ভয় কি পেলো অন্য যুবরাজেরা!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:৩৫, অক্টোবর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪০, অক্টোবর ৩০, ২০২০

রেজানুর রহমানএকটি ভিডিও চিত্র। প্রথমে ঘটনা বুঝতে পারিনি। যিনি ভিডিওচিত্রে কথা বলছেন তিনি আসলে কে? পরে ঘটনা বুঝলাম। বক্তা একটি নির্বাচনি প্রচারণা সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন। মেয়ের জামাইয়ের পক্ষে কথা বলছেন শ্বশুর মশায়। ‘আমার মেয়ের জামাই না হলেও এরকম ছেলেরা যদি এগিয়ে আসতো আমরা এদের জন্য কিন্তু কথা বলতাম। আজকে এখানে এসেছি জানি না নির্বাচন কমিশন থেকে লাল কার্ড না হলুদ কার্ড পাই। কারণ, আমাদের এমপিদের তো ভোট করা নিষেধ। আর আপনাদের একটা ভালো ছেলে উপহার দেওয়ার জন্য লাল কার্ড না হয় পেলামই, অসুবিধা কী? এই ছেলের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুণ হলো ও সন্ত্রাসী না। বড় গুণ হলো ও চাঁদাবাজ না। আরও বড় গুণ হলো–সে টাকার অভাবী না। আপনার পকেটে যাইয়া চাঁদাবাজি করবে না। আগে কারা কী করতো এগুলা তো আমাদের নলেজে কিছু আসছে। তবে এই ছেলের ব্যাপারে আমরা যদি এ ধরনের কোনও ইঙ্গিত পাই তাহলে আমি এবং গার্ডিয়ান হাজি সেলিম দুইজনে মিলে তাকে পিটানো হবে। এত বড় ‘আশ্বাস’ দেওয়ার পর আর কি কোনও কথা থাকে? আমি আমার জামাইকে নিয়ে গর্ব করি।’

একবার নয় কয়েকবার এই ভিডিওটি দেখলাম। বক্তৃতা মঞ্চে অন্যদের সঙ্গে সুবোধ বালকের মতো বসে আছে বহুল বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা হাজি সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিম। শ্বশুরের বক্তব্য চলার সময় তাকে এতটাই ভদ্র ও বিনীত দেখাচ্ছিল যে এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই ছেলে ভেতরে ভেতরে কী করে এতটা হিংস্র হয়ে উঠলো?

জবাব পেলাম ঢাকার একটি রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে। কেউ বেঞ্চ দখল করে, কেউবা দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলো আর তর্ক করছিল। তর্কের বিষয়, রাজনীতিবিদ হিসেবে হাজি সেলিমের উত্থান ও তার ছেলের কাণ্ডকীর্তি। একজন প্রায় সমাধান দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, শোনেন কথা কিন্তু একটাই– ‘বাপকা ব্যাটা, সেপাইকা ঘোড়া। কুচ নেহি তো থোড়া থোড়া!’

লোকটির কথা শুনে উপস্থিত অন্যরা দারুণ হৈ চৈ শুরু করে দিলো। তর্ক জমে উঠলো! যে তর্ক এখন গোটা দেশে বিদ্যমান। অফিস, আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চায়ের আড্ডা সর্বত্রই হাজি সেলিম ও তার গুণধর ছেলেকে নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা! সবার মুখে একটাই প্রশ্ন– হাজি সেলিম ও তার নিয়ন্ত্রিত ‘বাহিনী’ বলা যায় প্রকাশ্যে পুরনো ঢাকায় দিনের পর দিন অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। অথচ এতদিন কেন কেউ মুখ খোলেনি? হাজি সেলিমের পুত্র ইরফান ঢাকার রাস্তায় নৌবাহিনীর সম্মানীত একজন কর্মকর্তাকে সস্ত্রীক নাজেহাল না করলে কী তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড অধরাই থেকে যেতো! আবার আরও একটি প্রশ্ন জনমনে বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। সেদিনের ওই ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিটি যদি নৌবাহিনীর কর্মকর্তা না হয়ে সাধারণ কোনও মানুষ হতেন, তাহলে কি শেষ পর্যন্ত এমপি পুত্রের সাজা হতো?

দুই.

চুল কাটাবো বলে মগবাজারে একটি সেলুনে বসে আছি। সেলুনে তেমন ভিড় নেই। একটু দূরে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে বসে দু’জন লোক কথা বলছেন। একজন সবেমাত্র চুল কাটিয়েছেন। তার চুলে কলপ দেওয়া হয়েছে। চুল শুকানোর অপেক্ষায় আছেন। তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন অন্য লোকটি। বোঝা গেল দু’জনই সক্রিয় রাজনীতি করেন। তাদের মুখেও হাজি সেলিম ও তার পুত্রের কাহিনিই আলোচনা হচ্ছিলো। একজনের মন্তব্য শুনে অবাক হলাম। সরকারি দলের একজন নেতার নাম উল্লেখ করে তিনি বললেন, ভাই কিন্তু কাজটা ঠিক করে নাই। ভাই ইচ্ছা করলেই হাজি সেলিমের ছেলের ব্যাপারটা মিটমাট করে দিতে পারতেন। এখন কিন্তু ভাইয়ের পক্ষে নোয়াখালীর দিকে যাওয়াই মুশকিল হবে। তার কথা শুনে অন্যজন বললো, আমি আপনার কথার সাথে একমত হইতে পারতেছি না। সবকিছুর একটা সীমা আছে। বেশি বাড়াবাড়ি ভালো নয়। বলেই চলে যেতে চাইলেন তিনি। অন্যজন প্রশ্ন করলো– কই যাও? উত্তর এলো কোর্টের দিকে যাবো। উকিলের সাথে দেখা করতে হবে। তার কথা শুনে সাথের জন বললো, উকিলরে এখানেই আসতে বলো। যাওয়ার দরকার কী? সাথে সাথে উত্তর এলো– বড় উকিল। ডাকলে আসবে না। সাথের জন এবার বললো, লাগবা বাজি। আমি ফোন করবো। উকিল এখানেই আসবে। ভাত ছিটাইলে কাকের অভাব হয় না বুঝল্যা মিয়া...।

তিন.

টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ প্রচারমাধ্যমজুড়েই এখন একটাই আলোচিত বিষয় হাজি সেলিম ও তার পুত্র ইরফান। দৈনিক পত্রিকাসমূহে অনেক আকর্ষণীয় শিরোনাম ছাপা হচ্ছে প্রতিদিন। কয়েকটি শিরোনাম উল্লেখ করতে চাই। বাবার রাজ্যে ‘রাজা’ ইরফান। এক পরিবারে ৪০ দেহরক্ষী। ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া ছিলেন ইরফান। হাজি সেলিম, জমি দখলই যার নেশা। চকবাজারে হাজির তালা শাসন! হাজির শাসন। আতঙ্ক মুখেও তালা...।

শেষ শিরোনামটিই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাজির শাসন। আতঙ্ক মুখেও তালা। ইরফান সেলিম গ্রেফতার হওয়ার পরও অজানা আতঙ্কে এলাকায় নাকি অনেকে মুখ খুলছেন না। তার মানে এলাকার কারও কারও মনে কী এখনও সেই বিশ্বাসটিই রয়ে গেছে যে, এলাকায় হাজি সেলিম ও তার পুত্রের সদর্প আগমন আবার ঘটবে?

এতকিছুর পরও এলাকায় কেন স্বস্তি ফিরছে না এটাই জরুরি বিষয়। এক চকবাজারে হাজি সেলিম ও তার পুত্রের সীমাহীন দুর্নীতি ও দখলবাজিই কি দেশের একমাত্র অপরাধ চিত্র? না তা নয়। দেশের নানা প্রান্তে ক্ষমতার দম্ভে এমন অনেক পরিবার অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় দুর্নীতি করেই চলেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পিতা-মাতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অনেক ক্ষেত্রে তাদের সন্তানরাও ইরফানের মতো সন্ত্রাসী হয়ে উঠছে। যেন এক একজন নিজ নিজ এলাকার ‘যুবরাজ’। কাউকেই তোয়াক্কা করে না। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে এক একজন দারুণ পারদর্শী। ঢাকায় ইরফান গ্রেফতার হওয়ার পর মফস্বলের ওই সব ‘যুবরাজ’দের মনের ভেতরে কিছুটা হলেও ভয় ঢুকেছে। পাছে না তাদেরও গ্রেফতার হতে হয়।

এই ভয়কে কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি। একথা সকলেই মানবেন, রাজনীতিই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির উন্নয়ন অগ্রযাত্রার নিয়ামক শক্তি। তাই বলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কখনোই কারও কাম্য হতে পারে না। দেশকে ভালোবেসে ভালো থাকুন সকলে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ