X
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
৯ ফাল্গুন ১৪৩০

নিজ স্বপ্নকে বাস্তব করে দেখিয়েছেন কাজী শাহেদ আহমেদ

ফরিদুর রেজা সাগর
২৯ আগস্ট ২০২৩, ০১:৩০আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০২:২৫

কাজী শাহেদ আহমেদ একটি নাম কিন্তু বিশাল পরিচয়। খুব কম মানুষ আছেন, যারা নিজেদের কর্মজীবনের একটা বিশাল অংশের পরিচয়কে প্রায় পুরোটা মুছে ফেলতে পারেন। কাজী শাহেদ আহমেদ সেরকম একজন মানুষ।

জীবনের শুরুর দিকে ছিলেন সেনাবাহিনীতে। যুদ্ধ করেছেন, কমান্ড দিয়েছেন। সৈনিকের পোশাক পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন বহু জায়গায়। সৈনিকের পোশাক পরে সেবা করেছেন সাধারণ মানুষের। কিন্তু যখন তিনি শিল্প-সাহিত্যকে ভালোবেসে এই জগতে প্রবেশ করলেন তখন নামের পাশ থেকে একেবারেই ফেলে দিলেন সামরিক বাহিনী থেকে পাওয়া পদকটাকে। তিনি হয়ে গেলেন আট-দশজন মানুষের মতোই সাধারণ। একই সঙ্গে আমরা জানলাম, তার দাদাও ওই আমল থেকে সাহিত্য চর্চা করেছেন। আগের দিনের ওই দলিল লেখার খাতায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে গেছেন তিনি। সেই খাতাগুলো সংরক্ষিত ছিল তার কাছে।

অনেক তর্ক-বিতর্ক, অনেক কিছুর পরে আজকের কাগজ প্রকাশিত হলো। তারপর খবরের কাগজ। তখন প্রতিদিনই শাহেদ ভাই নানারকম পরামর্শ দিতেন, কথা বলতেন। কখনও তার কথা অদ্ভুত মনে হতো। কিন্তু একটা বিষয় ছিল, তিনি চমৎকার করে কথা বলতেন। কথা বলার সময় অনেক মজার কথা গল্পের ছলে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে শুনতে খুব ভালো লাগতো।

আজকের কাগজে কাজ করতে গিয়ে কেউ কখনও ক্লান্ত হতো না। শাহেদ ভাই নিজের চেহারাও পাল্টাতেন। কখনও দেখা যেত মুখভরা দাড়ি। কখনও দেখা যেত হাতে একটা লাঠি। কখনও পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে আসছেন। কখনও স্যুট। শাহেদ ভাই এরকম নানাভাবে, নানান চেহারায় নিজেকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

আজ তিনি যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তখন একটা কথা বলতেই পারি, তিনি তার পত্রিকাটিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।

এক পর্যায়ে তিনি আমাদের ডেকে বলেছিলেন, ‘আমাকে কিছু দিতে হবে না। বরং আমার কাছে যদি কোনও পরামর্শ চাও সেটা আমি দেবো। আমার কাছে সাহায্য চাইলেও আমি দেবো। কিন্তু একটা শর্তে, সেটা হলো– সম্পাদক হিসেবে আমার নাম থাকবে। প্রতিদিন সকালে উঠে দেখবো দরজার নিচ দিয়ে আজকের কাগজ আমার ঘরে পড়ে আছে। আমি সে কাগজটা তুলবো। গন্ধ নেব। দেখবো কাগজটায় কী আছে। তারপর তোমাদের সঙ্গে তর্ক করবো- কোনটা ঠিক কিংবা ঠিক না। কী ভালো হয়েছে, কী খারাপ হলো। এসব নিয়ে অনেক অনেক কথা বলবো।’  

শাহেদ ভাই সত্যিই অনেক কথা বলতেন। এমন কোনও বিষয় নেই, যেটা নিয়ে তিনি কথা বলতে পারতেন না। আবার সেই কথাটাকে কীভাবে সহজ করা যায়, আনন্দময় করা যায় সে ব্যাপারে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। মুখে মুখে তিনি অনেক কথা বলতেন, দেখা যেত সেটাই বাস্তব হয়ে যাচ্ছে। তিনি গল্প করেছেন, কথার ছলে নানান কথা বলেছেন। তিনি যা ভেবেছেন সেভাবেই কথা বলেছেন। আমরা দেখেছি সেটাই সত্য হয়ে গেছে।

প্রথম দিকে আজকের কাগজে আমি দেখতাম, শাহেদ ভাই ছোট্ট একটা গাড়ি চালাতেন। খুব সম্ভবত রাশিয়ান গাড়ি ছিল। তিনি বলতেন, কতটুকু সময় আর গাড়িতে থাকি। তাই এই ছোট গাড়িটাই যথেষ্ট।  

তারপর ছেলেরা বড় হওয়ার পর গাড়ি পাল্টালেন। বাড়িও বদল করলেন। সাভারের জমিটাকে রূপান্তরিত করলেন অদ্ভুত সুন্দর বাগান বাড়িতে। এরপর তৈরি হলো বিশ্ববিদ্যালয়। তৈরি হলো জেমকন গ্রুপ। তিনি পঞ্চগড়ে যে সুন্দর জায়গা তৈরি করলেন, সেখান থেকে হিমালয় দেখা যায়। সবই তো আমাদের চোখের সামনে।

শাহেদ ভাই কখনও একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরেকটা প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে মিলিয়ে কোনও কাজ করতে চাইতেন না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মানুষকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে আলাদাভাবে কাজ করেছেন তিনি।

একটা গল্প বলতে হয়। একবার পুকুর থেকে একটা লোক কাচকি মাছ চুরি করেছিল। শাহেদ ভাই তার চাকরি খেয়ে ফেললেন। সবাই বললো, এই কয়টা কাচকি মাছ চুরি করেছে, সেজন্য তার চাকরি খাবেন?

অটল শাহেদ ভাই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বললেন, ‘সে যদি ১০টা রুই মাছ চুরি করতো, তাহলে কী করতে?’

আমরা বললাম, তাহলে চাকরি খেতাম।

তিনি বললেন, ‘চুরি তো চুরি। দশটা রুই মাছ কি আর এক গামছা কাচকি মাছ কি! চুরি যেহেতু করেছে তার শাস্তি হতেই হবে।’

শাহেদ ভাইয়ের সঙ্গে আরও অনেক ছোট ছোট ঘটনা রয়েছে।  

যাই হোক, মানুষ তো স্বপ্ন দেখে। শাহেদ ভাইকে আমি স্বপ্ন দেখার মানুষ বলবো না। যে মানুষ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে আসলে তার জীবনে কিছু হয় না। কিন্তু যে মানুষ জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে সে নিশ্চয়ই তার স্বপ্নকে বাস্তব করতে পারে। শাহেদ ভাই এমন একজন মানুষ যিনি তার স্বপ্নকে বাস্তব করে দেখিয়েছেন।

কাজী শাহেদ আহমেদের মতো উৎসাহী ও উদ্যোমী মানুষ খুবই কম দেখেছি। এমন মানুষ আমাদের সমাজে অনেক অনেক বেশি করে দরকার। তার তিন ছেলের কথা বলতে হয়, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনেক উজ্জ্বল মানুষ। শাহেদ ভাই যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন।  

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আই

/এসএএস/এফএস/
টাইমলাইন: কাজী শাহেদ আহমেদের জীবনাবসান
২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৪:০৪
২৯ আগস্ট ২০২৩, ০১:৩০
নিজ স্বপ্নকে বাস্তব করে দেখিয়েছেন কাজী শাহেদ আহমেদ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জুতা পায়ে কেন শহীদ মিনারের বেদিতে?
জুতা পায়ে কেন শহীদ মিনারের বেদিতে?
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরভিএন্ডএফ কোরের সদস্যদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন সেনাপ্রধান
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরভিএন্ডএফ কোরের সদস্যদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন সেনাপ্রধান
বাণিজ্য মেলায় মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সম্মাননা লাভ
বাণিজ্য মেলায় মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সম্মাননা লাভ
ইতিহাস বিকৃত ও বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার এক শ্রেণির মানুষের মজ্জাগত: প্রধানমন্ত্রী
ইতিহাস বিকৃত ও বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার এক শ্রেণির মানুষের মজ্জাগত: প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ