‘যত দোষ, নারী ঘোষ’

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:০১, অক্টোবর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৩, অক্টোবর ১৮, ২০২০

প্রভাষ আমিনভিকটিম ব্লেমিং আমাদের এখানে পুরনো সমস্যা, অপরাধীদের আদি কৌশল। বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার বা নির্যাতিত নারীদের ঘাড়ে কৌশলে দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে যায় ধর্ষকরা। শুধু যে ধর্ষকরাই নারীদের ঘাড়ে দোষ চাপায়, তা নয়; আপনজনেরাও ভিকটিমকেই দোষী ভাবে। এই যে অনন্ত জলিল ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করেন, এটা কিন্তু তার মৌলিক চিন্তা নয়। যুগ যুগ ধরে আমাদের জগদ্দল পুরুষতন্ত্র এভাবে নারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে আসল দোষীদের আড়াল করেছে। যুগে যুগে নারীদের পোশাককে ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়েছে। ধর্ষণের দোহাই দিয়ে নারীদের অবগুণ্ঠিত করে রাখার চেষ্টা হয়েছে, চেষ্টা হয়েছে নারীকে ঘরের চার দেয়ালে আটকে রাখার। কিন্তু বারবার প্রমাণিত হয়েছে ধর্ষণের সঙ্গে পোশাকের কোনও সম্পর্ক নেই। বোরকা পরা, হিজাব পরা, শিশু, বৃদ্ধা সবাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন; যাদের কেউই পোশাকের কারণে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এমনটা বলা যাবে না। শুধু পোশাক নয়; নারীর চালচলন, আচার-আচরণ, কথাবার্তা সবটাতেই সমস্যা।

এভাবে তাকালো কেন, ওভাবে হাসলো কেন, চুলটা খোলা কেন, চোখের কোণের হাসিটা কী সম্মতির–এমন নানাভাবে নারীকেই দায়ী করা হয় ধর্ষণের জন্য। ধর্ষক এবং ধর্ষকের সহযোগীদের বক্তব্য শুনে বুঝি, খলের কখনও ছলের অভাব হয় না। তাদের কথা শুনে মনে হয়, ধর্ষকদের কবল থেকে বাঁচতে নারীকে সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকতে হবে, কারও সঙ্গে হেসে কথা বলা যাবে না, বেশি কথা বলা যাবে না, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যাবে না।

ধর্ষক বা ধর্ষকের সহযোগীরাই নয় শুধু, পরিবারের সদস্যরাই সবার আগে ধর্ষণের শিকার নারীটিকে দায়ী করে ফেলে–তুই কেন ওখানে গেলি, আর কারও সঙ্গে হয় না তোর সঙ্গেই হয় কেন, তুই কি বলেছিলি? জেরার পর জেরায় জেরবার হয় নির্যাতিত, বিপর্যস্ত হয়। অন্তত পরিবারকেও পাশে না পেলে অনেকে আত্মহত্যাও করেন। বলছিলাম পোশাকের কথা। পোশাকই যদি ধর্ষণের জন্য দায়ী হয়; তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতে প্রতিদিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটতো। আর কোনও মাদ্রাসায় ধর্ষণের কোনও ঘটনাই ঘটতো না। কিন্তু ঘটনা হলো উল্টো। আপনি ‘ধর্ষণ মাদ্রাসা’ লিখে গুগলে সার্চ দিলে গা শিউরে ওঠার মতো অসংখ্য ঘটনা পাবেন।

নারী-পুরুষ সবাই শালীন পোশাক পরবে, এটা সাধারণ সামাজিক ভদ্রতা। এর সঙ্গে ধর্মেরও কোনও সম্পর্ক নেই, ধর্ষণেরও কোনও সম্পর্ক নেই। পোশাক ব্যক্তির স্বাধীনতা যেমন, স্বাচ্ছন্দ্যও তেমন। যার যা খুশি পোশাক পরার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু আপনি কি কখনও কাউকে দিগম্বর হয়ে চলতে দেখেছেন। এটাই সমাজ, এটাই সভ্যতা। এমনকি ঢাকায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কাউকেই আপনি শর্ট প্যান্ট পরেও ঘুরতে দেখবেন না। পোশাকেরও দেশ-কাল-স্থান-পাত্র-আবহাওয়া ভেদ আছে। শীতের দেশে নারী-পুরুষ কেউ চাইলেও স্বল্প পোশাকে চলাফেরা করতে পারবে না। ঢাকার রাস্তায় শর্ট প্যান্ট যেমন বেখাপ্পা; আবার সমুদ্র সৈকতেও স্যুটেড-ব্যুটেড বা বোরকা পরা কাউকে বেখাপ্পা লাগবে। তাই ধর্ষণের দায় পোশাকের ওপর দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। ইসলামে যেমন নারীকে আবৃত থাকার কথা বলা হয়েছে, তেমনি পুরুষদের দৃষ্টিকে সংযত রাখার কথা বলা হয়েছে। আমরা নারীর পোশাক নিয়ে যত আলোচনা করি, পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয় নিয়ে তত আলোচনা করি না। পোশাক বিতর্কে সবশেষ আলোচনায় এসেছেন অনন্ত জলিল। অনন্ত জলিল সেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন শুধু।

ধর্ষকামী মানসিতার এই ধারাবাহিকতায় অনন্ত জলিলের যোগ্য উত্তরসূরি ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর। যে কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে নুরুল হক নুরের উত্থান, আমি বরাবরই নৈতিকভাবে সে আন্দোলনের বিরোধিতা করেছি। কিন্তু আমি তাদের দাবি জানানোর অধিকার, আন্দোলন করার অধিকারের প্রতিও পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সমর্থন জানিয়ে এসেছি। তাই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন না থাকলেও সে আন্দোলনে পুলিশি হামলা, বারবার নুরের ওপর ছাত্রলীগের হামলার নিন্দা জানিয়েছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি। স্রেফ মেরে মেরে নুরকে ডাকসুর ভিপি বানিয়েছে ছাত্রলীগ। এখন আয়োজন চলছে তাকে জাতীয় নেতা বানানোর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নুর এবং তার সংগঠনের আরও কয়েক নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে মামলা করলে তা রাজনীতিতে তুমুল আলোড়ন তোলে। অনেকে এমসি কলেজের ধর্ষক আর নুরদের ছবি পাশাপাশি রেখে ধর্ষকদের বিচার চেয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে দুটি ঘটনা এক মনে হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর মামলার সত্যতা নিয়ে আমার কোনও সংশয় ছিল না। কিন্তু ‘প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ এই টার্মটির ব্যাপারেই আমার একটু দ্বিমত আছে। আমি সবসময় বিশ্বাস করি দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যাই করুক, তা অপরাধ নয়। তবে আমার ভাবনার সঙ্গে কখনও কখনও ধর্মের, কখনও আইনের বিরোধ আছে। যেমন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ধর্মে নিষেধ, আর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন আইনের সংজ্ঞায় ধর্ষণ।

গ্রামের অনেক সহজ-সরল নারী পুরুষদের পাতা ফাঁদে বুঝে না বুঝে পা দেন। তাই তাদের সুরক্ষার জন্য আইনের এ ধারাটি আমি মেনে নিতে রাজি আছি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীও যখন ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’-এর অভিযোগে মামলা করেন, তখন কষ্ট পাই। উচ্চশিক্ষিত এই মেয়েটির অন্তত বোঝা উচিত ছিল কোনটা প্রেম আর কোনটা প্রলোভন। তবুও প্রচলিত আইনে যেহেতু অপরাধ, তাই মেয়েটির ধর্ষণের মামলার আসামির নিয়ম অনুযায়ী বিচার হবে, এটাই স্বাভাবিক। আদালত রায় দেবে তারা দোষী না নির্দোষ। তারপরও আমি ব্যক্তিগতভাবে নুরুল হক নুরকে বেনিফিট অব ডাউট দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ইদানীং নুর যেভাবে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ, রাজনীতিতে আসতে চাইছেন; তাতে তাকে হয়তো রাজনৈতিক কারণেই এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তাছাড়া এ মামলায় তার সম্পৃক্ততা সংগঠনের কর্মীদের বিচার না করা। একটাই ডাউট ছিল, বিচার তো করেনইনি, উল্টো নুর মেয়েটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে আমার এই অভিযোগটিও বিশ্বাস হয়নি। ডাকসুর একজন ভিপি একজন নারীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করার হুমকি দিয়েছেন, এটা ভাবতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে নিজেই হেয় হয়ে যাই।

এতকিছুর পরও আমি নুরকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে চেয়েছিলাম। কারণ সব বিরুদ্ধমত যখন পলাতক, নিশ্চুপ বা নিষ্ক্রিয়; তখন একমাত্র নুরই সাহস নিয়ে সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত বলে আসছিলেন। আমি চেয়েছিলাম, এই কণ্ঠটা অন্তত টিকে থাকুক। কিন্তু নুর প্রমাণ করলেন, তার ওপর আমার বিশ্বাসটাই আসলে ভুল ছিল। তিনি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারলেন। ভিকটিম ব্লেমিংয়ের সেই আদি ও অকৃত্রিম পথেই হাঁটলেন তিনি। নুরের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্যাতিত শিক্ষার্থীর অভিযোগ ছিল, তিনি তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করার হুমকি দিয়েছিলেন। নুর সেই হুমকিকেই কার্যকর করলেন, সেই মেয়েটিকে ‘দুশ্চরিত্রহীন’ বলে অভিহিত করে। যে ঘটনার উদাহরণ দিয়ে নুর মেয়েটিকে ‘দুশ্চরিত্রহীন’ বলেছিলেন, সে ঘটনায় তার সঙ্গী ছেলেটির চরিত্র নিয়ে কিন্তু নুর কোনও প্রশ্ন তোলেননি। তার মানে, সেই পুরনো কৌশল—সব দোষ মেয়েটির। মেয়েটির চরিত্রের ওপর দাগ দিয়ে দাও, ব্যস সব শেষ। গ্রামে হলে আগে দোররা বা পাথর মারা হতো। নুর ইদানীং সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করছেন। গণতন্ত্রের কথা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলছেন। আমি তার বক্তব্যের সঙ্গে, দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু সেই তিনিই যখন একটি টেলিভিশন বর্জনের ডাক দেন, সাংবাদিকের ফোন নম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন; আমি তার স্ববিরোধিতায় অবাক হই। এমন পুরুষতান্ত্রিক, স্ববিরোধী একজন মানুষ নাকি রাজনীতি করবেন, নেতৃত্ব দেবেন! আগে তাকে মানসিকতা বদলাতে হবে।

নোয়াখালীর ঘটনার পর দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের সময় ফেসবুকে একজন  লিখেছিলেন, ধর্ষণ কমাতে হলে পতিতালয় বৈধ করে দিতে হবে। আমি দ্বিমত করে বলেছি, যৌন উত্তেজনার কারণে পুরুষ ধর্ষণ করে না। পুরুষ ধর্ষণ করে নারীদের তার শক্তি ও ক্ষমতা দেখাতে।

ধর্ষকদের জন্য কঠোর শাস্তি অবশ্যই দরকার। কিন্তু অনন্ত জলিল-নুরুল হক নুরদের মতো মানসিকতার মানুষ যতদিন থাকবে, ততদিন ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না।

নারীদের পণ্য নয়, মানুষ ভাবতে হবে। মানসিকতা বদলাতে হবে। ভিকটিমের খুঁত না খুঁজে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

 

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ