X
বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২১, ১৭:২১
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেমে নেই। প্রকট থেকে প্রকট, তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ বিস্তার। এর  প্রতিরোধের সাধ্যমতো চেষ্টা চলছে অবিরত। এ প্রচেষ্টায় কখন যে বিরতির নিশ্বাস ফেলা যাবে জানে না কেউই! এ অদৃশ্য শত্রু বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। অসহায় মানুষ সর্বশেষ মহান রবের কাছে প্রার্থনা করে, তিনি যেন এ অদৃশ্য শত্রুকে ঘায়েল করার ক্ষমতা তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাতকে দান করেন। আমিন।  

মহামানবদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁরা সকল সময় বিপদে ধৈর্য ধারণের জন্য বলেছেন। আমরা ধৈর্য ধরছি। আমাদের আপনজন, প্রতিবেশী, কাছের মানুষ, পরিচিতজনকে ইতোমধ্যে বিদায় দিয়েও নিজেদের জীবন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছি। যত দিন দেহে প্রাণ থাকবে বহমান, ততদিন আমাদের চলারগতি থাকবে চলমান। এ চলমান জীবনের সংগ্রামে সংসার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাজের সকল স্তরে বিরাজমান কার্যাদি যেন বিকল্প চিন্তার ভাণ্ডারে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিবারের প্রধানকে, সমাজের মাতাব্বরকে, অফিস প্রধানকে প্রতিনিয়ত বিকল্প ভাবতে হচ্ছে। এ বিকল্প ভাবনার ফলও আসছে দ্রুত। তাই তো আমরা অতিমারির সময়েও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে সক্ষম হচ্ছি।

আমাদের সরকার রাজস্ব আদায়কে অতীব জরুরি সেবার আওতায় স্থান দিয়েছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য অতি জরুরি সেবাগুলো যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্গানগুলো সচল রাখার ক্ষেত্রে রাজস্বও একটি অতীব জরুরি খাত। আগে তেমন না বুঝলেও এখন তা বঝুতে আর অসুবিধা হয় না। তাই কঠোর লকডাউন ব্যবস্থার মধ্যেও রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখার প্রজ্ঞাপন আমরা দেখেছি।

এ জরুরি সেবা খাতটির একমাত্র উপাদান দেশের নাগরিকগণ। যারা নিজেদের আয়-রোজকারের অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রকে চলার গতি দিয়ে থাকে।  প্রত্যেক করদাতা নাগরিক রাষ্ট্রের জন্য ডিম পাড়া হাঁসের মতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ডিম পাড়া হাঁসের প্রতি খামারিরা বিশেষ নজর রাখলেও করদাতা নাগরিকদের জন্য আমাদের রাষ্ট্রের করার তেমন কিছু নেই। বরং করদাতাদের হয়রানির অভিযোগ বিস্তর। তাই অনেক করদাতা জোর করে হলেও রাষ্ট্রকে 'ডিম' উপহার দিতে বিরাগ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বড়ই বোকা। জোর করে ডিম পাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে হাঁসও মরে, ডিমও ভেঙে চুরমার! কর আদায় ঋণাত্মক! বছর বছর ঘাটতি বাজেট; সংশোধিত বাজেট বা ঋণ করে ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক ব্যাপার।  

একটু কৌশলী হলে রাষ্ট্র অল্প বিনিয়োগে ব্যাপক রাজস্ব আদায় করার সুযোগ পেতে পারে। সভা, সেমিনার, নাগরিক সংলাপে আমরা অনেক গুণী মানুষকে বলতে শুনি রাষ্ট্র সকল সহজ উদ্যোগগুলো নিচ্ছে। শত কোটি টাকাও বরাদ্দ দিচ্ছে, ব্যয় হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটা আর আলোর মুখ দেখে না। এর অন্তরালে নাকি একটি চক্র আছে। এ চক্র সরকারকে তা করতে বাধাগ্রস্ত করে। করদাতারা অসহায় প্রাণীর মতো এ বাণীগুলো শুনে অবাক! সরকার নাকি চক্রের মধ্যে জিম্মি। তাহলে সরকারের দরকার কী? প্রতিটি জায়গা একটি করে চক্র সক্রিয় করে দিয়ে সরকার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকুক বা বিদায় নিয়ে ক্লান্তির নিশ্বাস ফেলুক। তবু তো আমরা বাঁচি। চক্রটি কিছুদিন চক্রান্ত করে ক্লান্ত হয়ে বলবে এবার করদাতাদের জন্য কিছু করি। এগুলো আমার আক্ষেপের কথা!

বাস্তবতা হলো সরকার চাইলে যেকোনও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, এবং ভালোভাবে পারে। তাই করদাতা নাগরিকদের কষ্ট লাঘব করা যায় এমন কিছু করার উদ্যোগ নিলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফলাফল আসবে।

এ ক্ষেত্রে চক্রকে দমন করার দায়িত্ব সরকারের। করদাতারা যত কম ঝামেলায়, সহজে ও নিরাপদে আয়কর পরিশোধ, নথি জমা ও সেবা পেতে পারে তার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার বিগত ১১ জুলাই ২০২১ তারিখে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের স্মারক নং ০৪.০০.০০০০.৫১৪.১৬.০০১.২১.২২৩-এর মাধ্যমে সরকারি সকল অফিসের দাফতরিক কাজসমূহ ভার্চুয়ালি (ই-নথি, ই-টেন্ডারিং, ই-মেইল, এসএমএস, হোয়াটস অ্যাপসহ অন্যান্য মাধ্যমে) সম্পন্ন করার ঘোষণা করেছে। এটা সময়োপযোগী একটি কাজ। এটা বাস্তবায়ন করা হলে অবশ্যই দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল থাকবে বাধাহীনভাবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সার্কুলারের বাইরে নয়। তবু রাজস্ব আদায় ও আয়করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধিও চলমান উদ্যোগগুলোর সঙ্গে অতিদ্রুততম সময়ের জন্য সার্কেলভিত্তিক ই-মেইল-এর মাধ্যমে রিটার্ন জমা নেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ বিগত বছর সীমিত পরিসরে সার্কেলভিত্তিক করমেলা হলেও এবার তা করা আদৌ সম্ভব কিনা, তা বলা কঠিন। তাই প্রতিটি সার্কেল থেকে একটি অভিন্ন ই-মেইল চালু করা হোক, যেখানে করদাতা বা তার প্রতিনিধি আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। করদাতার পক্ষে ইমেইল করার সঙ্গে সঙ্গে বা ই-মেইলটি গ্রহণ করার পর ফিরতি একটি ইমেইলে প্রাপ্তি স্বীকার অটোমেটিক চলে আসবে। এ ফিরতি ইমেইলটি হবে করদাতার জন্য প্রাপ্তিস্বীকার। ইমেইলভিত্তিক আয়কর রিটার্ন জমা নেওয়ার এ উদ্যোগটি হতে পারে এ সময়ের জন্য একটি সেরা উদ্যোগ।  

অনেকে বলবেন অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, তাই ইমেইলে দেওয়ার প্রয়োজন কী? কিন্তু অনলাইনে যে বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়, অনেক করদাতার পক্ষে তা বুঝা বা ধাপে ধাপে তথ্য দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে অনেকে এ সেবাটি গ্রহণ করতে তেমন আগ্রহী হচ্ছেন না। তবে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থা সহজীকরণ করেও রাজস্ব করদাতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যেতে পারে। যে উদ্যোগই নেওয়া হোক, তা যেন ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয় এবং করদাতাদের বুঝতে সহযোগিতা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নতুবা উদ্যোগগুলো কাজে আসবে না।

সম্প্রতি একটি ঘটনা বলে আজকের বিষয়টি শেষ করবো। আমি নিজে চলতি মাসে একটি ভ্যাট সার্কেল-এ বাংলা ফরমেটে একটি ভ্যাট রিটার্ন ইমেইলে সাবমিট করার জন্য সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তাকে অনুরোধ করি। তিনি আমাকে উত্তর দিলেন, ইমেইলে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে না। আমি উত্তর দিলাম সরকারি সিদ্ধান্ত আছে, আপনারা মানছেন না কেন? তিনি বলেন, আমাদের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। ফোন কেটে গেলো। কিছুক্ষণ পরে তিনি ফোন দিলেন, বললেন আপাতত জমা দেন, অফিস খোলার পর হার্ডকপি জমা দিয়ে দেবেন। আমি সম্মতি দিলাম এবং ইমেইলে পাঠালাম। ৩০ মিনিটি পর তিনি আবার ফোন দিলেন, বললেন, বাংলা ফরমেট গ্রহণযোগ্য নয়। আমি বললাম, ইংরেজি ফরমেট পাচ্ছি না। আপনার কাছে থাকলে একটু পাঠিয়ে দেবেন। তিনি উত্তর দিলেন, এগুলো আমাদের কাছে নেই, থাকে না। আপনার প্রয়োজনে আপনি সংগ্রহ করে নেবেন। আপনাকে যেমন নিজের প্রয়োজনে বিআইএন নম্বর নিতে হয়েছে, তেমনই রিটার্ন জমার ফরমেটও নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করতে হবে। এনবিআর অফিসের সামনে বিক্রি হয়, সেখান থেকে কিনতে পারেন।

ওনার কথা শোনার পর আমি বললাম, আপনার কথাটি আমি মেনে নিতে পারছি না। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আমাকে ফরমেট সংগ্রহ করে দেওয়া। আপনি আমাকে সরকারি বিনামূল্যের ফরম কিনতে বলতে পারেন না।

এ অফিসারকে আমি সরাসরি দেখিনি। মনে হয়েছে নতুন চাকরিতে যোগদান করেছেন। আমার মনে হলো তিনি আমার কথা একটু আমলে নিলেন। আচ্ছা রাখি বলে ফোনটা কেটে দিলেন। তারও ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যে আমার ইমেইলে ইংরেজি ফরমটি পাঠালেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং প্রশংসা করে একটি মেইলের উত্তর দেই। তিনি আমার কাছে এরপর দুই দুইবার ফোন করেছেন এবং আমাদের মধ্যে ভালো আলোচনা হয়েছে।

এ আলোচনাটা আনলাম এজন্য যে আমাদের নাগরিকরা যেমন কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তেমন কর আদায়কারী কর্মকর্তাদের মাঝেও কিছুটা ভাব কাজ করে এমন- আইন মোতাবেক সব দায়িত্ব নাগরিকের, সময় মতো তা না দিলে জরিমানা ও জেল হতে পারে। সুতরাং আমার এখানে কাজ কী? করদাতার কাজ করদাতাই করবেন। কিন্তু না, করদাতারা সচেতন হলে কর আদায়কারীরাও দায়িত্বশীল হবেন।    

লেখক: আয়কর আইনজীবী
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আয়কর নথি করদাতার জন্য ভয়ের নয়, সম্মানের হোক

আয়কর নথি করদাতার জন্য ভয়ের নয়, সম্মানের হোক

আইন মেনে এনজিও’র আয়কর রিটার্ন কি সম্ভব?

আইন মেনে এনজিও’র আয়কর রিটার্ন কি সম্ভব?

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

সিলেট বোর্ডে কমেছে সাড়ে ৭ হাজার এইচএসসি পরীক্ষার্থী

সিলেট বোর্ডে কমেছে সাড়ে ৭ হাজার এইচএসসি পরীক্ষার্থী

মধ্যরাতে দুই কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যু

মধ্যরাতে দুই কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যু

উড়োজাহাজে বোমার ভুয়া তথ্যটি আসে মালয়েশিয়ান নম্বরের ফোন কলে

উড়োজাহাজে বোমার ভুয়া তথ্যটি আসে মালয়েশিয়ান নম্বরের ফোন কলে

‘জরুরি অবতরণ করা’ বিদেশি উড়োজাহাজটিতে বোমা পাওয়া যায়নি

‘জরুরি অবতরণ করা’ বিদেশি উড়োজাহাজটিতে বোমা পাওয়া যায়নি

চিকিৎসার সুযোগ ‘উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র জন্য ইতিবাচক হবে

২৩ নাগরিকের বিবৃতিচিকিৎসার সুযোগ ‘উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র জন্য ইতিবাচক হবে

বোমা সন্দেহে শাহজালালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ‘জরুরি অবতরণ’

বোমা সন্দেহে শাহজালালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ‘জরুরি অবতরণ’

ভারত থেকে এলো ৪৫ লাখ ডোজ টিকা

ভারত থেকে এলো ৪৫ লাখ ডোজ টিকা

খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান: ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান: ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

'ওমিক্রন সন্দেহে বাড়িতে লাল পতাকা অমানবিক, অনৈতিক'

'ওমিক্রন সন্দেহে বাড়িতে লাল পতাকা অমানবিক, অনৈতিক'

জানুয়ারির মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বুস্টার ডোজ দেবে যুক্তরাজ্য

জানুয়ারির মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বুস্টার ডোজ দেবে যুক্তরাজ্য

২৪ দিনে কোটি টাকা নিয়ে উধাও

২৪ দিনে কোটি টাকা নিয়ে উধাও

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune