রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনের যুদ্ধ একটি নতুন, সম্ভবত আরও বিপজ্জনক দিকে মোড় নিচ্ছে। এক মাস লড়াইয়ের পর সংখ্যায় অনেক কম থাকা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর প্রতিরোধে থমকে আছে রুশ সেনারা। এমন পরিস্থিতিতে পুতিনের সামনে কঠোর বিকল্প রয়েছে- কীভাবে ও কখন স্থলবাহিনীকে পুনরায় শক্তিশালী করবেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীকে পশ্চিমাঞ্চলে আক্রমণ করবেন কিনা এবং যুদ্ধের ব্যয় কতটা বাড়াবেন বা সংঘাত কতটা বিস্তৃত করবেন।
ইউক্রেনে দ্রুত জয়লাভে ব্যর্থতার পর নিষেধাজ্ঞাসহ আন্তর্জাতিক নিন্দা ও চাপের মুখে পিছু হটছেন না পুতিন। মোটা দাগে পুতিনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব। কিন্তু রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে সম্প্রচারিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়াতে যুদ্ধের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন রয়েছে।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা কম। কিন্তু তারা ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণের সুবিধা পাচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে বিদেশি অস্ত্র ও নৈতিক সমর্থন। তারা আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসের নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে আক্রমণকারী বাহিনী নিজেদের পুনরায় সংগঠিত করতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইউক্রেনে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে না পারা এই যুদ্ধের অবাক করা ঘটনা হতে পারে। পুতিনের নেতৃত্বে দুই দশক ধরে আধুনিকায়নের পরও তার বাহিনীর প্রস্তুতি ছিল দুর্বল, সমন্বয়ে দুর্বলতা এবং আশ্চর্যজনকভাবে ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো। যুদ্ধে রুশ সেনাদের হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। যদিও ন্যাটো ধারণা করছে, প্রথম চার সপ্তাহে ইউক্রেনে রাশিয়ার ৭ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনা নিহত হয়েছে। আফগানিস্তানে এক দশকের যুদ্ধেও প্রায় রাশিয়ার এত সেনার প্রাণহানি হয়েছিল।
সিআইএ’র সাবেক প্রধান ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বলেন, সেনাবাহিনীর দক্ষতায় পুতিন হয়তো অত্যাশ্চর্যভাবে হতাশ। ইউক্রেনে আমরা দেখছি রুশ সেনারা আক্রমণের কারণ জানে না, তাদের প্রশিক্ষণ খুব ভালো না এবং কমান্ড ও কন্ট্রোলে অনেক বড় সমস্যা রয়েছে।
বাইরে থেকে যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ করা কঠিন। কিন্তু কয়েকজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলছেন, তারা ইউক্রেনে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করছেন। ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে এয়ার ভাইস-মার্শাল মাইক স্মিথ জানান, ব্রিটিশ গোয়েন্দা পর্যালোচনা অনুসারে ইউক্রেনের সেনারা কিয়েভের পশ্চিমাঞ্চলীয় দুটি শহর রুশ বাহিনীর কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করেছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে স্মিথ বলেন, ইউক্রেনের সফল পাল্টা আক্রমণে রুশ সেনাদের পুনরায় সংগঠিত ও কিয়েভে আক্রমণ করা বিঘ্নিত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের নৌবাহিনী জানায়, তারা বারদিয়ানস্ক বন্দর শহরে রাশিয়ার একটি বড় যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে।
ইউক্রেনীয়দের দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে পড়া রুশ বাহিনী শহরাঞ্চলে বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। কিন্তু এরপরও তারা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য কিয়েভ দখলে তেমন কোনও অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। বুধবার পেন্টাগন জানিয়েছে, কিয়েভের দিকে অগ্রসর হওয়া বাদ দিয়ে কিছু রুশ শহরটির উপকণ্ঠে রক্ষণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রুশ সেনারা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলর প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, রাশিয়ার বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম।
২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে আক্রমণ শুরুর আগে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন, পুতিন খুব স্বল্প সময়ে কিয়েভ দখল করে নেবেন। হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে। আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী পরাজিত হবে। পুতিনও হয়তো এমন দ্রুত জয়ের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন। এ কারণেই যুদ্ধের শুরুতে ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র ও সাইবার হামলা সীমিতভাবে চালিয়েছেন।
দ্রুত কিয়েভ দখলে ব্যর্থতার পর পুতিন ইউক্রেনীয় শহরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ ও বোমাবর্ষণের কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছেন।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি বিষয়ক অধ্যাপক স্টিফেন বিডল জানান, পুতিনের যুদ্ধনীতি পরিবর্তনের কারণ হতে পারে তিনি হয়তো আশা করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হাল ছেড়ে দেবেন।
বিডল বলেন, এই পরিকল্পনায় ফল আসার সম্ভাবনা কম। নির্দোষ বেসামরিকদের হত্যা, তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করার ফলে ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ ও সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে।
পেন্টাগনের প্রেস সচিব জন কিরবির মতে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী কিছু এলাকায় পাল্টা হামলা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো মিত্ররা বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও সশস্ত্র ড্রোনসহ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও সরঞ্জামের সরবরাহ বাড়ালেও ইউক্রেনকে অসম যুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রসহ দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছেন বাইডেন। গত সপ্তাহে তিনি ইউক্রেনের জন্য ৮০০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজের অনুমোদন দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সাবেক জেনারেল ও ইউরোপে ন্যাটোর শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে কাজ করা পিলিপ ব্রিডলাভ জানান, ইউক্রেন হয়তো সরাসরি যুদ্ধ জিতবে না। কিন্তু এই ফল আলোচনার টেবিলে জেলেনস্কিকে সুবিধা দেবে।
তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া পরাজিত হবে বলে আমি মনে করি না। কারণ, রাশিয়ার রিজার্ভে আরও অনেক সেনা রয়েছে। কিন্তু রাশিয়াকে যে ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে তা বিবেচনায় নিলে ইউক্রেনকে জয়ী শক্তি দেখা যাবে। ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে ইউক্রেনের সঙ্গে হয়তো রাশিয়া একটি চুক্তির পর সেনা প্রত্যাহার করতে পারে। আমি মনে করি এমন একটি সুযোগ রয়েছে।
এপি অবলম্বনে।









