পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটো ও রুশ সেনাবাহিনী তাদের পরিকল্পিত বার্ষিক পারমাণবিক মহড়া বুধবার শুরু করেছে। এমন সময় দুই বিরোধী পক্ষ এই মহড়া আয়োজন করছে যখন রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তেজস্ক্রিয় ‘ডার্টি বোমা’ ব্যবহারের পরিকল্পনার অভিযোগ এনেছে। আর পশ্চিমারা এই অভিযোগকে রাশিয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করছে। একই সময়ে ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে বুধবার ৪০টিরও বেশি গ্রামে বোমা বর্ষণ করেছে রুশ সেনারা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি’র প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে রুশ পারমাণবিক বাহিনীর মহড়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। এতে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের অনুশীলন করা হয়েছে। যা বিশ্বকে রুশ সেনাবাহিনীর শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু পুতিনকে জানিয়েছেন, এই মহড়ায় রাশিয়ার ওপর পারমাণবিক হামলার জবাব হিসেবে বড়ধরনের পারমাণবিক হামলার অনুশীলন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বার্ষিক পারমাণবিক মহড়ার বিষয়ে রাশিয়া তাদেরকে অবহিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো তাদের পরিকল্পিত বার্ষিক পারমাণবিক মহড়া আয়োজন করেছে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে।
কোনও প্রমাণ হাজির করা ছাড়াই রুশ টিভিতে প্রচারিত ভাষণে পুতিন বলেছেন, উসকানি দিতে ইউক্রেন তথাকথিত ডার্টি বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রাশিয়াকে আঘাত করায় ব্যবহার করছে এবং অঞ্চলটির মার্কিন মিত্ররা ইউক্রেনকে সামরিক-জৈব রাসায়নিক অস্ত্রের পরীক্ষার ভূখণ্ড হিসেবে পরিণত করেছে।
পুতিনের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ডার্টি বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনার বিষয়ে অভিযোগ এই প্রথম। গত সপ্তাহজুড়ে রুশ কর্মকর্তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করে আসছেন।
ইউক্রেন ও দেশটির মিত্ররা রাশিয়ার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা জানিয়েছে। রণক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া রাশিয়া নিজেরাই ডাটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। তেজস্ক্রিয় এমন বোমার বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে কিংবা পারমাণবিক অস্ত্রের গুদামে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
বুধবার রুশ শোইগু ফোনে কথা বলেছেন, চীন ও ভাররে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে। আলোচনায় তিনি ডার্টি ব্যবহার করে ইউক্রেনের সম্ভাব্য উসকানি নিয়ে মস্কোর উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। ন্যাটোর মহাসচিব জেন্স স্টোলটেনবার্গ রাশিয়ার ‘অপ্রমাণিত’ অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পশ্চিমাদের প্রত্যাখ্যানের পরও ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জোর দিয়ে বরেছেন, ইউক্রেন এমন সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মস্কোর কাছে তথ্য রয়েছে।
স্লোভেনিয়ার সরকার বলেছে, ডার্টি বোমার বিষয়ে রাশিয়া একটি অপপ্রচার অভিযান শুরু করেছে। তাদের দাবি, রাশিয়া ২০১০ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংস্থার একটি ছবি ব্যবহার করছে।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ডার্টি বোমা নিয়ে অপ্রমাণিত অভিযোগ করলেও পুতিন কিয়েভের সঙ্গে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সর্বশেষ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে গিনি বিসাউয়ের প্রেসিডেন্ট উমারো মখতার সিসোকো এম্বালোর কাছ থেকে। তিনি কিয়েভ সফর করে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এক সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার পূর্ব শর্ত হলো ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড, সীমান্ত ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে মস্কোকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
যুদ্ধরত দুটি দেশে সীমিত কয়েকটি ইস্যুতে এখন পর্যন্ত সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে। যেমন- যুদ্ধবন্দি বিনিময় ও নিহত সেনাদের মরদেহ বিনিময়।
যুদ্ধক্ষেত্রের অগ্রগতির বিষয়ে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ৪০টিরও বেশি গ্রামে লড়াই চলছে। বুধবার অন্তত দুই বেসামরিক নিহত হয়েছে। প্রতিরাতে বিমান হামলার সংকেতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ বলেছে, রাশিয়া পাঁচটি রকেট হামলা, ৩০টি বিমান হামলা এবং শতাধিক মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট ব্যবস্থা দিয়ে ইউক্রেনীয় নিশানায় হামলা করেছে।
ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাশিয়ার একটি ডনিপ্রো শহরের একটি গ্যাস স্টেশনে আঘাত করেছে। এতে দুজন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে স্বামীর সঙ্গে গাড়িতে থাকা ২৫ বছর বয়সী এক অন্তঃস্বত্তা নারীও ছিলেন। মঙ্গলবার শেষ রাতের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
মস্কো মনোনীত কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, বুধবার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরের একটি পুলিশ স্টেশন ও শিল্প নগরী খেরসনে গ্রেনেড দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনের নাশকতাকারীরা। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী মাইকোলাইভে কয়েকটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হতাহতের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানাতে পারেনি। বুধবার ভোরেও হামলা হয়েছে।









