ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আক্রমণের ছয় মাস গড়িয়েছে। এই যুদ্ধ রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনীতি নিয়ে মৌলিক ধারণা পাল্টে দিয়েছে।
এই বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র যখন সম্ভাব্য যুদ্ধের বিষয়ে সতর্ক করেছিল তখন ওয়াশিংটন ও ইউরোপের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা ধারণা করছিলেন রাশিয়া বৃহৎ ও অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী দ্রুত ইউক্রেনীয় বাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। তারা আরও ধারণা করেছিলেন, পুতিন নিজেকে দুর্বল দেশীয় অর্থনীতির কারণে নিজেকে আবদ্ধ হিসেবে আবিষ্কার করবেন।
এমনকি মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলি দেশটির কংগ্রেসকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আক্রমণ শুরুর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কিয়েভের পতন হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, রুশ মুদ্রা রুবলকে ‘রাবল’ (ধ্বংস্তূপ)-এ পরিণত করবেন। আর ক্রেমলিনে পুতিন ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা ইউক্রেনকে অযোগ্য নেতৃত্ব থাকা একটি বিভক্ত দেশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, যে দেশের লড়াইয়ের মনোভাব থাকবে না।
৬ মাস পর এখন এসব প্রত্যাশা ভয়াবহ ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ইউক্রেন যখন যুদ্ধের ছয় মাস পার করছে, এখনও স্বাধীন হিসেবে বহাল রয়েছে এবং যুদ্ধের পরিণতি অনিশ্চিত। তবে এর মধ্যে এটি স্পষ্ট হয়েছে পুতিন যেমনটি আশা করছিলেন রাশিয়া একটি বৈশ্বিক সামরিক শক্তি, বাস্তবে তা প্রতীয়মান হয়নি। ইউক্রেনে তার আক্রমণের পরিকল্পনা রাশিয়ার প্রচলিত সক্ষমতা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। এই আক্রমণে পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারণ নিশ্চিত হয়েছে। নিরপেক্ষ অবস্থান বাদ দিয়ে জোটে যোগ দিচ্ছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড।
স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রুজ-এর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক ফিলিপস ও’ব্রায়েন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা এমনকি ন্যাটোর ক্ষুদ্র বাহিনীর সমকক্ষ নয় রাশিয়া। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, ব্রিটিশ বা ফরাসি কিংবা ইসরায়েলিরা যেভাবে জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে, রাশিয়ার সেই সক্ষমতা নেই। এক্ষেত্রে এমনকি দ্বিতীয় সারির সামরিক শক্তি নয় রাশিয়া।
যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের ব্যাপক অবকাঠামো, শহর, নগর ও ভারী সামরিক ক্ষয়ক্ষতির হয়েছে। সংঘাতের কারণে কয়েক লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন এবং দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছে।
এরপরও প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধকালীন দৃঢ় নেতা হিসেবে হাজির হয়েছেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনী দ্বারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও দেশকে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছেন। রুশ সেনাবাহিনী বাধ্য হয়েছে রাজধানী কিয়েভ দখল থেকে পিছু হটতে এবং পূর্বাঞ্চলে নিজেদের শক্তি সমাবেশ করতে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অত্যাধুনিক অস্ত্রের সরবরাহ পাচ্ছে ইউক্রেন। যদিও এখনও সফলভাবে বড় আকারের পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা দেখাতে পারেনি তারা। আর দেশটির মিত্ররা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে।
রাশিয়ার অর্থনীতির ধসে পড়া নিয়ে করা পূর্বাভাসও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল রাশিয়ার জিডিপির ভয়াবহ পতন হবে। কিন্তু বিপর্যয়কর কিছু ঘটেনি। জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে রাজস্বের প্রবাহ বজায় ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্ররা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তাদের পথে হাঁটেনি, মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে রাশিয়া। এটিকে তারা অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং সরবরাহ বন্ধের প্রভাব কমাতে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রস্তুতি নিয়েছে। তবু ফিনল্যান্ড ও জার্মানি কিছু দিন আগে নিজেদের নাগরিকদের কঠিন পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করেছে।
১৯৮০-এর দশকের মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি মাত্র ২০ টি দূরপাল্লার হিমার্স রকেট ব্যবস্থা মোকাবিলা করার কোনও সমাধান এখনও পায়নি রাশিয়া। এগুলো দিয়ে ইউক্রেনীয় সেনারা রুশ অস্ত্র গুদাম ও রসদ সরবরাহ ধ্বংস করছে।
ও’ব্রায়েন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৪০টি হিমার্স ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ধারে কাছেও নেই।
সূত্র: ব্লুমবার্গ









