সেকশনস

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে?

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২০, ১৫:৫৮

মামুন রশীদ শিরোনামটি হুমায়ুন আজাদ থেকে ধার করা। তিনি এই বিষয়ে ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন। ওটি মূলত বড়দের বা পারিবারিক অবক্ষয় নিয়ে লেখা। তাই কবিতাটিই বেছে নিলাম। কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—

‘আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চ’লে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের
সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুর
ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল
কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।
চলে যাবে সেই সব উপকথাঃ সৌন্দর্য-প্রতিভা-মেধা;
এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা
নির্বাধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে
অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।’
গেলো প্রায় তিন/চারদিন থেকে হুমায়ুন আজাদকে স্মরণ করছিলাম। কবি-সাহিত্যিকেরা সাধারণত আদর্শবাদী হন। হুমায়ুন আজাদও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তবে সমাজের পচা-গন্ধ, নিষ্ঠুর-নির্মম বিষয়গুলো তুলে এনেছেন বা আনতে পারতেন অনায়াসে।
আমার এক ছোটবেলার বন্ধু বললেন, কী বলছিস নষ্টের অধিকারে চলে যাবে, আর বাকি কি আছে?
এক অনুজপ্রতিম সাংবাদিক বন্ধু লিখেছেন, সাহেদরা এই ঘুণে ধরা সমাজের একটি ছোটখাটো বহিঃঅঙ্গ মাত্র। যেন চুনোপুঁটি। তাকে তৈরি করেছেন যে মুনিঋষিরা তারা রয়ে গেছেন জালের অনেক বাইরে, কবির ভাষায়—হয়তোবা কোনো প্রার্থনালয়ে, রাষ্ট্রের উচ্চপদে, সম্মানিত সম্পাদক হয়ে বা হয়তোবা সকলের মুশকিল আহসান’ হিসেবে। অর্থনীতির ছাত্র বলে তিনি আবার কয়েক ছত্র ব্যয় করেছেন ‘স্বজনতোষী ধনতন্ত্র’ নিয়ে। স্বজনতোষী ধনতন্ত্র রাজনৈতিক আনুকূল্যে কাউকে অনেক ওপরে তুলে নিয়ে যায়, কেউবা ছিটকে পড়ে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক না হলেও ভালো করে সাহিত্য পড়েছেন মনে হয়। ক্যাসিনো রহস্য উদঘাটনের সময় তিনি অত্যন্ত সুন্দর করে বলেছিলেন এই সমস্ত নব্য ধনীরা বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বড় হওয়া ব্যক্তিরা কী করেন, কী তাদের আচরণ। সাহেদ ঘটনা উদঘাটনের পরেও বলেছেন। পাপিয়া ঘটনার পরে অবশ্য তিনি কিছু বলেননি। হয়তো রুচিতে বেধেছে।
আমরা ভেবেছিলাম এই করোনাকালে রোগে-শোকে ভুগে মানুষ ভালো হয়ে যাবে। পরম দয়ালু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ‘মাফি মাঙবে’। কিন্তু এ কী দেখছি আমরা? বিদেশের দামি ওষুদের নামে ট্যাবলেটের মধ্যে নাকি আটা-ময়দা। পাঠকেরা কি জানেন যে তিনটি ফার্মেসির নাম এসেছে, তাদের মালিক কে? একজন মোনাজাতে আল্লাহর নাম জপতে জপতে কান্না আর থামাতেই চান না, একজন ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী আর আরেকজনকে আপনারা প্রায় সবাই চেনেন।
অর্থনীতিবিদেরা বললেন, এই করোনায় কৃষক বিক্রি করতে পারছেন না। তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা সৃষ্টিই নাকি হবে আমাদের বিরাট কাজ। মূল্যস্ফীতির কোনও সম্ভাবনা নেই। অথচ আমরা দেখলাম—নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যে পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করে গেলো তিনমাসে তাদের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ। কৃষক তো নয়, টাকাটা তাহলে বানাচ্ছে কে?
সামাজিক মাধ্যমে দেখলাম, একটি বাচ্চা মেয়ের চিন্তার শেষ নেই। সে ভাবছে, সাহেদ আর সাবরিনা মিলে যে হাজার হাজার করোনা রোগীকে নিজের মতো করে ‘পজিটিভ’ আর ‘নেগেটিভ’ বানিয়ে দিলেন, পজিটিভরা না হয় আইসোলেশনে চলে গেলেন, নেগেটিভরা তো অতীব আনন্দে আরও হাজারো জনকে ‘নাচতে নাচতে’ সংক্রমিত করলেন! বিদেশ থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে না হয় চেপেই গেলাম। অথচ এই ভদ্রলোক এমনকি ভদ্রমহিলাকেও দেখলাম জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রাখছেন—কিসে এই জাতির ভালো হবে আর কিসেইবা পতন।
অনেকের সঙ্গেই সাহেদ সাহেবের ছবি দেখলাম। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ বা সাংবাদিকদের আমি দোষ দেই না। তারা বেশিরভাগ সময় অল্পতেই সন্তুষ্ট। তবে বিদেশে সরকারি উচ্চপদের আসীনদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে স্থানীয় দূতাবাসের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া বোধহয় সম্ভব নয়। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে একজন এসএসসি পাস অবৈধ হাসপাতাল মালিকের কি লেনদেন থাকতে পারে? নাকি আমি বোকার মতো কথা বলছি? পাপুল বা তার স্ত্রী কীভাবে মহান জাতীয় সংসদে ঢুকে পড়লেন, তা দেখছি আমি ছাড়া প্রায় সবাই জানেন। কোন ‘বিশেষ ব্যক্তির কী ভূমিকা’? জানেন। এই বিশেষ ব্যক্তিদের কিন্তু অধিক জ্ঞান ও প্রতিপত্তির সঙ্গে আবার অনেক বয়সও। একজন মারা গেলেও আরেকজন বোধহয় কখনও মরবেন না আর মুনকার-নাকিরও তার দেখা পাবে না।
অনেকের মতে, ছোট্ট একটি ভূখণ্ডে আমাদের সবাইকে মিলে মিশে থাকতে হবে যেমনটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তার মানে কি আমাদের আর শত্রু নেই, সবাই আমাদের বন্ধু? প্রায় বারো বছর একটি সরকার আছে, তারা অনেক জায়গায় বেশ ভালো করেছেন। তবে বারো বছরেও আমরা সামাজিকভাবে অনেক অনেক পিছিয়েছি। পাপুল, পাপিয়া, সম্রাট, সাহেদ আর সাবরিনাদের নির্মাণশিল্প দেখি আরও বড় হচ্ছে। অনেক অনেক বড়। অনেকটা ‘আনম্যানেজেবল মনস্টারে’র মতো। তার যেন শুরু আছে শেষ নেই।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

 

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

মিতব্যয়িতা মূল্যবোধেরই অংশ হওয়া উচিত

মিতব্যয়িতা মূল্যবোধেরই অংশ হওয়া উচিত

আব্দুল আজিজ ও বাজেটে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন

আব্দুল আজিজ ও বাজেটে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন

মি. বিশ্বাসকে কে খুন করলো?

মি. বিশ্বাসকে কে খুন করলো?

সামাজিক অবক্ষয়ই আমাদের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা

সামাজিক অবক্ষয়ই আমাদের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা

বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো কি সম্ভব?

বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো কি সম্ভব?

দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যাবে না

দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যাবে না

এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?

এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?

বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের ভূমিকা কি ফুরিয়ে গিয়েছে?

বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের ভূমিকা কি ফুরিয়ে গিয়েছে?

শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে না

শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে না

লকডাউন তুলে নিলে কী হবে?

লকডাউন তুলে নিলে কী হবে?

করোনায় কৃষি ও দরিদ্রদের সহায়তা

করোনায় কৃষি ও দরিদ্রদের সহায়তা

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান: কৃচ্ছ্রসাধনই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান: কৃচ্ছ্রসাধনই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত

সর্বশেষ

শিশু গৃহকর্মীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

শিশু গৃহকর্মীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

হারানো টাকা উদ্ধারে ‘চালপড়া’ খাইয়ে সন্দেহ, নারী শিক্ষকের জিডি

হারানো টাকা উদ্ধারে ‘চালপড়া’ খাইয়ে সন্দেহ, নারী শিক্ষকের জিডি

হ্যান্ডকাপ খুলে পালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, চলছে চিরুনি অভিযান

হ্যান্ডকাপ খুলে পালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, চলছে চিরুনি অভিযান

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, মধ্যরাতে বিক্ষোভ

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, মধ্যরাতে বিক্ষোভ

আপত্তির মুখে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন

আপত্তির মুখে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন

সংকট সামলাতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ছে

সংকট সামলাতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ছে

নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়েও এবার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী তারা

ডিরেক্টরস গিল্ড নির্বাচন ২০২১নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়েও এবার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী তারা

৬ বছর পর রাণীনগর আ. লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

সভাপতি হেলাল সা. সম্পাদক দুলু৬ বছর পর রাণীনগর আ. লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

ভেঙে পড়া গাছচাপায় নিহত ২

ভেঙে পড়া গাছচাপায় নিহত ২

প্রক্টর কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পেটালো ছাত্রলীগকর্মী

প্রক্টর কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পেটালো ছাত্রলীগকর্মী

ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা

ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.