X
রবিবার, ২৬ জুন ২০২২
১২ আষাঢ় ১৪২৯

ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত ও আমাদের দায়

আপডেট : ৩০ জুন ২০২১, ১৮:০৮

মো. জাকির হোসেন আমাদের আগের প্রজন্মের শত শত মানুষকে দেখেছি তারা জীবনে কখনও বাসে কিংবা ট্রেনে ভ্রমণ করেননি। আর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষেরই প্লেনে চড়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু যে বাহনটিতে বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষেরই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা হলো রিকশা, ভ্যান ও হাল জামানার ইজি বাইক। রিকশা, ভ্যান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য বাহন। হরতাল, ধর্মঘট, লকডাউন, শাটডাউন, আর অতি বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় রিকশা, ভ্যানের কী যে কদর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রিকশা ভ্যান কেবল একটি বাহনই নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। লোকশিল্পের বিভিন্ন বিপণি বিতানে রিকশা, ভ্যান শোপিস হিসেবে বিক্রি হয়। মানুষ ঘরে এসব সাজিয়ে রাখে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে পরিবহনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে রিকশা ও ভ্যান গাড়িতেও। ব্যাটারি ও মোটর সংযোজন করা হয়েছে রিকশা ও ভ্যানে।

অতি সম্প্রতি হুট করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিনই বুলডোজার আর হাতুড়ি দিয়ে রিকশা, ভ্যান ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কেন এই ধ্বংসযজ্ঞ? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘রিকশার সামনের চাকায় ব্রেক আছে। পেছনের চাকায় ব্রেক নেই কিংবা ব্রেকের ব্যবস্থা থাকলেও তা অপ্রতুল। এগুলো যখন ব্রেক করে প্যাসেঞ্জারসহ গাড়ি উল্টে যায়। রিকশায় ইঞ্জিন লাগিয়ে চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া হাইওয়েতেও এসব রিকশা চলে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, ১৩ হাজার মোটরচালিত রিকশা, ভ্যান ধ্বংস করা হয়েছে। রিকশাসদৃশ ব্যাটারিচালিত আরেক ধরনের বাহনের নাম ‘ইজি বাইক’। ক্রমান্বয়ে ইজি বাইকও বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

মোটর চালিত রিকশায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, ঘটছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটিই যদি একমাত্র কারণ হয় তাহলে বেশ কিছু প্রশ্ন এসে যায়।

হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা তো একদিনে রাস্তায় নামেনি। কয়েক বছর ধরে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরুতে কেন নিয়ন্ত্রণ করলাম না, বন্ধ করলাম না? বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক মালিক এনজিও থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা লোন নিয়ে ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান ও প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা লোন করে ইজিবাইক কিনেছেন। এখন এটা ধ্বংস করা হলে এনজিওর ঋণের টাকা ফেরত দেবে কে? কীভাবে?

রিকশা-ভ্যান-ইজি বাইক ধ্বংসের ফলে এই খাতে বিনিয়োগকৃত বিশাল অংকের অর্থের যে অপচয় হলো তার দায় কে নেবে? রিকশা-ভ্যান-ইজি বাইক কেবল মানুষ বা পণ্য পরিবহনের বাহন নয়, এটি জীবনেরও বাহন। এর সাথে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবাধিকার। একটি পরিসংখ্যান মতে, ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের আয়ের সঙ্গে ৫০ লাখ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। হুট করে এসব বাহন বন্ধ করলে যে বিশাল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে তাতে অনেকের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। করোনাকালে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। বারবার লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত নানা পেশার শ্রমিক, চাকরি থেকে ছাঁটাই হওয়া, প্রবাস থেকে ফেরত আসা এবং কর্মহীন অনেকে রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকে কিনে কোনও মতে জীবনযাপন করছেন। সরকার নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন দরিদ্র ও চাকরি হারানো এসব মানুষদের দিকে। করোনা মানুষের শ্বাসযন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনীতির হৃদপিণ্ডকেও অচল করে দিয়েছে। এমন এক ভয়ংকর সময়ে হুট করে ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত কতটা মানবিক ও বিবেচনাপ্রসূত? বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া রিকশা-ভ্যান ধ্বংস করা তো জীবিকা ধ্বংস করার শামিল। জীবিকার উপায় ধ্বংস হলে জীবনের কী হবে? জঠর জ্বালা বড় জ্বালা।

জীবিকার তাগিদে মানুষগুলো যদি অপরাধে জড়ায় তা কি রাষ্ট্রের জন্য কম হুমকি হবে? ব্যাটারি চালিত রিকশায় আগের তুলনায় দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। আগে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনার খবর শোনা যেত। এখন খুব কমই দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়। দুর্ঘটনাই যদি কোনও যানবাহন নিষিদ্ধের কারণ হয় তা হলো তো বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরবাইক এসবও বন্ধ করতে হবে। কারণ, ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের চেয়ে এসব যানবাহনের দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি। আর এসব দুর্ঘটনা প্রায়শই প্রাণঘাতী। রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের চাহিদা না থাকলে এগুলো আপনা আপনিই বন্ধ-বিলুপ্ত হয়ে যেত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল প্রলম্বিত হয়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে তাপমাত্রা ও অসহনীয় গরম। এ অবস্থায় প্যাডেলচালিত রিকশা চালকের পক্ষে ২/৩ জনকে বহন করা খুবই কষ্টসাধ্য ও অমানবিক। এটি এক ধরনের শ্রমদাসত্বও বটে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে এই দাসত্বকে আমরা কীভাবে মেনে নিতে পারি? এক সময় মানুষের কাঁধে চড়ে পালকিতে করে বিত্তবানরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। তারপর টানা রিকশার প্রচলন হলো। একশ্রেণির মানুষ আরোহী হয়ে রিকশায় বসে থাকবে, আর আরেক শ্রেণির মানুষ ভারবাহী পশুর মতো তা টেনে নিয়ে যাবে। এই অমানবিকতা দূরে ঠেলে চালু হলো প্যাডেল চালিত রিকশা। প্যাডেল চালিত রিকশা চালাতে অনাহার-অর্ধাহার-অপুষ্টিতে ভোগা চালককে যে পরিমাণ শারীরিক কষ্ট করতে হয় তা বিজ্ঞানের এই যুগে মানবিক বলে বিবেচিত হওয়া উচিত কি?

অন্যদিকে, আমাদের দেশে বাতাসে অতি আর্দ্রতার কারণে অসহনীয় গরমে জনসাধারণের জন্য পায়ে হেঁটে ১/২ কিলোমিটার চলাচলও সহজসাধ্য নয়। আবার অল্প দূরত্বে সিএনজি চালিত অটোরিকশার ভাড়া বহন করাও অনেকের পক্ষে কষ্টকর। যত স্বল্প দূরত্বই হোক এখন সিএনজি চালিত অটোরিকশার ন্যূনতম ভাড়া ১০০ টাকা। ফলে সাশ্রয়ী বিকল্প বাহন হিসেবে বাড়ছে রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের চাহিদা। রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের বিকল্প বাহন ব্যবস্থা না করে এসব নিষিদ্ধ/ধ্বংস করা হলে ব্যাপক চাপ পড়বে সিএনজি অটোরিকশার ওপর। এই সুযোগে কয়েকগুণ ভাড়া বাড়িয়ে দেবে সিএনজি অটোরিকশা চালকরা। যাতায়াতে বিপদ ও ভোগান্তি বাড়বে সাধারণ মানুষের। ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ এর গতি, চিকন টায়ার ও অপ্রতুল ব্রেক। কম শক্তির মোটর ব্যবহার করে গতি হ্রাস করা যেতে পারে। ইজি বাইকের মতো মোটা টায়ার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। অপ্রতুল ব্রেকের সমস্যা নিশ্চয়ই কারিগরিভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে। হাইওয়েতে ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকের চলাচল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এই আইন লঙ্ঘন করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজনীয় হলেও এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অতি জরুরি। প্রতিদিন বাড়ছে এর সংখ্যা। কৃষি শ্রমিকদের অনেকেই কৃষিকাজ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যানের চালক হয়ে যাচ্ছেন। ফলে কৃষি কাজে মারাত্মক শ্রমিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, শহরে ব্যাপক হারে ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান বৃদ্ধি পাওয়ায় অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি শহরে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।

বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করে কিংবা ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান চালকদের পেশা পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ না দিয়ে হুট করে ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান ধ্বংস বা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বিবেচনাপ্রসূত নয়। সরকার যেখানে সবার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা বিধানের চেষ্টা করছেন সেখানে জীবন ও জীবিকার বাহন ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত অর্ধকোটি মানুষকে তাদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। বঞ্চিত মানুষরা জীবন বাঁচাতে বেপরোয়া হয়ে অপরাধে জড়ালে তা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য সুখকর হবে না। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, A hungry man is an angry man। ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান নিষিদ্ধ যদি করতেই হয় তাহলে সবার আগে যেসব কারখানায় এসব তৈরি হয় কিংবা যদি যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয় তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, দরিদ্র মানুষগুলো ঋণ নিয়ে নিজেদের চেষ্টায় মৌলিক চাহিদা পূরণের তথা কোনোমতে বেঁচে থাকার যে ব্যবস্থা তারা করেছিল, তাদের সেই বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা ও জীবিকা ধ্বংসের জন্য আমরা দায়ী হবো।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসেওয়েতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসেওয়েতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা
সেতু চালুর প্রথম দিনেই কমে গেছে লঞ্চযাত্রী
সেতু চালুর প্রথম দিনেই কমে গেছে লঞ্চযাত্রী
বাংলাদেশকে অনেক ভুগিয়ে থামলেন মায়ার্স
বাংলাদেশকে অনেক ভুগিয়ে থামলেন মায়ার্স
হ্যাকিংয়ের শিকার অ্যাপল ও অ্যান্ড্রয়েড ফোন
হ্যাকিংয়ের শিকার অ্যাপল ও অ্যান্ড্রয়েড ফোন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ