X
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

আওয়ামী লীগের এক সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের পথপরিক্রমা

আপডেট : ২৩ জুন ২০২১, ১০:২৩

ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এ বছর পালিত হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে উদযাপিত হচ্ছে মুজিববর্ষ। এই শুভক্ষণে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল উদযাপন করছে সফলতার সাথে ৭২ বছর। দেশসেবার পবিত্র দায়িত্ব পেয়ে বিগত প্রায় এক যুগ ধরে আওয়ামী লীগ আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে উন্নীত করেছে এক অনন্য উচ্চতায় এবং প্রতিষ্ঠিত করেছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রয়েছে অতীত ঐতিহ্য, গৌরব ও সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের অধীনে থাকা ভারত দুই দেশে বিভক্ত হয়৷ জন্ম নেয় নতুন দুই রাষ্ট্র৷ ভারত ও পাকিস্তান৷ পাকিস্তানের অংশ হয় পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ)। এই প্রদেশে যারা মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাদের কাছে পূর্ব বাংলার নেতারা অবহেলিত হয়েছেন ধারাবাহিকভাবে। দীর্ঘ নিপীড়নের ফলশ্রুতিতে নতুন দল গঠনের আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন অঙ্গীকার নিয়ে এর সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন করে দলের নাম ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অনেকেই সেদিন রোজ গার্ডেনে উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিষ্ঠাকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দলটির সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘কোথাও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল।’ দীর্ঘদিনের পথচলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বহু আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি। বাংলায় সকল ন্যায্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল মুখ্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম ছিল দলটির প্রাত্যহিক সঙ্গী। ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ- যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস’ সরকারের রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের এটি একটি বড় অর্জন। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ভাষা আন্দোলন: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলেছিলেন। এমন ঘোষণায় দেশের ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার কারণে ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৫ মার্চ মুক্তিলাভের পরের দিনই ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগ্রাম পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ডিসেম্বর মাসে তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়, একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। ৫২’র ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় মিছিল করলে কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ জন্য বঙ্গবন্ধু জেলখানায় বসে অনশনও করেছেন। ছাত্রদের আন্দোলনের ফলে পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত বাতিল করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।

ছয় দফা আন্দোলন: দেশভাগের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে অধিকার থেতে বঞ্চিত করতে থাকে। এসব বিষয় সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেন। পরবর্তীতে ছয় দফা দাবির কর্মসূচিকে ‘আমাদের (বাঙালির) বাঁচার দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তা নিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের দরবারে হাজির হন। এরই মধ্যে মতিঝিলের ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে (মার্চ ১৯৬৬) বঙ্গবন্ধু ছয় দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নেন। কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু সম্মেলনের উদ্যোক্তারা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা প্রস্তাব এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হয়। পরে ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে পাকিস্তান সর্বদলীয় রাউন্ড টেবিল বৈঠকে দাবিগুলো উপস্থাপন করেন শেখ মুজিবুর রহমান।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ছয় দফার অনুরূপ দাবি নিয়ে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ১১ দফার ভিত্তিতে গঠিত হয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ডাকসুর সমন্বয়ে এই প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়। গণঅভ্যুত্থান দমন করতে ব্যর্থ হয়ে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে বাধ্য হন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে সাধারণ জনতারা প্রতিবাদ করেছিল। এই আন্দোলনকে ঠেকাতে পাকিস্তান সরকার আগরতলা মামলা করেন। যার প্রধান আসামি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মামলার প্রধান আসামিসহ অন্যদের মুক্তি ও পাকিস্তানি সামরিক শাসন উৎখাতের দাবিতে ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সান্ধ্য-আইন ভঙ্গ করে সাধারণ মানুষ মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়। এরপর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। এই আন্দোলন দেশের স্বাধীনতার এক অনন্য মাইলফলক।

সত্তরের নির্বাচন: গণআন্দোলনের পর আইয়ুব খানের পতন হয়। এতে নতুন করে ৩১৩ আসনবিশিষ্ট পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সামগ্রিক পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেও সরকার গঠনের সুযোগ দেয় না ষড়যন্ত্রকারীরা। সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার অপচেষ্টা করেন।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ: নির্বাচনে জয়লাভের পর সরকার গঠন করতে না পারার মধ্যে বঙ্গবন্ধু এক বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত উপলব্ধি করেন। এ জন্য স্বাধীনতা ও নতুন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা চিন্তা করেন। এ জন্য ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সভায় স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেন। পাকিস্তান জান্তা কর্তৃক ২৫ মার্চ রাত্রে বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামের নেতা এম এ হান্নান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত লিফলেট পাঠ করেন। এবার শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। তবেই পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করতে ও বিজয় লাভের পর বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তারা। সেখান থেকে তিনি বাংলাদেশে এসে নতুন করে রাষ্ট্র গঠন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালিরা স্বাধীন ভূখণ্ড লাভ করে। পরবর্তীতে কিছু বিপথগামী সেনাবাহিনীর দল ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা আওয়ামী লীগ ও নেতাকে নিশ্চিহ্ন করার পথ বেছে নেয়। ষড়যন্ত্রকারী ও ঘাতক সেনাবাহিনীর হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে ছিলেন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের বুলেটে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর ক্ষমতা দখল করেন সেনাবাহিনী। দেশে সামরিক শাসন জারি করে স্বৈরাচারী শুরু করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দীর্ঘদিন পর বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আবার দলকে সংগঠিত করেন। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদের শাসনের পতন হয়।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বিএনপির দুর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ার পর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহার দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। পরবর্তীতে সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনা শুরু করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নির্বাচনে জয়লাভের পর ইশতেহারের অন্যতম দুটি বিষয় রাজাকার ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারকার্য সম্পন্ন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এতে দেশের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ আরও বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে।

পরবর্তীতে দশম সংসদ নির্বাচন ২০১৪ সালে বিজয় লাভ করে। জনপ্রিয়তা ও উন্নয়নের ধারার বজায় রাখার ইশতেহার দিয়ে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে এই দল। বর্তমানে টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিশ্বদরবারে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হয়েছে বাংলাদেশ। দল হিসেবে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী অবস্থান ধরে রেখে জনকল্যাণে কাজ করে চলেছে আওয়ামী লীগ। ভারতে যেমন জাতীয় কংগ্রেস, রাশিয়ায় ইউনাইটেড রাশিয়া, পিপলস অ্যাকশন পার্টি, মালয়েশিয়ায় ইউনাইটেড মালয় নিজ নিজ দেশের ঐতিহ্য, সংহতি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছে, তেমনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে চলেছে নিরন্তর।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিরলসভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ও বঙ্গবন্ধুর সঠিক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যার দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। একসময়ের ঋণগ্রহীতা বাংলাদেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে এখন আর্থিক ও মানবিক সহায়তা করছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২২২৭ মার্কিন ডলার। মূলত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই অদম্য বাংলাদেশ এখন আধুনিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে। ভিশন ২০৪১ থেকে ভিশন ২০৭১ হয়ে শতবর্ষের ডেল্টা পরিকল্পনা বাংলাদেশের সাফল্যকে ছড়িয়ে দেবে বিশ্বময়। বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন সূচকের উন্নতি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। নারী-পুরুষের ক্ষমতার ভারসাম্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের রোল মডেল।

লেখক: অধ্যাপক; সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি); পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

একমুখী শিক্ষা : সবার জন্য সমান শিক্ষা

একমুখী শিক্ষা : সবার জন্য সমান শিক্ষা

শেখ রাসেল এক অনন্য শিশুসত্তা

শেখ রাসেল এক অনন্য শিশুসত্তা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা

বিশ্ব শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু

বিশ্ব শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

সমাবেশ করবেন উপজেলার বিএনপিপন্থী সাবেক চেয়ারম্যানরা

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসাসমাবেশ করবেন উপজেলার বিএনপিপন্থী সাবেক চেয়ারম্যানরা

বিজয়ের মাসে ফাইভজি যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ: ওবায়দুল কাদের

বিজয়ের মাসে ফাইভজি যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ: ওবায়দুল কাদের

মোশাররফ করিম: পুলিশ অফিসার থেকে ডাকাত!

মোশাররফ করিম: পুলিশ অফিসার থেকে ডাকাত!

ওমিক্রন সংক্রমিত দেশ থেকে আপাতত না ফেরার আহ্বান

ওমিক্রন সংক্রমিত দেশ থেকে আপাতত না ফেরার আহ্বান

কর্মকর্তা-কর্মচারির বিভিন্ন পদে জনবল নেবে নোবিপ্রবি

কর্মকর্তা-কর্মচারির বিভিন্ন পদে জনবল নেবে নোবিপ্রবি

আমারি ঢাকায় বড়দিনের আয়োজন

আমারি ঢাকায় বড়দিনের আয়োজন

রামপুরায় ছাত্র নিহতের ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়: ওবায়দুল কাদের

রামপুরায় ছাত্র নিহতের ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়: ওবায়দুল কাদের

ট্রলারের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, চালকের লাশ উদ্ধার

ট্রলারের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, চালকের লাশ উদ্ধার

ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার

ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার

মোস্তাফিজের মতো দলহীন হয়ে থাকলেন রশিদ খান

মোস্তাফিজের মতো দলহীন হয়ে থাকলেন রশিদ খান

নথি জালিয়াতির ঘটনায় রিটকারীর বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ

নথি জালিয়াতির ঘটনায় রিটকারীর বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ

তদন্ত একতরফা: আদালতে পরীমণির অভিযোগ

তদন্ত একতরফা: আদালতে পরীমণির অভিযোগ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune