X
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪
৮ শ্রাবণ ১৪৩১

এমপি আজীমকে আগেও যেভাবে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল

নুরুজ্জামান লাবু
২৫ মে ২০২৪, ২২:০১আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ২৩:০৫

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে কলকাতার নিউ টাউনের সঞ্জিভা গার্ডেন্সের একটি ফ্ল্যাটে খুন করা হয়েছে। তবে শুধু এবারই নয়, এর আগেও আজীমকে দুবার হত্যাচেষ্টা করা হয়েছিল। নির্বাচনের আগে ঝিনাইদহে তাকে গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিল খুনিরা। এ জন্য রেকিও করেছিল।

এ ছাড়া চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায়ও একবার তাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। কিন্তু দুবারই নিরাপত্তার কারণে খুনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে খুনিরা। তৃতীয়বার কলকাতায় সফল হয় তারা।

গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

উদ্দেশ্য ছিল টাকা আদায়
এদিকে আজীম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তিন সদস্যের একটি দল রবিবার (২৬ মে) কলকাতায় যাবে। তারা কলকাতায় খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার জাহিদ ওরফে জুবেইরকে জিজ্ঞাসাবাদসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও লাশের খণ্ডিত অংশ উদ্ধারেও শামিল হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেছেন, ‘এর আগেও দুবার সংসদ সদস্য আজীমকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা তখন ব্যর্থ হয়। তাদের আসল পরিকল্পনা ছিল আজীমকে হত্যা করা। সে মোতাবেক আসামিরা আজীমকে কলকাতার সেই ফ্ল্যাটে নিয়ে দুই দিন রেখে ব্ল্যাকমেল করে কিছু টাকা আদায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগের কারণে পরিকল্পনার বদলে তাকে হত্যা করা হয়।’

মোটরসাইকেল চলার সময় খুনের সিদ্ধান্ত
গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি আমান ওরফে শিমুল জানিয়েছেন, আক্তারুজ্জামান শাহীনের সঙ্গে আজীমের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল আগে থেকেই। এ জন্য নির্বাচনের আগেই আজীমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন শাহীন। তাকে হত্যার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেবার তারা আজীমকে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা করেন। আনোয়ারুল আজীম কালীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর ভূষণ স্কুল রোডের আওয়ামী লীগ অফিসে বসতেন। এ ছাড়া তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে একাই ঘুরে বেড়াতেন। মোটরসাইকেল চলার সময় বা অফিসের পাশে তাকে গুলি করে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়।

আমান ওরফে শিমুল জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য আজীমকে হত্যার জন্য তারা সে সময় রেকি করেছিলেন। তারা দেখেছেন, আজীম আওয়ামী লীগ অফিসে থাকা অবস্থায় জরুরি কোনও ফোন এলে বাইরে নির্জন জায়গায় গিয়ে কথা বলতেন। তারা সেখানেই তাকে গুলি করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু নিজের এলাকায় সংসদ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করলে সারা দেশে বিষয়টি চাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে এবং পুলিশ তাদের তাৎক্ষণিক ধরে ফেলতে পারে, এ জন্য সেই পরিকল্পনা বাতিল করে।

ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করার পরিকল্পনা
ঝিনাইদহে হত্যার পরিকল্পনা বাতিল করে কলকাতায় হত্যার পরিকল্পনা করা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে এমনটা জানিয়ে আমান ওরফে শিমুল বলেন, এ জন্য চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি আক্তারুজ্জামান শাহীন ও আমান তাদের সহযোগীদের নিয়ে কলকাতায় যায়। ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় যান আনোয়ারুল আজীম। শাহিনের পরিকল্পনা ছিল আজীমকে গাড়িতে তোলার পর ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করে হত্যা করা হবে।

আক্তারুজ্জামান শাহিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে আমান জানান, কলকাতায় শাহিন গাড়ির ড্রাইভিং সিটে থাকবেন। সংসদ সদস্য আজীমকে বসানো হবে চালকের বাঁ দিকের আসনে। পেছনে আমান ওরফে শিমুল নিজে থাকবেন। আমান পেছন থেকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে সংসদ সদস্যকে অচেতন করবেন। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করে হাতিশালার বর্জ্য খাল এলাকায় তার মরদেহ ফেলে দিয়ে আসবে। কিন্তু সেবারও শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বাতিল করে তারা।

কারণ হিসেবে আমান জানিয়েছেন, ব্যবসার কাজে সংসদ সদস্য আজীম সেবার দুই কোটি ভারতীয় রুপি নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন। তার অন্য ব্যবসায়িক পার্টনারদের এই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। আক্তারুজ্জামান শাহীন বিষয়টি জানতেন। পরে শাহীন তার সঙ্গে আলোচনা করেন, যদি আজীমকে তারা হত্যার পর লাশ গুম করেন, তাহলে আজীমকে না পেয়ে ব্যবসায়িক পার্টনাররা তার খোঁজ করবেন। খোঁজ না পেলে থানায় জিডি বা পুলিশকে জানাতে পারেন, এই ভয়ে সেবারও খুনের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।

ধরা পড়লেও কিছু করতে পারবে না
জিজ্ঞাসাবাদে আমান আরও জানান, এরপর থেকে তারা নিখুঁত পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন। তখন আজীমকে হত্যার পর মরদেহ গুমের দিকে বেশি গুরুত্ব দেন। আমানের ভাষ্য, মরদেহ না পেলে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তাদের কিছু করতে পারবে না। এ জন্য সময় নিয়ে কলকাতার ফ্ল্যাটে হত্যার পর মরদেহ কেটে আলাদা করে ফেলা হয়। মাংসগুলো কিমা বানিয়ে বাথরুমের কমোডে ফ্ল্যাশ করা হয়। আর হাড় ও খুলি আলাদা পলিথিনে ভরে বাইরে নিয়ে একাধিক স্থানে ফেলে দেয়।

গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তৃতীয়বারের হত্যা পরিকল্পনায় তারা সফল হয়েছিল। তাদের শনাক্ত করাও কঠিন ছিল। কিন্তু অপরাধীরা সব সময় কিছু না কিছু একটা ক্ল রেখে যায়। একটি মাত্র ক্ল থেকে আজীম হত্যা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। এখন আক্তারুজ্জামান শাহীনকে ধরতে পারলে পুরো হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনির সবকিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

কলকাতায় যাচ্ছে গোয়েন্দা দল
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম হত্যার তদন্তে তিন সদস্যের গোয়েন্দা দল রবিবার সকালে কলকাতায় যাবে। এ দলে আছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ, গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার আব্দুল আহাদ ও গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমান। তারা সাত দিন অবস্থান করে কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া জাহিদ ওরফে জুবায়েরকে জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করবেন। এ ছাড়া আজীমের মরদেহের টুকরো অংশ কোথায় ফেলা হয়েছে, তার কিছু ক্লু ধরে তা উদ্ধারের চেষ্টা করবেন।

গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এই ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। এখন মূল কাজ হলো কিলার গ্রুপের সব সদস্যকে গ্রেফতার করা এবং সংসদ সদস্য আজীমের মরদেহের যেকোনও অংশ উদ্ধার করা।

খুনি ও পরিকল্পনাকারীদের সবাইকে গ্রেফতার করতে পারলে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ শতভাগ পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

/এনএআর/
টাইমলাইন: ভারতে এমপি আনোয়ারুল আজীম নিহত
সম্পর্কিত
নায়িকার ড্রাইভার যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর পিয়ন, গড়েছেন সম্পদের পাহাড়
দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সময়োপযোগী: টিআইবি
যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেলেন ৪০০ কোটির পিয়ন
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা (১৯ জুলাই, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (১৯ জুলাই, ২০২৪)
দিনাজপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, আ.লীগ কার্যালয় ভাঙচুর
দিনাজপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, আ.লীগ কার্যালয় ভাঙচুর
কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি: জিএম কাদের
কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি: জিএম কাদের
গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক নিহত
গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক নিহত
সর্বাধিক পঠিত