ইউক্রেনের কাছে অন্তত ১২টি তুরস্কের নির্মিত বায়রাখতার টিবি২ ড্রোন রয়েছে। আর খবরে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাদের কাছে আরও ৩৬টি অতিরিক্ত ইউনিট থাকতে পারে। এই একই ড্রোন ২০২০ সালে নাগোরনো-কারবাখ সংঘাতে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে আজারবাইজান।
ইউক্রেন ২০১৯ সালে তুরস্কের কাছ থেকে প্রথমবারের মতো স্বল্প উচ্চতায় উড়তে সক্ষম মনুষ্যহীন এই আকাশযানের ছয়টি কিনেছিল। ছয় কোটি ৯০ লাখ ডলারের চুক্তিতে এসব ড্রোন কেনা হয়। প্রতিটি বায়রাখতার টিবি২ সিস্টেমে রয়েছে ছয়টি ড্রোন, দুটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং আনুষঙ্গিক সামগ্রী। ফলে প্রাথমিকভাবে ইউক্রেন একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম কেনে। এসব ড্রোনের পাল্লা তিনশ’ কিলোমিটারের বেশি। টিকে থাকতে পারে ২৭ ঘণ্টা পর্যন্ত আর বহন করতে পারে চারটি পর্যন্ত লেজার গাইডেড অস্ত্র।
রুশ আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইউরি ইগনাট জানান, তাদের কাছে প্রায় ২০টি বায়রাখতার ড্রোন রয়েছে। ইউক্রেনে কতটি ড্রোন সরবরাহ করা হয়েছে তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তুরস্ক এবং ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ।
বায়রাখতার টিবি২ ড্রোন প্রথম নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেয় লিবিয়া ও সিরিয়ায়। রাশিয়ার তৈরি আকাশযানের বিরুদ্ধে এগুলো এসব স্থানে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে তুরস্ক। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সংঘাতে ড্রোনটি নিজের সুনাম ধরে রাখে। এসব সংঘাতে ড্রোনটি সফলভাবে সামরিক যান এবং ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এই ড্রোন?
আগ্রাসন শুরুর পর রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউক্রেনের বায়রাখতার টিবি২ ড্রোন ব্যবহারের কথা প্রথম জানা যায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ইউক্রেনের জেনারেল সেরহাই সাপতালা টুইটারে একটি ভিডিও ফুটেজ শেয়ার করেন। তাতে দেখা যায়, কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় একশ’ কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার একটি বিইউকে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে টিবি২। এরপর ইউক্রেনের বিমান বাহিনী রুশ লক্ষ্যবস্তুতে দুটি হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তবে আরও অনেক হামলার তথ্য সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
টিবি২ ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ইউক্রেন লাভ করে গত বছর। ২০২১ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী ডনবাস অঞ্চলে টিবি২ ড্রোন ব্যবহারের কথা নিশ্চিত করে। ওই সময় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলটিতে রাশিয়ার ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা মোতায়েন থাকার পরও ড্রোন হামলায় সফলতার দাবি করে ইউক্রেন। হামলার পর মস্কো অভিযোগ তোলে, কিয়েভ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। জবাবে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেকসি রেজনিকভ বলেন, ইউক্রেন মাত্র একবারই ড্রোনটি ব্যবহার করেছে। আর তারপরই শত্রু সেনারা আর কখনোই ড্রোন সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি।
ডনবাস অঞ্চলে হামলার পর ইউক্রেন আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানায়, রুশ আগ্রাসন রুখতে এবং ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষায় তারা বায়রাখতার ড্রোন যুদ্ধে ব্যবহারের কৌশল ও পদ্ধতি বাড়ানো অব্যাহত রাখবে।
এগুলো কতটা স্পর্শকাতর?
বায়রাখতার টিবি২-এর মতো বর্তমান প্রজন্মের ড্রোনগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান হামলা এবং ইলেক্ট্রনিক্স যুদ্ধাস্ত্র শনাক্ত করতে সক্ষম। বায়রাখতার টিবি২-এর গতি ধীর, আকারে বড়, কম উচ্চতায় উড়তে সক্ষম এবং দূরনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এটি সহজে আঘাত হানতে পারে। তুলনামূলক দুর্বল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইলেক্ট্রনিক্স যুদ্ধাস্ত্র ফাঁকি দিয়ে স্পর্শকাতর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পেরেছে এটি। এছাড়া নাগোরনো-কারবাখ এবং লিবিয়ায় এর সফলতার জন্য পুরনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও খানিকটা দায়ী।
এখন পর্যন্ত রাশিয়ার হাতে থাকা সমন্বিত এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে বায়রাখতার টিবি২-এর মতো বর্তমান প্রজন্মের ড্রোনগুলো কতটা কার্যকর তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ খুব কম পাওয়া যায়। এছাড়া আগে বায়রাখতার টিবি২ ড্রোনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবহারের কারণে এগুলোকে শনাক্ত করা এবং দ্রুত লক্ষ্যবস্তু বানানোর সক্ষমতা রুশ বাহিনীর রয়েছে। এছাড়া এসব ড্রোন যেখান থেকে পরিচালনা করা হয়, সেগুলো ধ্বংস করতে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্থল বাহিনী ব্যবহার করতে পারে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তাদের বাহিনী ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ৭৪টি স্থল অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে ১১টি বিমান ঘাঁটি, তিনটি কমান্ড পয়েন্ট, একটি নৌঘাঁটি, ১৮টি রাডার স্টেশন রয়েছে।
ইউক্রেনে এখন পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে আকাশ কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারেনি রাশিয়া। সক্ষমতা থাকার পরও রাশিয়া কেন ইউক্রেনের বায়রাখতার টিবি২ ভূপাতিত রাখতে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। হতে পারে ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মাত্রায় হতবাক হয়েছে রাশিয়া।
তবে ইউক্রেন অন্যান্য আকাশ সরঞ্জামের পাশাপাশি বায়রাখতার টিবি২ ড্রোনসহ সব সামগ্রী মোতায়েন রেখে রাশিয়ার ট্যাংক, ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানা অব্যাহত রাখবে। অন্তত যতক্ষণ তাদের সক্ষমতা থাকবে।
সূত্র: কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স









