X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

উপাচার্যরা ঘেরাও হন কেন?

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৬:১৪

জহিরুল হক মজুমদার জবাবদিহিতা নেই, এমন পদ কখনও সম্মানের হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটির জবাবদিহিতা কার কাছে? এই প্রশ্নের উত্তর প্রায় দেড়যুগের কাছাকাছি শিক্ষকতা করার পরও আমি জানি না। আমার সহকর্মীরাও জানেন না। অর্থাৎ উপাচার্য কোন অসদাচরণ কিংবা অসৎ কর্ম করলে কিংবা কোন দাফতরিক কাজে অযাচিত সময়ক্ষেপণ কিংবা অবহেলা করলে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কার কাছে অভিযোগ করবেন কিংবা উপাচার্য কার কাছে জবাবদিহি করবেন, তা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে লেখা নেই।
এমনকি উপাচার্যের কারণে যদি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার প্রতিকার কিভাবে হবে—তাও বলা নেই। এছাড়া বাকি আর সব বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলো তাদের বিশেষ আইন দ্বারা পরিচালিত হয়, তাদের আইনেও এই বিষয়গুলো লেখা আছে বলে জানা নেই। কেউ কেউ বলবেন, উপাচার্য সিন্ডিকেট, রিজেন্ট বোর্ড কিংবা সিনেটের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। কিন্তু এই সমস্ত পরিষদ অন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা ছাত্রকে আইন অনুযায়ী শাস্তি  দেওয়ার ক্ষমতা রাখলেও উপাচার্যের শাস্তিবিধান কিংবা সতর্ক করার বিধান আইনে নেই। এ রকম জবাবদিহিতাহীন পদ রাষ্ট্রের আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না।
১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশের অধীন চারটি কথিত স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত সিনেটের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত তিনজন নাগরিকের মধ্য থেকে যেকোনও একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। উপাচার্যকে একজন শিক্ষক হতে হবে, এমন কোনও কথা আইনে বলা নেই এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সর্বনিম্ন সীমা বলা নেই। ব্রিটিশ আমলে খাজা নাজিম উদ্দিনের ছোট ভাই খাজা শাহাবুদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ছিলেন। উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে তিনি কিছুদিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ছিলেন। কথিত আছে যে খাজা শাহাবুদ্দিন ইংরেজি মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি পাস ছিলেন। অর্থাৎ একজন নন মেট্রিক। স্বাধীনতা উত্তরকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল যিনি মূলত কলেজ শিক্ষক ছিলেন। সুতরাং আজকাল যারা উপাচার্য তারা পাস কোর্সে ডিগ্রি পাস এম এ প্রিলিমিনারির ছাত্র কিংবা কোনও কোনও উপাচার্যের পিএইচডি ডিগ্রি নেই এইসব কথা বলেন তারা বোধ হয় খাজা শাহাবুদ্দিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে অবগত নন।
বলে রাখা ভালো যে, ১৯৭৩ এর রাষ্ট্রপতির আদেশ একটি নয়, প্রত্যেকটি (চারটি’র) জন্য আলাদা আলাদা এবং কিছু সামান্য ব্যতিক্রম আছে। যেমন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও ট্রেজারার পদ নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে আছে কোনও শিক্ষক বা কর্মকর্তা যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনও সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন তাহলে তিনি উপাচার্যের মাধ্যমেই মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করে প্রতিকার চাইবেন।
এখন উপাচার্য যদি এই আবেদন ফরোয়ার্ড না করেন, তাহলে রাষ্ট্রপতির কাছে সরাসরি আবেদনের বিধানও আইনে রাখা হয়নি। আদালতের শরণাপন্ন হলেও  আদালত অনেক সময়  রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনের সুযোগটি ব্যবহার করেছেন কি না জানতে চান এবং সেটি শেষ করে আদালতে আসার পরামর্শ দেন। যে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট ছাড়াই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে  রাষ্ট্রপতি সরাসরি উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে থাকেন, সে সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি চাইলেই অদক্ষতা, অসততা কিংবা যেকোনও অসদাচরণের কারণে উপাচার্যকে অপসারণ করতে পারেন। কিন্তু ১৯৭৩ আদেশভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সরাসরি অপসারণের আগে অসম্ভব ভাবা হলেও ‘জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট’ নামে একটি আইনের অধীনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিনকে অপসারণের ভেতর দিয়ে  তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এবং চ্যান্সেলর তার আইনি কর্তৃত্বের নেতিবাচক এবং প্রশ্নবোধক প্রমাণ রেখেছেন। সে সময়ের চ্যান্সেলর এই উপাচার্যকে অপসারণের কাজটি করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে খুশী করার জন্য, যারা তাঁর অযৌক্তিক পদত্যাগ চেয়ে দিনের পর দিন তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল। কিন্তু ১৯৭৩ এর রাষ্ট্রপতির আদেশ  কিংবা বর্তমানে প্রচলিত বিবিধ আইনে উপাচার্যের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শিক্ষক,  কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা ছাত্রদের কোনও কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ না থাকায় উপাচার্যরা প্রায়ই ক্ষুব্ধ ছাত্র শিক্ষক কিংবা কর্মচারী দ্বারা ঘেরাও হয়ে যান। এর মাধ্যমে তারা সরকার এবং চ্যান্সেলরকে উপাচার্যের অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জানান দিতে চান।
সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ঘেরাওয়ের  মতো অস্থির পরিস্থিতি এড়িয়ে শিক্ষার শান্তিময় পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন সংশোধন করে ‘গুরুতর অসদাচরণ কিংবা কর্তব্য অবহেলা’র ক্ষেত্রে ছাত্র শিক্ষক কিংবা কর্মচারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ‘ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে উপাচার্যেকে ইমপিচমেন্ট  করার  বিধি  সংযোজন করা উচিত বলে মনে করি।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জোর করে গরু নামাতে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেফতার ৩
জোর করে গরু নামাতে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেফতার ৩
পর্দা নামলো উইমেন্স লেন্স আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের
পর্দা নামলো উইমেন্স লেন্স আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের
সীতাকুণ্ডে আগুন: তদন্তে একমাস লাগার কারণ
সীতাকুণ্ডে আগুন: তদন্তে একমাস লাগার কারণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে বিবাদে নিহত ১
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে বিবাদে নিহত ১
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ