X
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১০ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

‘সুলতানি’ গেলেও ‘সালতানাত’ যায় না

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ১৯:১৪

মোস্তফা কামাল গভীর রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে সাংবাদিককে নির্যাতন ও কারাদণ্ড দেওয়ার দোষে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন, সিনিয়র সহকারী কমিশনার-আরডিসি নাজিম উদ্দীনসহ চার জন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার কোন মানের শাস্তি? প্রত্যাহার হওয়া বাকি দু’জন হলেন সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলাম। চার জনকেই কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের প্রত্যাহার পরবর্তী ধাপ সচরাচর নতুন পোস্টিং।
প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকায় বা আরেক জেলায় গিয়ে কি অন্য কাজ করবেন তারা? এভাবেই পেটাবেন সাংবাদিক বা অন্য কাউকে। ক্ষমতার অপব্যবহারই করবেন।
এই নাজিম উদ্দিন এর আগে বাগেরহাট ও কক্সবাজারে থাকাকালে কথায় কথায় মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। বাগেরহাটে থাকাকালীন সেখানেও কথায় কথায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মানুষকে হয়রানিসহ ত্রাস সৃষ্টি করেছেন। এজন্য ওই দুই জেলার মানুষ তাকে ‘মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট’ নামে চেনেন। কক্সবাজারে তার নাম ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। কক্সবাজার সদরের এসিল্যান্ড থাকাকালে ২০১৮ সালে মে মাসে রোজাদার এক বৃদ্ধকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। মাটিতে পড়ে থাকা বৃদ্ধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গায়ের ওপর বসে তিনি কিল ঘুষিও মেরেছিলেন। প্রকাশ অযোগ্য অশ্রাব্য গালিগালাজ তো ছিলই। এই ঘটনার ভিডিও প্রকাশ হয়েছিল সেই সময়। ‘স্যার’ না ডাকায় এক সংবাদকর্মীকে লাঞ্ছিতও করেন তিনি।

আরেক বৃদ্ধকে কান টেনে শার্টের কলার ধরে তিনি টেনেহিঁচড়ে ধরে নিয়ে যান। নিজ অফিসে দরজা বন্ধ করে খালি স্ট্যাম্পে দস্তখত নেন তার। এরপর মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করেন। উৎপাতের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে নাজিম উদ্দিনের ‘সুলতানি’ বদল হয়। কিন্তু  ‘সালতানাত’ যায়নি। কুড়িগ্রামে ‘সালতানি’ পেয়ে তরক্কি আরও বেড়ে যায় ডিসি সুলতানা পারভীনের আশীর্বাদে। মধ্যরাতে আদালত বসিয়ে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফকে পিটিয়ে আধমরা করে কারাদণ্ড দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। আমার কথা হলো, জনসমাজে মোবাইল কোর্টের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আরও আগেই। নাজিম উদ্দিনের মতো ভ্রাম্যমাণ বিচারের দণ্ডমুণ্ডের ক্ষমতাবানরা বিভিন্ন জায়গায় এর যথেচ্ছ অপপ্রয়োগ করেছেন। ছোট-বড় ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলকে বিষিয়ে তুলেছেন।

প্রতিবছর সারাদেশের ডিসিদের নিয়ে সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা অংশ নেন। সেখানে ডিসিরা নানা আইন ও বিধান পরিবর্তন করে নিজেদের ক্ষমতায়িত করতে চান। বিচারিক ক্ষমতাও তারা দাবি করেন। কুড়িগ্রামের ডিসির কর্মকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার উপায় নেই। কুড়িগ্রাম বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সুলতানা, নাজিমরাও দেশ এবং প্রশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং অবিচ্ছেদ্য। এরপরও একেবারে সমবৈশিষ্ট্যের যেমন ডিসি সুলতানা, তেমন আরডিসি নাজিম কুড়িগ্রামে গিয়ে জুটলেন কীভাবে? ছোট হলেও প্রশ্ন কিন্তু গুরুতর। এমসিকিউতে একবাক্য বা শব্দে এ প্রশ্নের জবাব মিলবে না। কেউ কেউ বলতে চান, অবারিত ক্ষমতা তাদের নেতিবাচকভাবে মহারথী-মহামহিম করে তোলে। কাউকে কাউকে দানবও করে তোলে। সুলতানা-নাজিম ক্যামেস্ট্রি একত্র হওয়ায় কুড়িগ্রামে অ্যাকশন-বিস্ফোরণটা একটু বেশি হয়েছে। এই সফ্টওয়্যারের অস্তিত্ব প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়েই রয়েছে। এর জোসেই তাদের কেউ পুকুর কাটেন। কেউ রাষ্ট্রীয় টাকায় পুকুর কাটা-ভরাট দুটোই শেখার অভিজ্ঞতার নামে বিদেশে ‘প্লেজার ট্যু’র দেন। এই সুলতান-সুলতানারা একই গোত্রের।

বেদম মারধরের পর মাদকবিরোধী অভিযানে মধ্যরাতে আটক। মধ্যরাতেই নগদ বিচার। অধূমপায়ী আরিফের কাছ থেকে মদ-গাঁজা রাখার স্বীকারোক্তি আদায় করে ছাড়া হয়েছে। এরপর এক বছরের কারাদণ্ড। ভাবা যায় কোনও রকমফেরে এসে ঠেকেছে সাংবাদিক নিপীড়ন? স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতুর বর্ণনায় উঠে এসেছে সংবাদকর্মী আরিফের ওপর মধ্যরাতে চলা নির্যাতন ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্টদের ‘হেডম’ দেখানোর বীভৎস্যতা। গভীর রাতে বাড়ির দরজা ভেঙে দস্যুতার মতো ঘরে ঢোকে দুটি ছোট্ট শিশু আর স্ত্রীর সামনে চোখ বেঁধে তাকে লাথি-থাপ্পড়, ঘুষি মারতে থাকে তারা। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে লড়স, অনেক জ্বালাচ্ছিস− বলে মারতে মারতে নিয়ে যায় আরিফকে। এরপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টার দিতে চান। এ সময় আরডিসি নাজিম বারবার বলেন, তুই কলেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টার দেওয়া হবে।

ওই সময় আরিফ যা‌তে কারও সাহায্য না পায় সেজন্য তার বাসার বাইরে ও আশপা‌শের বাসাগু‌লোর সাম‌নে পাহারায় ছিল আরও ১০-১৫ জন। নির্যাতন চলে ডিসি অফিসে নিয়েও। সেখানে চোখ বেঁধে উলঙ্গ করে পেটানো হয়েছে। সেই দৃশ্য আবার ভিডিও করা হয়েছে।

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম এর আগে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সংবাদ করেছিলেন। এ নিয়ে কিছু দিন ধরে তাকে নতুন আর কোনও নিউজ না করতে শাসানো হয়েছিল। এরমধ্যে একটি হচ্ছে কাবিখার টাকায় শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন নিজের নামানুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণের চেষ্টা। তবে শেষ পর্যন্ত সেই নামকরণ করা হয়নি। এছাড়া কুড়িগ্রামের মোবাইল কোর্টকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা নিয়েও তিনি নিউজ করেছিলেন। আরেকটি খবরের বিষয়ে তিনি খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। বুঝতে কারোরই বাকি থাকে না কোন পাপে আরিফের এ শাস্তি। ক্ষমতার অপপ্রয়োগেরও একটি ছোট নমুনা। এরপরও এক অর্থে তার ভাগ্য ভালো। আরিফকে মারধর করেছে কিন্তু মেরে ফেলেনি।

কর্মটি স্বেচ্ছাচারী হলেও ‘সুলতানা সরোবর’ নাম বাছাইর মধ্য দিয়ে তার বেশ কাব্যিক মানসিকতার পরিচয় মেলে। এমন সৌন্দর্য পিয়াসী নারীর কীভাবে মধ্যরাতে একজন সাংবাদিককে তার অফিসে নিয়ে এসে উলঙ্গ করে নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার বিকৃত খেয়াল চাপলো?

আরিফের জামিন নিয়েও ‘ক্যারিকেচা’র কম করেননি তারা। শনিবার রাতে কারাগারে ওকালতনামা পাঠিয়ে আরিফকে তার পরিবার জামিনের আবেদন করেছে জানিয়ে এতে স্বাক্ষর দিতে বলে। পরদিন রবিবার দুপুরে মুক্তি পেয়ে আরিফ বেরিয়ে এসে জানতে পারেন তার পরিবার জামিনের আবেদন করেনি। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সারাদেশে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ এবং প্রশাসনের ওপর মহলের চাপে কিছুটা কাবু হয়ে পাল্টা চাতুরি করেছেন সুলতানা-নাজিমরা। তারাই একান্তভাবে আরিফের জামিনের বন্দোবস্ত করেছেন।

আধাবোতল মদ দিয়ে ধরার সময় এটাকে জব্দ দেখিয়ে মাদক আইনে মামলা করে দেওয়ার নির্দেশ পালনে অতি উৎসাহের কারণে ঘটনা প্যাঁচ খেয়ে যায়। উল্টাপাল্টা হয়ে যায় পরিস্থিতি। সেটা সামলাতে গিয়ে মোবাইল কোর্ট, রায়, জেল-হাজত- সব রাতেই করতে হয়।

সুলতানার অর্থ হলো সালতানাতের মালিক, রানি, শাসক, ক্ষমতাবান ইত্যাদি। ক্ষমতার দম্ভে সরোবর তৈরির স্বপ্ন দেখা ডিসি সুলতানা পারভীন, ‘ড্যাশিং হিরো’ আরডিসি নাজিম উদ্দিনরা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ সেপিঠ। প্রজাতন্ত্রের ‘সুলতান’ তারা। কপালের ফেরে বেসরকারি সালতালাত চালান পাপিয়া, সম্রাট, খালেদরা। ক্ষমতা, দম্ভ এবং হাঁকডাকে অভিন্ন তারা। উৎসও কাছাকাছি। তাদের সুলতানি গেলেও সালতানাত যায় না। একের পর সালতানাতে অভিষেক হয় আরেকজনের। প্রত্যাহার মোটেই আইনি শাস্তি নয়। ওএসডি-ও নয়। বিভাগীয় মামুলি পদক্ষেপ মাত্র।

প্রত্যাহার বা ক্লোজের নামে সরকারি কর্মকর্তারা নতুন পোস্টিংয়ের ফিকির করেন। কিন্তু, কুড়িগ্রামের ঘটনা যেনতেন অপরাধ নয়। ফৌজদারি অপরাধের চেয়েও ভয়াবহ।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ফের তাল প্রকল্প: গাছ কার ভাগে?

ফের তাল প্রকল্প: গাছ কার ভাগে?

পুলিশি পাহারায় ধর্মচর্চা!

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৩৩

আনিস আলমগীর কবি নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন- ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা।’ এখানে ক্ষান্ত হননি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি। তিনি যুক্তি হিসেবে বলেছেন, ‘আগামী বছর থেকে হিন্দুরা যদি পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া দুর্গাপূজার আয়োজন করে, তবেই শুধু আমি দুর্গামণ্ডপে পূজা দেখতে যাবো। অন্যথায় নয়। পাকিস্তান আমলে, আমার ছোটবেলায় পুলিশ প্রটেকশন ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা হতে দেখেছি। দুর্গাপূজার পবিত্রতা রক্ষার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশের সব মানুষের ওপর চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দিতে হবে। পুলিশ, মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা চাইলে আসতে পারেন, তাঁরা পূজা দেখার জন্য আসবেন, পূজা পাহারা দেওয়ার জন্য নয় বা পূজারীদের মনে সাহস বাড়ানোর নামে সাহস কমিয়ে দিতে নয়।’

আমি গুণদার এই মনোভাব সমর্থন করি। ধর্মীয় উৎসব যদি পুলিশ প্রটেকশনেই করা হয় তাহলে এখানে উৎসব কোথায়! একে আবার গালভরা বুলিতে কেউ কেউ বলছেন সর্বজনীন উৎসব। সব জনের উৎসবে পুলিশি পাহারার দরকার হবে কেন! মুসলিমরা প্রতিমা ভাঙতে যাবে কেন! পূজা উদযাপন নিয়ে হিন্দুদের ভয় পেতে হবে কেন! তার মানে যা বলা হয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি উপচে পড়ছে বলে যে ঢোল বাজানো হচ্ছে- সেসব মিথ্যা এবং ভণ্ডামি।

তাহলে আমাদের পক্ষে কি পুলিশি পাহারা ছাড়া, আশ্রয় ছাড়া পূজা উৎযাপন সম্ভব? আমার দৃষ্টিতে সেটা সব জায়গায় সম্ভব না। গুণদা’র পাকিস্তান আমলের অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা বোধহয় দুঃসাহসিক কর্মপ্রচেষ্টা হবে। কারণ, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রে এখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। আগে এক গ্রামের ঘটনা অন্য গ্রামে খবর হতো, এখন এক দেশের ধর্মীয় নির্যাতন আরেক দেশে প্রভাব পড়ছে। ইন্টারনেট দুনিয়া সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনাকে আরও রঙ লাগিয়ে উত্তেজনায় ঘি ঢালছে।

একজন মানুষ যদি ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী না হয়, অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করা বন্ধ না করে, তাহলে ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে হবে কী করে! বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দুদের তাদের ধর্মীয় উৎসবে শামিল হওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশি পাহারা ছাড়া বাংলাদেশে মুসলিমরাও আজকাল ধর্মীয় উৎসব করতে পারছে না। মসজিদে, ঈদগাহে বোমা নিয়ে প্রবেশ করছে ইসলামি জঙ্গিরা। দেখা যাচ্ছে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানই পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া হতে পারছে না। গুণদা’র ছোটকাল বাদ দিলাম, আমাদের ছোটকালেও আমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দিতে কোনও পুলিশ দূরে থাক, চকিদারকেও দেখিনি।

এরমধ্যে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খুব দ্রুত একটি নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার, যাতে কোনও মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীর সুরক্ষা এবং তার গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার বিচারের জন্য সরকার এই আইনগত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বলে বলেছেন আইনমন্ত্রী। আমার জানা মতে, মন্দির, বিগ্রহ নষ্ট বা হামলা করার বিরুদ্ধে কঠোর আইন এর আগেই সরকার করেছে। প্রস্তাবিত আইন হয়তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা কমিয়ে আনবে।

নতুন এই আইন করার পক্ষে আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের যুক্তি হচ্ছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শেষই করা যায় না সাক্ষীর অভাবে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অধিকাংশ সময় সাক্ষী হন হয়তো ওই পরিবারের প্রতিবেশী আরেকটি সংখ্যালঘু পরিবারের মানুষ। কিন্তু মামলার বিচার প্রক্রিয়ার সময় সাক্ষী দিতে যাওয়াটা তাদের জন্য ভয়ের, এজন্য তারা সাক্ষ্য দিতে আসেন না।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সাক্ষীদের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে এই আইনে। এটা কতটা বাস্তব হবে ভেবে দেখার বিষয় আছে। আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকবে হয়তো। বর্তমানে মন্দির ভাঙা এবং বিগ্রহ নষ্ট করার যে আইন আছে সেটাও অপব্যবহারের চেষ্টা হয়। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের হামলা রোধ করতে বিশেষ করে মন্দির আর মূর্তি আক্রমণ করার আগে ধর্মীয় উত্তেজনার নামে, তৌহিদি জনতার নামে, দুষ্কৃতকারীদের হামলা থেকে সংখ্যালঘুদের জানমাল রক্ষা করতে হবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলেছে, ২০১৩ সাল থেকে গত ৯ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাড়ে তিন হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পূজামণ্ডপ, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ অন্যতম। সংখ্যাটা চোখ বুজে থাকার মতো নয়।

গুণদা’র ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা’ স্ট্যাটাসে আবার ফিরে আসি। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর, অভয়দানের দরকার হচ্ছে এখন। কিন্তু সেটি লাগছে কেন– রাষ্ট্রকে এর মূলে যেতে হবে। অনেকে মনে করেন, হিন্দুদের প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দুঃখের কারণ হচ্ছে, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘মুসলমান তোষণ’-এর অভিযোগ করে আসছে সে দেশের একশ্রেণির মানুষ। তাদের মতে, এতে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত কল্যাণের চেয়ে তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংখ্যাগুরুরা নিজেদের ডিপ্রাইভ ভাবছে কিনা, সরকারবিরোধী ক্ষোভ ভেন্টিলেশনের সুযোগ হিসেবে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে কিনা, এসবও গবেষণার দরকার আছে।

প্রায় ৩২ হাজার মণ্ডপে এবার পূজা হয়েছে, সেটি একটি প্রশংসার দিক। কিন্তু সে তুলনায় সামান্য ক’টি মণ্ডপে হামলার ঘটনা দেশে-বিদেশে সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ, এক মণ দুধে এক ফোঁটা চনাই যথেষ্ট। পূজামণ্ডপের সংখ্যা ও জৌলুস তাহলে বড় বিষয় নয়, শান্তিপূর্ণভাবে পূজা করতে পারছে কিনা সেটাই বড় বিষয়। মৌলবাদীরা বরং এসব জৌলুসকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিন্দুদের বাড়বাড়ন্ত হিসেবে দেখছে। বলছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় হিন্দুরা অনেক বেশি দাপট দেখাচ্ছে। এসব কারণে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সাম্প্রদায়িকতা কমেছে দাবি করা যাচ্ছে না। পাশের দেশের হিন্দু মৌলবাদী সরকারের শাসন, সোশাল মিডিয়াও এই বিষবাষ্প বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগুনের মধ্যে ঘি হিসেবে কাজ করছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের এসবও হিসাবে ধরতে হবে।

সংখ্যালঘু বিষয়টি এত সংবেদনশীল যে এক লাইন লিখতে গিয়ে চারবার ভাবতে হয়। সরকারকেও সংখ্যালঘু প্রশ্নে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিন্তা করতে হবে। সংখ্যালঘুদের কল্যাণ চাইলে তাদের সুযোগ-সুবিধা নয় শুধু, সবার আগে দেশের মধ্যে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সম্প্রীতি বিনষ্টে সংখ্যালঘুরাও বিপথে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ আর হেফাজতে ইসলামের মধ্যে তফাৎ কী দেখতে হবে।

অন্যদিকে রাজধানীতে বসে আমরা যারা প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতার যে বুলি দিচ্ছি তার ছিটেফোঁটা কি গ্রামে পৌঁছছে সেটাও দেখতে হবে। আগে গ্রামে সাংস্কৃতিক যে আবহ ছিল, গান-বাজনা, নাটক, চলচ্চিত্র, জারি সারি, যাত্রাপালা ছিল- তার স্থান তো এখন ইউটিউব মোল্লারা দখল করেছে। অন্যদিকে চলছে ভারতীয় সিরিয়ালে বউ-শাশুড়ি প্যাঁচাল এবং সূক্ষ্মভাবে হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা। এমন কোনও সিরিয়াল নেই যেখানে ধর্মীয় সুড়সুড়ি নেই। এর মাধ্যমে আমরা একটি ধর্মান্ধ বিশাল অসহিষ্ণু প্রজন্ম তৈরি করছি।

যতদিন এসবের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে আমরা যাবো না ততদিন ধর্মীয় সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপদে ধর্ম পালন সম্ভব হবে না। যতদিন সব নাগরিককে রাষ্ট্র সমান চোখে দেখবে না, কোথাও সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করে, কোথাও আলগা পিরিতি দেখিয়ে নিজেদের ভোটের অঙ্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করবে– ততদিন বাংলাদেশে পুলিশ প্রটেকশনে পূজা, ভারতে পুলিশ প্রটেকশনে নামাজ পড়ার দৃশ্য দেখবো আমরা। সবকিছু ভোটের খেলা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

‘গেলে জমি থাকলে ভোট, এই চক্র বন্ধ হোক’

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৫:১৩

রুমিন ফারহানা খুব অস্থির সময় পার করছি আমরা। করোনা-বিভীষিকার রেশ মানুষের শরীর, মন, স্বজন হারানো, চাকরি হারানো সবটা এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাজনীতির মাঠের অস্থিরতা, নির্বাচন কমিশন গঠন বিতর্ক, একতরফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর অস্থির এক সময়। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই তার চিরচেনা আনন্দময় রূপে আসবে, তা হয়তো আশা করেনি কেউ। কিন্তু তাই বলে দাবানলের মতো আগুন, ৭০টির বেশি মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, সাত জনের প্রাণহানি, হিন্দু বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট; এতটা বিভীষিকাময় দুর্গোৎসবও কারও কল্পনায় ছিল না, কিন্তু তা-ই হলো।

পূজার সপ্তমীর দিন কুমিল্লার এক পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, রংপুরসহ দেশের অনেক জায়গায়। অথচ ঘটনাটি শেষ হওয়ার কথা ছিল কুমিল্লাতেই। কুমিল্লায় এই ঘটনা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ঠেকানো গেলে দেশের আর কোথাও এমন ঘটনা হয়তো আর ঘটতো না। ঘটনার সূত্রপাত যে ফেসবুক লাইভ থেকে সেটিতে দেখা যায়, যিনি ভিডিও করছেন তিনি ওসির একেবারে সামনে রীতিমতো ধারাবর্ণনা করে ঘটনাটি দেখাচ্ছেন।  

ফেসবুক লাইভ দূরেই থাকুক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাসের জেরে এই দেশের বহু জায়গায় অতীতে যে তাণ্ডব ঘটে গেছে, সেটার ভিত্তিতে ওসির না বোঝার কোনও কারণ নেই এই ঘটনার প্রভাব কী হতে পারে। অথচ ওসি ছিলেন নির্বিকার। এমনকি পরবর্তীতে ভাঙচুর ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো কুমিল্লায় সরেজমিন রিপোর্ট করে বলেছে, সেখানকার প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, প্রথমেই পর্যাপ্ত পুলিশ এনে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারতো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বয়ানে জানা যায়, ‘এমন অশান্তি গত ৫০ বছরে দেখেননি। সেদিন বিক্ষোভ করতে আসা লোকজনের বেশিরভাগই ছিল বয়সে তরুণ, অচেনা। তাদের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, বোঝা যাচ্ছিল না। একেকজন একেক দাবি করছিল। তাদের শান্ত করতে আশপাশের মসজিদের মাইকে আহ্বান জানানো হয়। এরপরও কীভাবে যেন তা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।’

পুলিশ সূত্র বলছে, ‘নানুয়া দিঘির পাড়ে দিনভর উত্তেজনায় একসঙ্গে ৫০০ মানুষের বেশি উপস্থিত ছিল না। শহরের বিভিন্ন স্থানে যেসব মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে, তাতে বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। তাদের ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত কঠোর অবস্থান নেয়নি।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর, ২০২১)

একই পত্রিকার আরেকটি প্রতিবেদনে ২০ অক্টোবর বলা হয়, ‘খোঁজ নিয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা হৃদয় হাসান ওরফে জাহিদ (২০) ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তিনি হাজীগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের কর্মী। তার মা শাহিদা বেগম ২০১৪-২০১৯ মেয়াদে হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থনে তিনি নির্বাচনে জিতেছেন।’

প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া কিশোর ও তরুণেরা পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের অনুসারী। হাজীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুব-উল-আলমও ওই দৈনিকটিকে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে মেহেদী হাসানের অনুসারীও ছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তিনি নিশ্চিত নন। এই ব্যাপারে জনাব মেহেদির বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আবার অভিযুক্ত করেন আরেক ছাত্রলীগ নেতাকে। তিনি বলেন, ‘হাজীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খোকন বলির অনুসারী ও পরিবারের সদস্যরা হামলায় অংশ নিয়েছেন, সেই প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’

একই রকম পরিস্থিতি হয়েছে দেশের অন্যান্য এলাকায়ও। রংপুরের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মী জড়িত, সরকার নিজেই তা স্বীকার করেছে এবং সেই কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশে আর সবসময় যা ঘটে ঠিক তাই ঘটেছে। মামলাগুলোতে হাজার হাজার অজ্ঞাত আসামিকে রাখা হয়েছে। কারণ, এসব মামলায় এরপর যে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অন্তর্ভুক্ত করার ভয় দেখিয়ে কিংবা অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার জন্য টাকা কামানো যায়। পুলিশের ‘গ্রেফতার-বাণিজ্য’ গত কয়েক বছরের খুব পরিচিত ব্যাপার।

এই মামলাগুলোর আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করা। প্রতিবারের নাশকতার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় অসংখ্য বিএনপি কর্মীকে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের শুরু করে এসব ক্ষেত্রে ‘হুকুমের আসামি’ হওয়া থেকে বাঁচেন না দলের সর্বোচ্চ পর্যায়, স্থায়ী কমিটির সদস্য, এমনকি দলের মহাসচিবও। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে খোঁজ রাখা হয়নি বহু কিছু। বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির কর্মী যেমন তালিকায় আছেন তেমনি তালিকায় আছেন ৬ মাস ধরে জেলে থাকা বিএনপি কর্মীও।

চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে হামলার মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এমন তিন জন বিএনপি কর্মী, যারা গত ছয় মাস থেকে জেলে আছেন। সেগুলোও ছিল নাশকতার মামলা, যখন নরেন্দ্র মোদি দেশে আসার কারণে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল। এসব কাজের অসারতা সরকারি আইনজীবী ঠিকই বুঝেছেন। কারাগারে থাকা বন্দিদের ভাঙচুরের মামলায় আসামি করা পুলিশের খামখেয়ালিপনা বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি)।

এসব মানতে নারাজ মূল হোতা, পুলিশ। মামলার তদন্তকারী এসআই এই ব্যাপারে কথা বলতে না চাইলেও কথা বলেছেন পুলিশ সুপার, যিনি জানান– জেল থেকেও হুকুম দিতে পারে। তবে জেল থেকে কোনও আসামির হুকুম দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক বলেন, বন্দিরা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। বর্তমানে স্বজনদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, ডলারের বিপরীতে টাকা মূল্য হারাচ্ছে প্রতিদিন, সঙ্গে সরকার সমর্থিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি তো আছেই। ফলে সামনের দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। ওদিকে সামনের নির্বাচন কমিশন গঠনের আলোচনা হচ্ছে সমাজে। একটি সুস্পষ্ট আইন ছাড়া, নির্বাচন কমিশন গঠনে যতই ‘সার্চ কমিটি’ তৈরি করা হোক, সেটা সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক– এটা জেনে গেছে এখন রাজনীতি সচেতন মানুষ। প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে বহু আইন পাস হলেও এই আইনটি সরকার কেন পাস করেনি সেই সমালোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাপ আছে সামনের চার মাসে এ আইনটি করে ফেলার।

এই আলোচনাগুলো হাওয়ায় উবে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলাগুলো সরকারকে অসাধারণভাবে সাহায্য করেছে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে।

স্বল্পমেয়াদে এটা অসাধারণ লাভ ক্ষমতাসীনদের জন্য। মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদেও এই পরিস্থিতি সরকারকে বিরাট সুবিধা দিতে পারে।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করার সূত্র আরেকটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে। নানা চাপে সেই নির্বাচন যদি সরকার ২০১৮-এর স্টাইলে করতে ব্যর্থ হয়, সেই আশঙ্কাকে মাথায় রেখে প্রধান বিরোধীদলকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে সরকারকে। এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে সরকারের সুবিধামতো, সুবিধাজনক সময়ে বিএনপি’র যেকোনও পর্যায়ের নেতৃত্বকে ফাঁসিয়ে দেওয়া যাবে। এটাই মধ্যমেয়াদে এসব ঘটনার লাভ।

 
বাংলাদেশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আছে, জঙ্গিবাদ আছে, এসব আন্তর্জাতিক প্রচারণা দীর্ঘদিন থেকে সরকার করছে। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এগুলোকে দেখিয়ে যেকোনও মূল্যে ক্ষমতায় থাকার ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি করা। দেশের মানুষের কাছেও এই বয়ানের ‘বাজারমূল্য’ আছে। এটাই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের কাছে এসব ঘটনার উপযোগ।

এই সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে যত হামলা হয়েছে তার একটিরও বিচার তারা করেনি। বিচার অবশ্য না করারই কথা, সরকার যে আসলে এই ঘটনাগুলো ঘটাতে চায়, তার প্রমাণ হলো এসব ঘটনা যারা ঘটায় তাদের ক্ষমতাসীন দল বরং পুরস্কৃত করে।

নাসিরনগরের ঘটনার চার্জশিটভুক্ত তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে আমরা দেখেছি। মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে দুই আসামির মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

এখন শুধু বিরোধী দলই না, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠন নির্বিশেষে বলছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই, প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এবার এই বীভৎস কাণ্ডগুলো ঘটেছে। তারাই এসব ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করছেন। তারাই এখন স্পষ্টভাবে বলছেন, এই সরকারের আশ্বাসে তারা এখন আর কোনও আস্থা রাখেন না।

সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। মোট জনসংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্রমশ কমে আসা অনুপাত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এ দেশে তারা ভালো নেই । ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে ভালো সরকার হিসেবে দাবি করা আওয়ামী লীগের শাসনামলের গত ৯ বছরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৯টি। এই হিসাব বিএনপি করেনি, করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন, এই দেশে তারা আর থাকতে পারবেন কিনা সেই চরম অনিশ্চয়তায় তারা পড়েছেন। তারা যাই করুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলটির জন্য সেটাই সুবিধাজনক। তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের জমি দখল করে নেওয়া যাবে প্রভাব খাটিয়ে। আবার তারা যদি দেশে থাকেন, তাহলে এদের সব ভোট পড়বে তাদের বাক্সে, আদৌ যদি কোনও দিন সত্যিকারের ভোট হয় এই দেশে।

শুধু বিরোধীদলীয় কর্মী বলেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার চাওয়া একটাই- গেলে জমি, থাকলে ভোট; এই চক্র বন্ধ হোক।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

করোনাকালীন ১০ কোটি উদ্যোক্তার গল্প

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৯:১৯

ফাতেমা আবেদীন এই শিরোনাম পড়ে নিশ্চয় পাঠক হিসেবে আপনি চোখ কুঁচকে ফেলেছেন। ১৬ কোটি (আনঅফিসিয়ালি ১৭  বা ১৯ কোটি) জনগণের দেশে ১০ কোটি উদ্যোক্তা! নিশ্চয়ই আপনি ধন্দে পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে একজন অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে আমিও এই হিসাবের মারপ্যাঁচে পড়ে আছি।

আসলে কত অনলাইন এবং কতজন অফলাইন উদ্যোক্তা আছেন বাংলাদেশে, সেই তথ্য কারও জানা নেই। হুজুগের দেশে এই মুহূর্তের ট্রেন্ড অনলাইন উদ্যোগ। মোবাইলে ৯ টাকায় এক জিবি ডাটা, ৯৯৯ টাকার টাচফোন আর বউয়ের বা বোনের রান্না করা কৈ মাছের বাটি চচ্চরির বিনিয়োগ আপনাকে উদ্যোক্তা বানিয়ে ছাড়বে। এই হুজুগ বা ট্রেন্ডই এই মুহূর্তে চলছে।

সম্প্রতি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, এই করোনাকালে মোবাইল কলের চেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। ২০১৮ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশি ছিলেন ৩ কোটি, ৩ বছরে সেটি বেড়েছে তিনগুণের বেশি। এই মুহূর্তে ১০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

সম্প্রতি বিটিআরসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাস শেষে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার। জুন মাস শেষে যা ছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার। এই হিসাব থেকে দেখা যায়, দেশে এক মাসে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে ২৯ লাখ ৩৫ হাজার। তবে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার। অবশিষ্ট ৮৫ লাখ ৭১ হাজার হলো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। (তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।)

মনে রাখবেন, এসব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রত্যেকেই ‘ঝানু ব্যবসায়ী’। আর প্রত্যেকেই অন্তর্জালে একেকজন ‘ঝানু ব্যবসায়ী’– এই বাক্যটিকে নেহায়েত তির্যক মন্তব্য বলে বিবেচনা করলে লেখাটি সুখপাঠ্য হবে। এসব ‘ঝানু’ অন্তর্জালিক (অনলাইন) ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে পড়ার আগে কিছু তথ্য জেনে রাখা ভালো।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জানায়, ২০১৭ সালে অনলাইন ব্যবসা বা অন্তর্জালিক কেনাবেচার লেনদেন এক হাজার কোটির বেশি। এরমধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের আয় ৩০০ কোটি টাকার বেশি। (তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। তবে পর পর দুই বছর এই লেনদেনে ২/৪ কোটির মতো বেড়েছে।

কিন্তু ২০২০ সালে এই চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে বলে জানিয়েছে ই-ক্যাব। এক হাজার কোটির সামান্য বেশি  লেনদেন বছরের প্রথমার্ধেই চার হাজার কোটির দিকে এগিয়েছে। এ বছর বাজারের আকার দাঁড়াচ্ছে ১৬ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর আকার ছিল ১৩ হাজার কোটি টাকার (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো)।

মাত্র ৬ মাসে করোনার স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে একা হাতে সচল রেখেছেন এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। যিনি শিক্ষক ছিলেন, করোনায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে, অনলাইনে কোচিং চালাচ্ছেন, বা কাঁচা তরকারি হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। যিনি ডাক্তার ছিলেন, চেম্বার বন্ধ, আয় বন্ধ। তিনি হোমশেফ হয়ে যাচ্ছেন। কিংবা করোনার প্রভাবে ছাঁটাই হয়েছেন, তিনিও স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করেছেন। করোনার এই বন্দি সময়ে যখন একদল পেশাজীবী ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হয়ে অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরেছেন, তখন সম্ভাবনার পাশাপাশি আতঙ্কও ভর করে।

নিশ্চিতভাবেই পরিস্থিতি করোনাময় থাকবে না। স্বাভাবিক সময় বা নিউ নরমালে মানিয়ে নেওয়ার অবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই হবে। সেই সময় ছাঁটাই হওয়া বা বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চয়ই আবার চালু হবে। পেশায় ফিরতে হবে পেশাজীবীদের। চিকিৎসকটি নিশ্চয়ই চেম্বারে ফিরে যাবেন। গার্মেন্টসের অর্ডার কমে গেছে বলে চাকরিচ্যুত হওয়া লোকটিও নিশ্চিতভাবেই সরিষার তেল আর মধু বিক্রি বন্ধ করে কাজে ফিরে যাবেন। যেতেই হবে, কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বিশ্বে কাপড়ের চাহিদা বাড়বে। গার্মেন্টস আরও বড় ভেঞ্চারে যাবে। ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যিনি বাড়িতে মমো বিক্রি করছিলেন হোমমেকার হিসেবে, তিনিও নিশ্চয় আবার টিকিট/ট্রাভেল জোরদারভাবে শুরু হলে পুরনো কাজে ফিরেই যাবেন। এই ফিরে যাওয়া মানুষগুলোর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ।

৭৫ শতাংশ করোনাকালীন স্টার্টআপ উদ্যোক্তা কীভাবে জানলাম, এই প্রশ্ন আসতেই পারে।

গত তিন বছরের ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা যখন মাত্র ৬ মাসে ৪ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়, তখন সেটি ৭৫ শতাংশ আয়। তাহলে হিসাবের খাতায় বাকি থাকে ২৫ শতাংশ লোক। এই ২৫ শতাংশ মানুষও যে খুব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করছেন তা কিন্তু নয়। তাদের ৯৯ শতাংশই এফ কমার্সভিত্তিক। অর্থাৎ ফেসবুকের জোরে ব্যবসা চলছে। যদি কখনও ফেসবুক বন্ধ করা হয়, সেদিন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অনলাইন ব্যবসায় লেনদেন ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে আসবে।

হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছাড়া কমবেশি সবারই অনলাইন ব্যবসা এফ কমার্সভিত্তিক। তাই বুঝে নিতে হবে কী তুমুল ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে অনলাইনের ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজার।  

আরও ভয়ংকর দিক হচ্ছে, অনলাইন ব্যবসার নামে সুবিশাল অঙ্ক লেনদেন হচ্ছে দেশের মূল অর্থনীতিকে স্পর্শ না করে।  ১৬ হাজার কোটি টাকার যে বাজার তৈরি হয়েছে তার ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ উদ্যোক্তা। যাদের লাইসেন্স, ব্যবসায়িক অনুমোদন নেই। কারা এসব এফ-কমার্স, ই-কমার্সকে অনুমোদন দেবে সেই প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। ই-ক্যাবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হয় নিজ উদ্যোগে কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে কিন্তু তাদের অনুমোদন দেবে কে, সেই হদিস গত ১০ বছরে হয়নি। এমন কোনও উদ্যোগ কোনও সংগঠন বা রাষ্ট্র থেকে নেওয়া হয়নি, যাতে এই সম্ভাবনাময় বিশাল বাজার টিকে যেতে পারে। চরম দুর্যোগ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকতে পারে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যখন খুশি আসছেন, কিছু দিন ব্যবসা করছেন, এরপর পুরনো পেশায় ফিরে যাচ্ছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ বা অনুমোদন দেওয়ার বালাই থাকছে না। ফলে রাজস্বের বাইরে থাকছে এই ১৬ হাজার কোটি টাকার হিসাব।

তবে অনেক অনলাইন উদ্যোক্তাই নিজেদের উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদনপত্রে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের এস্টাবলিশমেন্ট ঠিকানা চাওয়া হয়। কিন্তু এফ-কমার্সে তো ঠিকানা বলতে ওই ফেসবুক। তাহলে তাদের ব্যবসার জন্য কেন এখনও নীতিমালা করা হলো না।

অপার সম্ভাবনার আই বাণিজ্য খাতটিকে হেলায় না হারিয়ে সামান্য কয়েকটি নিয়ম তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে এনে অনায়াসে রাজস্ব বৃদ্ধির সুব্যবস্থা করা যাবে।

এদিকে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতিও একান্ত অনুরোধ, হুটহাট ব্যবসায় নেমে একটু ভ্যাকুয়াম তৈরি করার আগে কয়েকবার ভেবে নেবেন। সারা জীবন যে কৈ মাছ ফ্রি পেয়ে আসছেন, অনলাইনে ১০০ টাকায় বিক্রি করা যায় বলেই হুজুগে মেতে উঠবেন না।

যে বাজার দাঁড়াতে যাচ্ছে সেটিকে দাঁড়াতে দিন। নতুবা সেই ফেসবুকে শেয়ার করা বন্ধুর স্ট্যাটাসটিরই পুনরাবৃত্তি করি- পেইজে ইনভাইটেশন দিচ্ছেন দেন। ভালোবেসে লাইক দিবো। উদ্যোক্তা হওয়ার হোন, সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য দিবো। কিন্তু করোনা শেষ, সব ছেড়ে চাকরির লাইনে দাঁড়িয়েছেন তো...।

লেখক: সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা।

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২০

ডা. জাহেদ উর রহমান গাজীপুরের মেয়র এবং গাজীপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ‘ঝামেলা’য় পড়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে থেকে জানা যায়, তিনি এক ঘরোয়া আলোচনায় দলের শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এর জেরে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর কিছু দিন আগে তার ঘটানো আরেকটি কাণ্ডের জন্য জনাব জাহাঙ্গীরের আরও শক্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া উচিত ছিল দলের পক্ষ থেকে, কিন্তু পাননি। বর্তমান বাংলাদেশে সেটা হবে এমন প্রত্যাশা করার মতো বোকা আমি নই। সে বিষয়টা জানার আগে জেনে নেওয়া যাক একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা, যিনি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের ভাই, অনেক দিন থেকেই নানা আলোচনা-সমালোচনায় আছেন। নানা বক্তব্য আর কাণ্ডকীর্তির কারণে মিডিয়ায় সংবাদ হন নিয়মিত। কিছু দিন আগের একটা সংবাদ মিডিয়ার বেশি মনোযোগ না পেলেও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

গত মাসে কোম্পানীগঞ্জের ‘হুমায়ুন টিম্বার মার্সেন্ট অ্যান্ড স মিল’ নামের প্রতিষ্ঠানটি খাসজমিতে করা হয়েছে দাবি করে কাদের মির্জার লোকজন কারখানাটি জোর করে উচ্ছেদ করে ‘শিশুপার্কের জন্য নির্ধারিত স্থান’ লেখা সংবলিত একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন।

জমির মালিক জানান, এর আগে জমি খাস দাবি করে সেখান থেকে তার স্থাপনা সরানোর আদেশ দেন জনাব কাদের মির্জা। আদেশের বিরুদ্ধে তারা জেলা জজ আদালতে গত ২৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। আদালত মামলা আমলে নিয়ে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে বিবাদী পক্ষের প্রবেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এই ভূমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল তার প্রমাণ আছে। এই ঘটনা প্রসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, তাকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফোনে ঘটনাটি জানানোর পর তিনি পুলিশ পাঠিয়ে মেয়রকে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বার্তাটি পৌঁছান। এরপর পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে। অর্থাৎ ওসি নিশ্চিত করেছেন, এই জমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি মেয়রের লোকজনকে বাধা না দিয়ে নিষেধাজ্ঞার বার্তা পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।

যে পত্রিকাটি এই রিপোর্টে করেছে তারা জানায়, নানাভাবে চেষ্টা করেও তারা জনাব কাদের মির্জা সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি, তাই এই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা যায়নি। অর্থাৎ মিডিয়ার প্রশ্নের সামনে পড়ে জবাব দেওয়ার ‘সাহস’ জনাব কাদের মির্জার ছিল না। ঠিক এই জায়গায় গাজীপুরের মেয়র আবার অনেক বেশি সাহসী, আগ্রাসী।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি)-এর অধীনে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে।

ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলতি বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে, না হয় মালিকদের যার যার আবাসিক ভবন, কারখানা, দোকান বা সীমানা প্রাচীর আংশিকভাবে ভাঙতে বাধ্য করেছে। 

তবে, বেশিরভাগ বাসিন্দাই কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি। উল্টো নিজেদের জমিতে সিটি করপোরেশনের ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে অনেককে। এছাড়া, ব্যক্তিগত জমির কয়েকশ’ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অবশ্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) দাবি, এই প্রকল্প দুটিতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও বিধান নেই। ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তির সম্পত্তি দখল নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙা হয়েছে। শুধু সেটাই নয়, এখানে ঘটেছে আরও বড় ঘটনা– লঙ্ঘন করা হয়েছে দেশের হাইকোর্টের রায়ও।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ছিল, কিন্তু ভাঙা হয়েছে সেগুলোও। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী কোম্পানি কোনাবাড়ী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু পুলিশ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি নেয়নি। পরে তার কোম্পানি গাজীপুর আদালতে মামলা করে।

বসুরহাট পৌরসভার ঘটনাটিতে জনাব কাদের মির্জাকে চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। ভিন্ন নম্বর থেকে পাওয়া গেলেও সেই পত্রিকার পরিচয় পাবার পর ফোন কেটে দেন তিনি। মিডিয়াকে ফেইস করার ‘সাহস’ পাননি তিনি। কিন্তু গাজীপুরের মেয়র এসব ব্যাপার থোড়াই কেয়ার করেন। ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেয়র সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি যদি সরকারি আইন মেনে চলেন, তাহলে এখানে কিছু করতে পারবেন না।’

আবার একটু মনে করে নিই, বসুরহাটের ঘটনাটিতে পুলিশ আদালতের রায় কাদের মির্জার লোকজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফিরে চলে এসেছিল। অথচ কথা ছিল আদালতের রায় অনুযায়ী প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে কাদের মির্জার লোকজনকে থামানো এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা। আর গাজীপুরে পুলিশ মামলা নেয়নি ভুক্তভোগীদের।

‘মগের মুল্লুকে’র সাথে একটা আধুনিক রাষ্ট্রের পার্থক্য হচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র কতগুলো আইন দ্বারা পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সেই আইন মেনে চলতে বাধ্য। আইনভঙ্গ হওয়াজনিত কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে আদালতে যাবে এবং আদালত যদি তার পক্ষে রায় দেয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রশাসন বিভাগের অবশ্য কর্তব্য হবে আদালতের রায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান মানুষ দুর্বল মানুষের ওপর, এমনকি রাষ্ট্রও কখনও নাগরিকের ওপর নিষ্পেষণ চালাতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বিচার বিভাগই পারে হুমকির মুখে থাকা নাগরিকদের রক্ষা করতে। তাই এই রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের জন্য কল্যাণকর একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে বিচার বিভাগেরও আমূল সংস্কার করতে হবে, কোনও সন্দেহ নেই এতে।

কিন্তু সবকিছুর পরও বিচার বিভাগের সংবিধান স্বীকৃত ক্ষমতায় অসাংবিধানিক/বেআইনি কোনও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। অথচ এই দেশে দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এক মেয়র আদালতকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করেন আর আরেক মেয়র একই কাজ করার পর আবার বড় গলায় ঘোষণা করেন সরকারি আইন তিনি মানবেন না।

দুই মেয়র এই দেশটাকে কী মনে করছেন? যেটাই মনে করেন না কেন, তাদের বিরাট লাভ হতে পারে– কারণ এর ফলে তারা আইন-কানুন, রীতি-নীতি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে করতে পারে যা খুশি তা। কিন্তু আমরা সাধারণ নাগরিকরা কেন মেনে নেবো সেটা? কেন আমরা এই দুটি ভয়ংকর ঘটনাকে ছোট বিষয় বলে মনে করবো?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

এই আগুনের পেছনে কে?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৪

আমীন আল রশীদ এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: ধরা যাক আপনি শুনতে পেলেন আপনার এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনও একজন লোক ফেসবুকে ইসলাম সম্পর্কে খারাপ কথা লিখেছেন। আপনি কি লাঠিসোঁটা আর আগুন নিয়ে ওই লোকের বসতবাড়িতে গিয়ে হামলা চালাবেন? ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবেন? পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলবেন? সহজ উত্তর হচ্ছে– না। কারণ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি এতটা হিংস্র বা উগ্র নন। আপনি জন্মের পর থেকে যাদের সঙ্গে একই আলো-হাওয়া, একই পানি ও জলে বেড়ে উঠেছেন, কথিত ধর্ম অবমাননার গুজবে আপনি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারেন না। এটা আপনি করেননি। যদি না করেন তাহলে কুমিল্লার মন্দিরে কে কোরআন  নিয়ে গেলো এবং সেই সংবাদ বা গুজবে কারা পরবর্তীতে ওই মন্দিরে হামলা চালালো? কুমিল্লার এই আগুন কী করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেলো? রংপুরের পীরগঞ্জে কারা উসকানি দিলো এবং কারা গিয়ে পুরো পল্লিটি জ্বালিয়ে দিলো?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু তারপরও দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক উসকানি, মন্দিরে আগুন, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের কথিত ‘সংখ্যালঘু’ তকমা দিয়ে তাদের জায়গা-জমি দখল করে দেশছাড়া করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত যেসব ঘটনা ঘটেছে—সেখানে সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের কোনও দায় ছিল না। এর নেপথ্যে বরাবরই কাজ করে ভোটের রাজনীতি। কখনও ব্যক্তিগত বিরোধও রাজনীতির মোড়কে রঙ পাল্টায়। কখনও এসব ঘটনার পেছনে থাকে ভূ-রাজনীতি। থাকে এই অঞ্চলের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর নানা স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো,  অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার মূল হোতাদের কি চিহ্নিত করে বিচার করা গেছে? নাকি প্রতিটি ঘটনাই রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে গেছে? মাঝখানে প্রাণ গেছে কিছু নিরীহ মানুষের। অনেক সময় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীও ভিকটিম হয়েছেন—যাদের সবাই হয়তো প্রকৃত অপরাধী নন।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, যখনই এ রকম ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর বা কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে, তখন দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক পক্ষ পৌনঃপুনিকভাবে একইরকম কথাবার্তা বলে। কম্পিউটারের প্রোগ্রামিংয়ের মতো তাদের বক্তব্যও নির্ধারিত। ঘটনা যাই ঘটুক, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কোনও ব্যত্যয় হয় না। এবারও তা-ই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এর পেছনে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তথা তাদের ভাষায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। তারাই দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। পক্ষান্তরে বিএনপির দাবি, সরকার তাদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। মধ্যপন্থীদের অনেকে মনে করেন, এটা বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের উসকানি। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে ধর্মীয় উগ্রবাদ বিস্তৃত হচ্ছে, তারই প্রতিফলন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভূ-প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি কেবলই পানের অযোগ্য লবণাক্ত জলের আধার নয়। বরং এর নিচে রয়েছে বিশাল সম্পদ। ব্লু ইকোনমির বিরাট সম্ভাবনা। বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটি লোকের বাজার। বাংলাদেশ এখন উপভোগ করছে পপুলেশন ডিভিডেন্টের সুবিধা—অর্থাৎ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী যখন তরুণ-উদ্যমী-শক্তিশালী-সাহসী—যে সুযোগ কোনও একটি জাতির জীবনে শত বছরেও আসে না এবং যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী; করোনার অতিমারিতে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও যখন বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ যে বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে—এসব সফলতা অনেকেরই হয়তো মন খারাপের কারণ হতে পারে।

সুতরাং কে কোথা থেকে কোন উদ্দেশ্যে কলকাঠি নাড়ছে তা বোঝা মুশকিল। তবে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে এই অঞ্চলের অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রসায়ন কেমন—এটিও ভাবনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে; অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে; নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের স্পর্ধা দেখাতে পারলে যদি কারও মন খারাপ হয়—তখন তারা বাংলাদেশের সেই স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের সেই অর্থ-লোকবল ও কৌশল আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকলে যদি কারও মন খারাপ হয়; কেউ যদি মনে করে যে বাংলাদেশ খারাপ থাকলেই তার ভালো—তাহলে গতকাল রামু, আজ কুমিল্লা, কাল পীরগঞ্জ—চলতেই থাকবে। সুতরাং বাংলাদেশ যদি সত্যিই কারও মন খারাপের বলি হয়ে থাকে, এবং ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল বা রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা না যায়—তাহলে এই আগুন সহজে নিভবে না।
মনে রাখা দরকার, কারণ সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করে না। কোনও সাধারণ মুসলমান মন্দিরে কোরআন শরিফ রেখে আসে না। কোনও সাধারণ হিন্দু মন্দিরে কোরআন শরিফ নিয়ে তাদের মূর্তির পায়ের নিচে রাখে না। বরং এই কাজগুলো করেন ‘অসাধারণরা’। সেই ‘অসাধারণ’দের চেনা দরকার এবং তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার।

কেউ যদি ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মানুষকে বিভক্ত করে ভোটের রাজনীতি করতে চায়—তাহলে তাদের প্রতিহত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সব ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্টিকর্তা, ধর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্মের অবতারের কথিত অবমাননার গুজব উঠলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ভাবতে হবে, আপনি কার মন্দিরে আগুন দিচ্ছেন? আপনি কার বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছেন? আপনি কাকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন? সে তো আপনারই প্রতিবেশী। আপনি কেন অন্যের রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছেন?

এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষের ঐক্য। কার কী ধর্মীয় পরিচয়, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যেকের প্রধান পরিচয় যে ‘মানুষ’, সেই মানুষ পরিচয়টিকে সামনে নিয়ে আসা দরকার এবং মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে সম্মান করতে পারলেই এবং হুজুগ ও গুজবে কান না দিয়ে বরং প্রত্যেকে তার নিজের ধর্ম নিজের মতো করে পালন করতে পারলেই দেশি-বিদেশি-রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনও উসকানিই সফল হবে না। আর এটা করতে না পারলে আরও অনেক বিপদ দেখার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

 লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

সাতক্ষীরায় ১০ সাংবাদিক পেলেন মিডিয়া ফেলোশিপ

সাতক্ষীরায় ১০ সাংবাদিক পেলেন মিডিয়া ফেলোশিপ

বুয়েটে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

বুয়েটে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

বিশ্বকাপ শেষ সাইফউদ্দিনের, মূল দলে রুবেল

বিশ্বকাপ শেষ সাইফউদ্দিনের, মূল দলে রুবেল

আর কত সুযোগ পাবেন লিটন?

আর কত সুযোগ পাবেন লিটন?

কারখানা থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পোশাক শ্রমিক

কারখানা থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পোশাক শ্রমিক

দ্বিতীয় ধাপে ৮১ চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

দ্বিতীয় ধাপে ৮১ চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

ইইউ বাজারে রফতানি পণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করার আহবান

ইইউ বাজারে রফতানি পণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করার আহবান

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা মামলায় ১৬ জনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা মামলায় ১৬ জনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের সমর্থন চায় বিজিএমইএ

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের সমর্থন চায় বিজিএমইএ

রেইনট্রিতে শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলার রায় আজ

রেইনট্রিতে শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলার রায় আজ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ইইউ’র উদ্বেগ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ইইউ’র উদ্বেগ

বিশ্বকাপে পাকিস্তানের উৎসব চলছেই

বিশ্বকাপে পাকিস্তানের উৎসব চলছেই

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune