X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

করোনাকালে জীবন, জীবিকা এবং লকডাউন দ্বন্দ্ব

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ১৬:২১

ড. প্রণব কুমার পান্ডে এই লেখাটি যখন লিখছি তখন দেশে কোভিড-১৯-এর দৈনিক সংক্রমণের হার প্রায় ২৫% এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ অতিক্রম করেছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে, দেশে সংক্রমিত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ভারতীয় সীমান্তের আশপাশের কয়েকটি জেলায় ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি বিপর্যয়ের আকার ধারণ করেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে, আমরা প্রতিদিনের কোভিড-১৯ রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যার রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করছি। স্বাস্থ্য বিভাগ যদি করোনার লক্ষণযুক্ত রোগীদের মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনা করে পরিসংখ্যান প্রস্তুত করে তবে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে।

ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির কারণে সীমান্তবর্তী বেশ কয়েকটি জেলার প্রশাসন স্থানীয়ভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়। তবে প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে নাগরিকদের অনিচ্ছার কারণে এবং কিছু ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর লকডাউন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার অভাবের কারণে সংক্রমণের হার প্রত্যাশিত পর্যায়ে কমেনি। ফলস্বরূপ, সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ১ জুলাই থেকে সাত দিনের জন্য দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশব্যাপী লকডাউন কার্যকর করতে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কথা বলে একশ্রেণির মানুষ সরকারের সমালোচনায় ব্যস্ত রয়েছে। এমনকি, বিভিন্ন গণমাধ্যম দাবি করেছে যে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনেক মানুষ শহর থেকে (মূলত ঢাকা থেকে) গ্রামে ফিরেছে। এর ফলে, দেশব্যাপী ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও ব্যাপকভাবে।  তবে, আমরা যদি পরিস্থিতিকে সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি তাহলে বুঝতে পারবো যে  সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারকে বেশ কিছু বাধ্যবাধকতায় কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে ৩০ জুন তারিখে ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত তাদের অর্ধবার্ষিক সমাপনীকরণ সম্পন্ন করে। তাছাড়া, সরকারি ও বেসরকারি সব সংস্থার কর্মীরা প্রতি মাসের শেষে বেতন পান। ৩০  জুন সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট পাস হওয়ার কথা থাকে। এমনকি সরকারকে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী-যারা দিন আনে দিন খায়- তাদের দুর্দশার কথাও বিবেচনা করতে হয়। কারণ, কাজ না করলে এই শ্রেণির মানুষ লকডাউনের সময় জীবিকা নির্বাহ করবে কীভাবে? ফলে, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গের বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন কার্যকর করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা দেরি হওয়ার জন্য সরকারকে দোষারোপ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন সরকারের বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নের পরেও কেন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকলো না? এখানে উল্লেখ্য যে সরকার গত দুই মাস ধরে ভারতের সঙ্গে সব সীমান্ত বন্ধ রেখেছে। এমনকি সরকার সকল প্রকার গণপরিবহন, জনসমাবেশ এবং সাধারণ জনগণের যাতায়াত সীমাবদ্ধ করেছিল। সরকারের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, জনগণের একটি বিশাল অংশের মাস্ক ব্যবহার, ঘন ঘন হাত ধোয়ার অনুশীলন এবং ভিড়ের এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে অনীহার জন্য আমরা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সংক্রমণের হার হ্রাস করতে করতে ব্যর্থ হয়েছি।

জনসংখ্যার এই অংশ সংক্রমণকে ভয় পায় না। কারণ, তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে কোভিড-১৯ তাদের সংক্রমিত করতে পারবে না। তাছাড়া, রিকশাচালক, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক এবং নির্মাণ শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশার জনগণ যারা দিন আনে দিন খায় তাদের জীবিকার জন্য বাইরে বের হতেই হয়। কারণ, যদি তারা একদিন কাজ না করে তবে পরের দিন কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে সেই চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। অতএব, এই শ্রেণির জনগণ কোভিড-১৯ এর সুরক্ষাবিধি অনুসরণ না করেই ঘর থেকে কাজের সন্ধানে বের হতে বাধ্য হয়, যা দূষণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করে।

আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ে দরিদ্রদের সহায়তা প্রদান করার ক্ষেত্রে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। অতিমারি শুরুর পর থেকে তারা দরিদ্র জনগণকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে। সরকার অর্থনীতির গতি সচল রাখতে একটি উপযুক্ত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছে। সর্বোপরি দেশবাসীকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস দেখিয়েছে। ফলে ৫০ লাখের বেশি মানুষ  ইতোমধ্যে ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ গ্রহণ করেছে।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি অবনতির কারণে বিদেশে ভ্যাকসিন রফতানিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় সিরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে তাদের ভ্যাকসিনের চালান প্রেরণে ব্যর্থ হলে দেশে টিকা প্রদান কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে, ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী  অন্যান্য সংস্থা ও দেশের সঙ্গে সরকারের ভ্যাকসিন কূটনীতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাদের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে প্রায় সব ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে হয় চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে অথবা আলোচনা ফলপ্রসূ করেছে। ফলস্বরূপ, সরকার এই বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৫ কোটি জনগণকে টিকা প্রদানের পরিকল্পনা করেছে।

সরকার করোনাকালীন লকডাউনের সময় জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সচেষ্ট হলেও জনগণের বিশাল একটি অংশ অর্থ উপার্জন করতে না পেরে জীবিকা নির্বাহে অসুবিধা বোধ করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লকডাউনের সময় শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশার কথা বিবেচনা করে তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা করা উচিত। তবে নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের মতো দেশের সরকারের পক্ষে লকডাউনের সময় মাসের পর মাস মানুষকে সাহায্য প্রদান করা প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়।

ফলে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে দরিদ্র জনগণের সহায়তার জন্য আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। বিভিন্ন এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান অতিমারির প্রথম পর্যায় থেকে মানুষকে সহায়তা করেছে। একই সময়ে, অনেক বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অতিমারির সময়ে দরিদ্র জনগণকে সহায়তার জন্য ইতিবাচকভাবে এগিয়ে  আসেনি। অভাবী মানুষদের সহায়তা করার জন্য তাদেরও মুক্ত মন নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। অতিমারি চলাকালীন সবকিছুর জন্য সরকারের দায়ী না করে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।

সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার প্রচেষ্টার পাশাপাশি অতিমারি মোকাবিলার জন্য জনসচেতনতা অন্যতম প্রয়োজনীয় কৌশল। দুর্ভাগ্যক্রমে, দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী কোভিড-১৯-এর সুরক্ষা বিধি অনুসরণ করতে যথেষ্ট অনিচ্ছুক। এই মানুষদের অবহেলা তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সম্প্রদায়কে গভীর সংকটে ফেলছে। দেশের গত দুই সপ্তাহের করোনা পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে যে সারাদেশে সব হাসপাতাল রোগীতে ভর্তি হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জীবন বাঁচাতে সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় বিভিন্ন হাসপাতালে অক্সিজেন এবং আইসিইউ বেডের দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সরকারের পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে-এ বিষয়টি আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন।

উপরোক্ত পরিস্থিতিতে, শতাব্দীর সবচেয়ে খারাপ সময়কালে আমাদের সবার সংবেদনশীল আচরণ করা উচিত। আমরা যদি দু'সপ্তাহের জন্য সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে পারি এবং কষ্ট স্বীকার করে হলেও ঘরে থাকতে পারি, তবে সংক্রমণের হার প্রশমিত হতে শুরু করবে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে লকডাউন চলাকালীন বেশিরভাগ মানুষ কষ্টের মুখোমুখি হয়। তবে এ কথাও ঠিক যে জীবিকার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। কারণ, আমরা যদি বেঁচেই না থাকি তাহলে কীভাবে জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জন করবো? সুতরাং, অতিমারি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার, নাগরিক এবং বিভিন্ন সংস্থাসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনও যাদু মানুষকে অতিমারি চলাকালীন জীবন, জীবিকা এবং লকডাউনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারবে না। পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের এই দ্বন্দ্ব নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে এবং সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। তবেই আমরা এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

নতুন রূপে ক্লেমন ড্রিংক
নতুন রূপে ক্লেমন ড্রিংক
গৌতম চক্রবর্তীর প্রয়াণে বিএনপি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত: মির্জা ফখরুল
গৌতম চক্রবর্তীর প্রয়াণে বিএনপি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত: মির্জা ফখরুল
মুশফিক-লিটনের জন্য কষ্ট হচ্ছে মুমিনুলের
মুশফিক-লিটনের জন্য কষ্ট হচ্ছে মুমিনুলের
টাঙ্গাইলে জাপাতে যোগ দিলেন ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীসহ ৪০ জন 
টাঙ্গাইলে জাপাতে যোগ দিলেন ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীসহ ৪০ জন 
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ