X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বীর বাঙালির অহংকার

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬:০৫

সালেক উদ্দিন ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এমন ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। মাতৃভাষা বাংলাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের অগ্রজরা আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন। যার সূত্র ধরে এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে লিখতে হলে লিখতে হয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। লিখতে হয় একুশে ফেব্রুয়ারি যে বাঙালির এক গৌরবোজ্জ্বল দিন, যা শহীদ দিবস হিসেবে এই দেশে ১৯৫২ সালের পর থেকে পালিত হয়ে আসছে সেই কথা। 

ভারত বিভাজন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরপরই ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার দাবি উঠতে থাকে। কারণ, পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পর থেকেই উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাঁয়তারা চলছিল। যা এ দেশের মানুষ মেনে নিতে পারছিলেন না।

ভারত বিভাজন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরপরই ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার দাবি উঠতে থাকে। কারণ, পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পর থেকেই  উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাঁয়তারা চলছিল। যা এ দেশের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের) রাজনীতিবিদ ও ছাত্র সমাজ  মেনে নিতে পারেননি। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে উর্দুতে রাষ্ট্রের কার্যক্রম পরিচালিত হলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি রাজনীতিকরা এর প্রতিবাদ করেন এবং বাংলা ভাষাকেও অধিবেশনের ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। দাবি আমলে না নিয়ে আরবি হরফে বাংলা ভাষা লেখার প্রস্তাব আসে। তখন বাংলা ভাষাভাষী রাজনীতিকরা এর প্রতিবাদ করেন। গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।

আরও পরে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি  প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। সেই প্রেক্ষিতে বাংলা ভাষা আন্দোলন দুর্বার রূপ ধারণ করে। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ সভা ও ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জারি করে ১৪৪ ধারা। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ বেলা ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে ছাত্রদের ডাকা সভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র জনতার মিছিল বের হয়। মিছিলে পাকিস্তান সরকারের পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে শহীদ হন আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, আব্দুস সালাম, রফিক শফিউলসহ অনেক ছাত্র।

এ ঘটনার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের পাশাপাশি ঢাকার বাঙালি জনতা রাজপথে নামে। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে ভাষা শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ, যা ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ভেঙে ফেলে। ছাত্র জনতার মিছিলে গুলি চালিয়ে, স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার দাবিকে নিষ্পেষিত করা যায়নি বরং আরও বেগবান হয়েছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন। ১৯৫৩ অস্থায়ী শহীদ মিনারের স্থলে নির্মিত হয়েছিল নতুন শহীদ মিনার। অব্যাহত থাকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সে এক দুর্বার  আন্দোলন। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল এবং একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটি পালিত হয়ে আসছিল মহান শহীদ দিবস হিসেবে।

এই হলো সংক্ষেপে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। এই ইতিহাসের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সৈনিক ছিলেন বাংলাদেশের বাঙালি রাজনীতিক-ছাত্র-জনতা। এই ইতিহাসকে বিশ্ববাসীর কাছে ‌আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মোড়কে চিরজীবী করে রাখার লক্ষ্যে যারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারাও ছিলেন এই বাংলাদেশেরই প্রবাসী বাঙালি। সে ইতিহাস অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের বেশ পরে ১৯৯৮ সালে কানাডায় বসবাসরত বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের কাছে আবেদন করেন। মহাসচিবের তথ্যকর্মী আরেক বাঙালি হাসান ফেরদৌস এ ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কৌশল জানিয়ে দিয়ে সাহায্য করেন। সে অনুযায়ী তারা বিভিন্ন ভাষাভাষী দেশের সদস্যদের নিয়ে ‘এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি সংগঠন করেন। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন এবং সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সমর্থনে জানাতে শুরু করে। ১৯৯৯ সালে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে এই প্রস্তাবের পক্ষে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানায়। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

এই হলো অতি সংক্ষেপে ভাষা আন্দোলন-শহীদ দিবস-আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রোডম্যাপ।

লেখাটির শুরুতেই লিখেছিলাম, ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এমন ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল হলেও বাংলাদেশের বাঙালিরা তা করে দেখিয়েছেন। শুধু তা-ই নয় এরপরও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখার জন্য বাংলাদেশের বাঙালিরাই উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং সফলকাম হয়েছেন। এটি দেশপ্রেমের এক অনন্য ইতিহাস। দেশপ্রেমের ইতিহাসের মানদণ্ডে আমাদের অগ্রজদের অবদান কখনোই ভোলার নয়। তারপরও অবস্থাদৃষ্টে এখন মনে হয় আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত থেকে কিছুটা মুখ ফিরিয়ে রেখেছি। আমাদের পূর্বপুরুষরা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন, মাতৃভূমি স্বাধীন করার জন্য জীবন দিয়েছেন, অন্যায় অবিচারের কাছে কখনোই মাথা নত করেননি।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের লগ্নে আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে, আমরা তাদের পদাঙ্ক যথাযথ অনুসরণ করছি কিনা!

লেখক: কথাসাহিত্যিক                                   

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গভীর রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত ৭
গভীর রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত ৭
পাঁচ বেসামরিককে হত্যা করেছে রুশ বাহিনী: ডোনেস্কের গভর্নর
পাঁচ বেসামরিককে হত্যা করেছে রুশ বাহিনী: ডোনেস্কের গভর্নর
বায়তুল মোকাররমে ঈদুল আজহার জামাতের সময়সূচি
বায়তুল মোকাররমে ঈদুল আজহার জামাতের সময়সূচি
যুক্তরাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা
যুক্তরাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ