতি ২৫০ ডলার শুল্ক আরোপ আবশ্যক এবং কাঁচাপাট রফতানিতে শুধুমাত্র সামুদ্রিক পথ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ অত্যন্ত জরুরি। আমার মনে হয় দেশি পাটকলগুলোকে যদি সত্যিকার অর্থে সহায়তা করতে চায় তবে সরকারকে অবশ্যই কাঁচাপাট রফতানি বন্ধে বা নিরুৎসাহিতকরণে স্থায়ী নীতি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আরেকটি হলো আইন বাস্তবায়ন। ২০১০ সালে করা বাধ্যতামূলক প্যাকেজিং আইন করেও দশ বছর ধরে আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারছি না। ভারতের সঙ্গে আমাদের মূল পার্থক্যটাই এখানে যে তারা পাটকে বহুমুখী ব্যবহারে বাধ্য করতে পেরেছে। পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহারের আইন থাকা সত্ত্বেও কেন পলিথিনে সয়লাব হচ্ছে, তা নিয়ে সরকারকে শক্ত অবস্থান নিতেই হবে। শুধু পণ্যের মোড়কে নয়, সরকারি সব অফিসে যত সেমিনার, ওয়ার্কশপ হয়, সেখানে যদি ব্যবহৃত ব্যাগ, ভিজিটিং কার্ড, পর্দার মতো পাটপণ্যের ব্যবহারে বাধ্য করা যায়, তাহলেও একটা বড় সচেতনতা ও জাগরণ সৃষ্টি হবে। এই আইন বাস্তবায়ন করে বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে পাটের পুনর্জাগরণ সম্ভব।

পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালের ৬ মার্চ প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় পাট দিবস’ পালন করে বাংলাদেশ। আগামী মার্চের আগেই এই বাধ্যতামূলক মোড়ক আইন বাস্তবায়নে সক্রিয়তাই প্রত্যাশিত। 

লেখক: সাংবাদিক 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ