X
শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২২
২২ আশ্বিন ১৪২৯

‘নাসিরের বিয়ে জটিলতা’ দারুণ বিক্রয়যোগ্য পণ্য

ডা. জাহেদ উর রহমান
০২ মার্চ ২০২১, ১৬:২৮আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ১৬:২৮

ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রিন্সেস ডায়না নিছক একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, নাকি তাকে পরিকল্পিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সেই মর্মান্তিক ঘটনার কিছু দিন পরে ডায়নার সেই সময়কার প্রেমিক দোদি আল ফায়েদের বাবা মোহাম্মদ আল ফায়েদ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছিলেন, রাজপরিবারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম আই সিক্সটিন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

সে সময়ের পৃথিবীকে ভয়ংকরভাবে নাড়া দিয়ে যাওয়া এই দুর্ঘটনাটির রহস্য ভেদ কখনও হবে কিনা, জানি না। সেটা এই কলামের আলোচনার চৌহদ্দির মধ্যে না। আমি ঘটনাটি আনলাম সেই দুর্ঘটনায় খুব আলোচিত একটা চরিত্র পাপারাজ্জির কথা বলতে। পাপারাজ্জিকে এড়ানোর জন্য লুকিয়ে হোটেল থেকে বেরোনো, অতি দ্রুত গাড়িতে চড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা, এবং সর্বশেষ পাপারাজ্জির পিছু ধাওয়া থেকে বাঁচার জন্য বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো– এ সবকিছু জড়িয়ে গেছে এই দুর্ঘটনার সাথে। এ ঘটনাটির কথা মনে পড়লো সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বা ঘটতে থাকা আরেকটা বিষয় নিয়ে। এ প্রসঙ্গে ফিরে আসছি একটু পরে।

এই লেখায় ক্রিকেটার নাসির একটা বাহানা। তাকে বাহানা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ তার বিয়ে এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ অনেক ‌নেটিজেনের মধ্যে অবিশ্বাস্য রকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই মুহূর্তে এটা নিয়ে যা ঘটেছে, তাতে এক্ষেত্রে প্রচলিত ভাইরাল শব্দটিও অপর্যাপ্ত বলে মনে হয়।

নাসিরের বিয়ের সংবাদ দেশের মূল ধারার এবং সামাজিক মিডিয়ায় মনোযোগ পেয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু বিবাহ পরবর্তী কিছু ঘটনা নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এখনও হচ্ছে, সেটা বিয়ের সংবাদকে ছাড়িয়ে গেছে বহু, বহুগুণে। কী কী ঘটেছে তারপর, সেটা আমরা জানি সবাই আর ওইসব ঘটনার বিস্তারিত বিষয় কিংবা নাসিরের বিয়ে বৈধ নাকি অবৈধ, এতে কার দায় কতটা সেস‌ব এই কলামের আলোচনার বিষয় নয়।

বিয়ে পরবর্তী যে ঘটনা নাসিরের জীবনে ঘটছে, সেটা নিয়ে স্বয়ং নাসির, তার স্ত্রী এবং আমরা অনেক সচেতন মানুষ বিরক্তিবোধ করছি। নৈতিকভাবে আমরা ঠিকই আছি, মানুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘটা কোনও কিছু, এমনকি সেটা যদি অবৈধও হয়, সেটা ঘরোয়াভাবে কিংবা আইনগতভাবে তাদেরই মিটিয়ে নেওয়া উচিত। সবকিছু ছেড়েছুড়ে আমাদের সেটা নিয়ে অতি ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠা বাড়াবাড়ি।

এ ঘটনায় কেউ কেউ উষ্মা প্রকাশ করছেন এই বলে, ফেসবুকে মানুষজনের রিঅ্যাকশন দেখে মনে হয়, এই দেশে নাসিরের বিয়ে ছাড়া এখন আর কোনও সংকট নেই। সর্বশেষ ঢাকাই ছবির একজন চিত্রনায়িকা ফেসবুকে এসে নাসিরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার বিরুদ্ধে খুব শক্তভাবে কথা বলেছেন।

এমন ঘটনা শুধু নাসির‌ই না, একাধিক ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেও ঘটেছে, যা নিয়ে আমরা ভীষণ মাতামাতিও করেছি। একই রকম ঘটনা ঘটেছে সংগীত, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও। সেসব ক্ষেত্রেও মনে হতেই পারে, ওসব ভীষণ ব্যক্তিগত বিষয়, যা নিয়ে মাতামাতি করা উচিত না।
এটা সত্য, এসব আলোচনা করার মাধ্যমে সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবনে আমরা যে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করছি সেটা অবৈধ, অনৈতিক। এটা সভ্য জাতি হিসেবে আমরা খুব বেশি নৈতিকতার ধার ধারি না, কিন্তু আমাদের চাইতে নৈতিকতার মানে অনেক উঁচুতে থাকা জাতিরা কী করছে সেলিব্রেটিদের নিয়ে?

খুব সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দেই। বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যতম সদস্য চার্লস-ডায়নার ছোট সন্তান প্রিন্স হ্যারি তার স্ত্রী মেগানকে নিয়ে স্থায়ীভাবে আমেরিকা চলে গেছেন। কয়েকদিন আগে তিনি জানান, ব্রিটেন ছাড়ার বড় কারণ তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্রিটিশ মিডিয়ার বাড়াবাড়ি।

ফিরে আসা যাক কলামের শুরুর বিষয়টিতে। সম্ভবত প্রিন্সেস ডায়নার মৃত্যুর পর‌ই পাপারাজ্জি শব্দটি ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের মানুষের সামনে আছে। পাপারাজ্জি একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, যার কাজ হচ্ছে সেলিব্রেটিদের সবসময় খুবই অ্যাগ্রেসিভলি অনুসরণ করে গোপনে তাদের ছবি তোলা। কত বড় সেলিব্রেটি এবং কতটা ব্যক্তিগত/ বিতর্কিত/ স্ক্যান্ডালাস ছবি তোলা গেলো সেটার ওপর ভিত্তি করে এই ছবি বেশ চড়া দামে বিক্রি হয় মূল ধারার মিডিয়ায়। বলা বাহুল্য, এদের কর্মকাণ্ড নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতেও চরম বিতর্ক আছে। অনেক সেলিব্রেটি পাপারাজ্জিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ফল হয়নি খুব বেশি।

পশ্চিমে পাপারাজ্জিদের কর্মকাণ্ড দেখে এই দেশের যেকোনও বড় সেলিব্রেটি নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতেই পারেন– অন্তত এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এ ধরনের কিছুর দেখা মেলেনি। তবে পৃথিবীর পরিস্থিতি এটাও নিশ্চিতভাবে বলে দেয় বাংলাদেশের সেলিব্রেটিদের এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না– অচিরেই পাপারাজ্জিদের বিচরণের উর্বর ভূমি হয়ে উঠবে বাংলাদেশ‌‌ও।

সেলিব্রেটিদের নিয়ে এই প্রবণতার কারণ অনুসন্ধানের আগে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে কারা সেলিব্রেটি হয়ে ওঠেন? এটা হয়ে উঠতে পারেন যে কেউ, যদি বাজার সেটা চায় এবং বাজার সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে শ্রম-সময়-অর্থ বিনিয়োগ করে। এটা স্রেফ বাজারের সিদ্ধান্ত বলেই এই মাটিতে জন্মগ্রহণকারী একজন অতি বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এই দেশে সেলিব্রেটি হয়ে ওঠেন না; হয়ে ওঠেন আরও অনেকে, যাদের কাজকে আমাদের অনেকের কাছেই হয়তো আদৌ উঁচুমানের কিছু বলে মনে হয় না। এমনকি কারও কারও কাজ আমাদের অনেকের কাছেই হাস্যকর।

বাজার একজন সেলিব্রেটি তৈরি করে এবং সেই সেলিব্রেটিকে দিয়ে বাজার তার পণ্য বিক্রি করায়। ‌এজন্যই আমরা দেখবো সারা পৃথিবীতে একজন খেলোয়াড়, সংগীতশিল্পী অভিনেতা-অভিনেত্রী বা অন্য কোনও ক্ষেত্রের সেলিব্রেটি মূল পেশা থেকে উপার্জন করেন আর দশটা সাধারণ পেশার চাইতে অনেক অনেক বেশি। এখানেই শেষ নয়, বেশিরভাগ সেলিব্রেটি তার মূল পেশা থেকে যত আয় করেন, নানা পণ্যের দূতিয়ালি বা বিজ্ঞাপন থেকে আয় করেন তার চাইতে ঢের বেশি। ‌এই পণ্য বিক্রি তত বেশি হবে, যত বেশি সেই সেলিব্রেটির জন্য আমাদের ‘হুজুগ’ থাকবে। সুতরাং বাজার পরিকল্পিতভাবে এই হুজুগগুলো তৈরি করে।

একজন সেলিব্রেটি এই হুজুগের সুবিধা ষোলআনা বুঝে নেন। অনেক বড় উপার্জন হয় তাদের। সামাজিক মর্যাদা প্রতিপত্তিও হয়। সেই উপার্জনে কারও কোনও আপত্তি তো নেই-ই; বরং সেটাকে কীভাবে ম্যাক্সিমাইজ করা যায় সেই চেষ্টা করেন সব সময়।

যেহেতু সেলিব্রেটিদের প্রতি মানুষের ‘হুজুগ’ তৈরির চেষ্টা থাকে সব সময়, তার এক ‘সাইড ইফেক্ট’ হিসাবে এটাও অবধারিত যে, মানুষ সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশ করতে চাইবে। মাত্রাগত পার্থক্য আছে কিন্তু অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে কিংবা দেখতে সবারই আগ্রহ থাকে। সবক্ষেত্রেই যখন এটা কাজ করে, তখন যাদের প্রতি তার ‘হুজুগ’ আছে, সেই সেলিব্রেটিদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা কাজ করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ঠিক সেটাই ঘটে এক্ষেত্রে। যে ‘হুজুগ’ একজন মানুষকে সেলিব্রেটি বানায় সেই ‘হুজুগেরই’ ‘সাইড ইফেক্ট’ এটা।

আমাদের সব সময় স্মরণ রাখা উচিত কোনও একটি সিস্টেম বেছে নেওয়া মানে সেই সিস্টেমের সুবিধা-অসুবিধা সবকিছুই গ্রহণ করা। মুড়ি-মুড়কির মতো অতি সাধারণ যেসব ওষুধ আমরা খাই নিয়মিত, সেগুলোরও ‘সাইড ইফেক্ট’ আছে। সেটা গ্রহণ করেই আমাদের ওষুধ খেতে হয়। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা সিস্টেমের সুবিধা আনন্দ নিয়ে উপভোগ করি, কিন্তু সেটার সমস্যা বা সাইড এফেক্ট গ্রহণ করি না। গ্রহণ করা দূরেই থাকুক, আমরা মেনেও নিতে চাই না।

অনেক বিষয়ে ঠিক কী হওয়া উচিত, আর কী হয়, তার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকে। সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যা ঘটে সেটা হওয়া উচিত নয়, উচিত প্রত্যেকে প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে শ্রদ্ধা করবে। কিন্তু এটা ঘটার কোনও কারণ অন্তত বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নেই। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের দেশেও প্রচলিত আছে ভীষণভাবে। তাই আমরা যদি এই সিস্টেমটা ন্যূনতম পরিমাণও বুঝে থাকি তাহলে এসব ঘটনাকে অবধারিত মনে করাই শ্রেয়। নাসিরের নিয়ে জটিলতা এই বাজারে অসাধারণ বিক্রয়যোগ্য পণ্য, তাই এটা বিক্রি হবেই। নাসিরের স্ত্রীর আগের শিশুকন্যার বক্তব্য নিয়ে দেশের মূল ধারার মিডিয়ায় খবর হওয়া আমাদের অনেকের কাছে বীভৎস লাগলেও এটাই হওয়ার কথা।

পাদটিকা: নাসিরের বিয়ে সংকটে অনৈতিকতা এবং বেআইনি আচরণের অভিযোগ উঠেছে যেহেতু একজন নারীর বিরুদ্ধে, তাই আমাদের নারীবিদ্বেষী সমাজ তাতে মজা পাচ্ছে অনেক বেশি। ঠিক একই সমস্যা নাসিরের দিক থেকে হলে নাসিরের সমালোচনা কম হতো অনেক, বরং আমরা তখনও তার স্ত্রীরই পিণ্ডি চটকাতাম অন্যের স্বামী ‘ভাগিয়ে নিয়ে’ বিয়ে করেছে বলে।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
নিজ দলের বিরুদ্ধে এমপি আফসানার সংবাদ সম্মেলন
নিজ দলের বিরুদ্ধে এমপি আফসানার সংবাদ সম্মেলন
বাংলাদেশ ন্যাপে যোগ দিলেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা
বাংলাদেশ ন্যাপে যোগ দিলেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা
পদ্মা সেতু দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন রাষ্ট্রপতি
পদ্মা সেতু দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন রাষ্ট্রপতি
হেলাল হাফিজের জন্মদিনে আনন্দসন্ধ্যা
হেলাল হাফিজের জন্মদিনে আনন্দসন্ধ্যা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ