ইউক্রেনে রুশ যুদ্ধের দেড় মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তনভ মার্কিন সাময়িকী নিউজউইকের কাছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি কথা বলেছেন এই বিশেষ সামরিক অভিযানে কারণ, রাশিয়ার বিস্তারিত দাবি এবং দাবিগুলো মেনে নিলে কীভাবে ইউরোপের বৃহত্তম দুটি দেশের সংঘাত বন্ধ হতে পারে তা নিয়ে।
ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলেছে কিয়েভ। তবে রুশ রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, ইউক্রেনের জাতিগত শুদ্ধি অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোতে দেশটির যোগদানের সিদ্ধান্তই এই যুদ্ধের কারণ।
আনাতোলি আন্তনভ বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির আওতায় কিয়েভের শাসকরা রুশদের গণহত্যা বন্ধ করতে অস্বীকৃতির ফলাফল হলো ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান। ন্যাটো জোটে ইউক্রেনের যোগদানের সিদ্ধান্তও কারণ।
তিনি দাবি করেন, ২৪ ফেব্রুয়ারির অভিযানের বীজ আট বছর আগে রোপন করা হয়েছিল। যখন ইউরোময়দানে বিক্ষোভের ফলে মস্কোর ঘনিষ্ঠ ইউক্রেনীয় সরকারের পতন ঘটিয়ে পশ্চিমাপন্থী প্রশাসনকে ক্ষমতায় বসানো হয়।
আন্তনভের মতে, রাশিয়ার কাছে এই বিপ্লব ছিল পশ্চিমাদের উসকানিতে রক্তাক্ত অভ্যুত্থান এবং যার মাধ্যমে উগ্রজাতীয়তাবাদীরা কিয়েভের ক্ষমতায় আসে। তারা বেশ কয়েকটি নীতি গ্রহণ করে যা ছিল শত্রুতামূলক। যেমন, জাতীয় ভাষার তালিকা থেকে রুশ ভাষাকে বাদ দেওয়া, জাতীয়তাবাদী নেতাদের পুনর্বাসন।
২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। রুশ সেনারা ক্রিমিয়া দখল করে। কৃষ্ণ সাগর উপত্যকায় রুশ জাতির মানুষদের সুরক্ষায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে দাবি রাশিয়ার। কাছাকাছি সময়ে মস্কোপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। দোনেস্ক ও লুহানস্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে কিয়েভ ও বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত। এই সংঘাতে উভয়পক্ষের প্রায় ১৪ হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়। দুই দফা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। মিনস্ক চুক্তির পরও উত্তেজনা খুব একটা প্রশমিত হয়নি।
আন্তনভ দাবি করেন, কিয়েভ শাসকদের জাতীয়তাবাদী মনোভাবের ফলে মিনস্ক চুক্তির মৃত্যু ঘটে এবং তারা দ্রুত সামরিকায়নের পথে অগ্রসর হয়। ন্যাটো জোটের সদস্যরা ইউক্রেনে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে থাকে। পশ্চিমা অস্ত্র আসতে থাকে স্রোতের মতো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার ঘোষণা দেন। যা শুধু প্রতিবেশী রাশিয়া নয়, বিশ্বের জন্য হুমকি হতো।
অবশ্য ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বারবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছেন। জাতিসংঘের আণবিক সংস্থাও রাশিয়ার দাবি খারিজ করেছে।
আন্তনভ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে দোনেস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতির বিকল্প ছিল না রাশিয়ার কাছে। এরপর জাতিসংঘ চার্টারের ৫১তম ধারা অনুসারে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি বিশেষ সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। এর লক্ষ্য ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ ও নাৎসিমুক্ত করা। কিয়েভের শাসকদের দ্বারা গণহত্যা বন্ধ করা এবং ইউক্রেন যাতে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় তা নিশ্চিত করা।
ইউক্রেনকে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা বা ইউক্রেন দখল রাশিয়ার সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নয় বলে দাবি করেন রুশ রাষ্ট্রদূত। একই সঙ্গে বুচাসহ অন্যান্য শহরে বেসামরিকদের নিশানা করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি।
চলমান শান্তি আলোচনায় রাশিয়া কী চাইছে তাও উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেন, সংঘাত বন্ধের জন্য আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আর তা হলো রাশিয়ার নিরাপত্তা স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে শর্তহীনভাবে, ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ ও নাৎসিমুক্ত করণ, নিরপেক্ষ অবস্থান ও অপারমাণবিক রাষ্ট্র, ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং ডোনেস্ক ও লুহানস্কের স্বাধীনতার স্বীকৃতি মেনে নিতে হবে।
জেলেনস্কি ও তার প্রশাসন ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের সিদ্ধান্ত বাদ দিতে সম্মত থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ না করার বিষয়েও ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু ক্রিমিয়া, ডনবাস ও লুহানস্ক নিয়ে ভূখণ্ডগত বিষয়ে সমঝোতা করতে তারা রাজি না। অঞ্চল তিনটি নিয়ে তাদের অবস্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে।
আন্তনভ জানান, মস্কো দ্রুত সংঘাতের অবসান চাইছে। সংঘাত বন্ধ, ডনবাসে শান্তি এবং সব ইউক্রেনীয়দের জন্য শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিতে একটি উপায়ের জন্য আলোচনার পথ খুঁজতে রাশিয়া সম্ভাব্য সবকিছু করছে।









