X
রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪
১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

সাংবাদিকতার কারণে ৬০০ বারের বেশি আদালতের কাঠগড়ায় কাজী শাহেদ

সালমান তারেক শাকিল
২৯ আগস্ট ২০২৩, ২০:০৯আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ০০:২২

আশির দশকের শেষ দিকে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের পথ ধরেই বাংলাদেশের সংবাদপত্রের নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। কাজী শাহেদ আহমেদের হাত ধরে ১৯৯১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাজারে আসে দৈনিক আজকের কাগজ। এটি কেবল একটি পত্রিকাই ছিল না। বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শনের ভিত্তিতে মূলত একটি বিপ্লব ঘটায় দৈনিক আজকের কাগজ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রত্যয় নিয়ে পথ চলতে গিয়ে প্রকাশক, প্রধান সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানামাত্রিক প্রতিবন্ধকতা। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পাশাপাশি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে অন্তত ৬০০ বারের বেশি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। তবু অবিচল থেকে প্রকাশ করে গেছেন পত্রিকার প্রকাশনা।

দৈনিক আজকের কাগজ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে আধুনিক সংবাদপত্রের প্রচলন শুরু হয় বাংলাদেশে। এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানাবিধ ইতিহাস। আজকের কাগজের প্রকাশনাকে কেন্দ্র করেই দৈনিক পত্রিকার ডিক্লেয়ারেশন রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে জেলা প্রশাসনে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ডামি ছাপা হওয়ার পর আজকের কাগজ বাজারে প্রথম আসে ২৩ ফেব্রুয়ারি। একঝাঁক তরুণ সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে দৈনিক আজকের কাগজ মাত্র কয়েক দিনেই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে।

প্রকাশনার বিষয়ে আত্মজীবনী ‘জীবনের শিলালিপি’তে  কাজী শাহেদ আহমেদের ভাষ্য, ‘আজকের কাগজ প্রগতিশীল চেতনার আন্দোলন, আজকের কাগজ অনেক বিপ্লব করেছে। সাংবাদিকতার জগতে নতুন নতুন তথ্যের বিস্তৃত ক্ষেত্র দেখিয়েছে। সাংবাদিকতায় অনেক নতুনত্ব সংযোজন। সংবাদপত্রকে তারুণ্যনির্ভর উদ্দীপ্ত পেশায় উদ্ভাসিত করেছিল।’

পত্রিকা প্রকাশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজী শাহেদ লেখেন, ‘এসব করতে গিয়ে আজকের কাগজকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক মামলা-মোকদ্দমার। সম্পাদক হওয়ায় আমাকে ৬০০ দিনের বেশি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। হাজত ভোগ করতে হয়েছে। এছাড়া নানা হুলিয়া আর গ্রেফতারি পরোয়ানা তো ছিলই। মামলা হয়েছে ৮৭টা।’

ওই সময় আজকের কাগজ পত্রিকায় ১৪ বছর কর্মরত ছিলেন সাংবাদিক ইকবাল মোহাম্মদ খান। মঙ্গলবার (২৯ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘নব্বই দশকের শুরুতে জামায়াতবিরোধী, একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিরুদ্ধে আজকের কাগজ পত্রিকা সবচেয়ে সক্রিয় ছিল। সে কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের প্রকাশক কাজী শাহেদ আহমেদ, সম্পাদকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা হতো। জামায়াতের অনুসারীরা তখন বিভিন্ন জায়গায় মামলা করেছিল তার বিরুদ্ধে। এর জন্য সারা দেশে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে তাকে, জামিন নেওয়ার জন্য।’

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে দেশের গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আজকের কাগজকে এগিয়ে নেন একাত্তরের যুদ্ধবন্দি, শহীদভ্রাতা কাজী শাহেদ আহমেদ।

নিজের আত্মজীবনীতে তিনি এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘আজকের কাগজ ছিল মূলত একটা আন্দোলন, একটা বিপ্লব। আজকের কাগজের দর্শন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আর লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করা।’

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গণমানুষের মনে বিকশিত করার এই প্রত্যয়ী অভিযান থেকে সরকারের বিরোধিতাও টলাতে পারেনি কাজী শাহেদ আহমেদকে। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকারের সময়ও তাকে সরকারি বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রভাবশালী মন্ত্রীরা ডেকে দিয়েছেন হুমকি। হয়েছেন গ্রেফতার।

১৯৯২ সালের মার্চে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে আর্থিক সহযোগিতা ও পত্রিকার মাধ্যমে সমর্থন জানানোর কারণে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী (প্রয়াত) ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আজকের কাগজে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

বাধাবিপত্তি আর প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দৈনিক আজকের কাগজ পেশাগত সাফল্য পেয়েছে। লাভ করেছে পাঠকপ্রিয়তা। সোমবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় কাজী শাহেদ আহমেদের মৃত্যুর খবরে রাজনীতিক, সাংবাদিক, মুক্তিচিন্তার মানুষেরা দুঃখপ্রকাশ করেন। 

আজকের কাগজ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে আধুনিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কাজী শাহেদের অবদান জাতি  শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্য, ‘আজকের কাগজের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু বলেন, ‘কাজী শাহেদ আহমেদের মৃত্যু দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’

১৯৯৪ সালের ২১ জানুয়ারি আজকের কাগজের যশোর ব্যুরো অফিস উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। আজকের কাগজের প্রকাশনা যখন তুঙ্গে, তখন ‘শত বর্ষের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ পুরস্কার প্রদানও করেন কাজী শাহেদ আহমেদ। ১৯৯৪ সালের ১৪ এপ্রিল বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ বাঙালি পুরস্কার হিসেবে স্বর্ণপদক দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তার পক্ষ থেকে ছোট মেয়ে শেখ রেহানা গ্রহণ করেছিলেন সেই পদক।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আরও পাঁচ জনকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি ব্যক্তিত্বকে পুরস্কৃত করা হয়। তারা হলেন—শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, সাংবাদিক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, পটুয়া কামরুল হাসান, কবি সুফিয়া কামাল ও কবি শামসুর রাহমান।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও আধুনিক ধারার পথপ্রদর্শক হিসেবে আজকের কাগজের প্রকাশনা স্থগিত হয় ২০০৭ সালে। এক-এগারোর পরিবর্তিত পটভূমিতে পত্রিকাটির প্রকাশনায় ছন্দপতন নেমে আসে।

আত্মজীবনীতে কাজী শাহেদ আহমেদ সেই দিনটিকে উল্লেখ করে লেখেন, ‘সেই দিনটি আমার সারা জীবনের ব্যথাতুর দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু আজকের কাগজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে জোর আওয়াজ তোলার ২০ বছর পরে যখন দেখি—এক নতুন প্রজন্মের আগুনঝরা ডাকে উত্তাল শাহবাগ, তখন মনে হয় আমরা বন্ধ হলেও শেষমেশ সফল হয়েছি।’

/এপিএইচ/এমওএফ/
টাইমলাইন: কাজী শাহেদ আহমেদের জীবনাবসান
২৯ আগস্ট ২০২৩, ২০:০৯
সাংবাদিকতার কারণে ৬০০ বারের বেশি আদালতের কাঠগড়ায় কাজী শাহেদ
২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৪:০৪
সম্পর্কিত
স্মরণসভায় বক্তারাস্রোতের বিপরীতে নির্ভয়ে কাজ করে গেছেন কাজী শাহেদ আহমেদ
কাজী শাহেদ আহমেদের স্মরণসভা শুক্রবার
স্মরণসভায় বক্তারা‘নিষ্ঠা ও প্রেরণার বাতিঘর কাজী শাহেদ আহমেদ’
সর্বশেষ খবর
বেইলি রোডে আগুন: ৫ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি নোটিশ
বেইলি রোডে আগুন: ৫ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি নোটিশ
বিপন্ন উপকূলের বন্যপ্রাণী, রক্ষায় নেই কার্যকরী উদ্যোগ
বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস আজবিপন্ন উপকূলের বন্যপ্রাণী, রক্ষায় নেই কার্যকরী উদ্যোগ
বেইলি রোডসহ সব আবাসিক স্থাপনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ চেয়ে রিট
বেইলি রোডসহ সব আবাসিক স্থাপনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ চেয়ে রিট
লায়নের ঘূর্ণিতেই কাবু নিউজিল্যান্ড
লায়নের ঘূর্ণিতেই কাবু নিউজিল্যান্ড
সর্বাধিক পঠিত
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ
স্কুলে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা: শিক্ষামন্ত্রী
স্কুলে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা: শিক্ষামন্ত্রী
ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘এএমপিএম’, পলাতক কর্মকর্তারা
বেইলি রোড ট্র্যাজেডিব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘এএমপিএম’, পলাতক কর্মকর্তারা
বিদেশের সম্পদ দেশের টাকায় করিনি: সাবেক ভূমিমন্ত্রী
বিদেশের সম্পদ দেশের টাকায় করিনি: সাবেক ভূমিমন্ত্রী
পূর্ব ইউক্রেনের একটি শহর ঘেরাও করেছে রুশ সেনাবাহিনী
পূর্ব ইউক্রেনের একটি শহর ঘেরাও করেছে রুশ সেনাবাহিনী