X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৫৯

আশিষ বিশ্বাস কাশ্মিরকে ‘স্বাধীন’ করার জন্য অবিলম্বে ভারতবিরোধী সশস্ত্র আক্রমণে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আফগানিস্তানের তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তির লক্ষণ রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই তালেবানের পাশাপাশি পাকিস্তানভিত্তিক নেতাদের কাছ থেকে সাংঘর্ষিক ঘোষণা আসছে। যদিও বেশিরভাগ ভারতীয় বিশ্লেষকরা এটা নিশ্চিত যে জম্মু-কাশ্মিরে একটি বড় ‘জিহাদি উসকানি’ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই বিশ্লেষকদের মধ্যে আরও একটি ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে। সেটি হচ্ছে তালেবান প্রায় বছরখানেক এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। এখনও আফগানিস্তানে বহু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, যেটি শাসক গোষ্ঠী হিসেবে তালেবান এড়িয়ে যেতে পারে না। কেননা, তারা পশ্চিমা দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ভারত এখন পর্যন্ত ভারতীয় কাশ্মিরে তালেবান বা নন-তালেবান যেকোনও গোষ্ঠীর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত। দিল্লিভিত্তিক নীতিনির্ধারকদের এমন আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে কোনও ধরনের চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব পাকিস্তান বা তার প্রক্সিদের জন্য আরও ব্যয়বহুল হবে। এতে তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিষয়টি প্রমাণিত হবে।

ঐতিহাসিকভাবে ভারতের অশান্ত অঞ্চলে নতুন করে সশস্ত্র সংঘর্ষের আশঙ্কা মানে বিরোধী দলগুলোর জন্য খুবই খারাপ খবর। দেশটির ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বর্তমানে একটি পরীক্ষামূলক সময় মোকাবিলা করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে ভারতের অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও রয়েছে।

প্রয়াত জর্জ অরওয়েল পুরনো ইংল্যান্ডের ওপর এক নিবন্ধে বলেছিলেন, জাতীয় সংকটের সময় পুরো দেশ তার সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ১৯৬২, ১৯৬৫ কিংবা ১৯৭১ সালে ভারত ও ভারতীয়দের চিত্র এর চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল না।

ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান, জিহাদি কিংবা তালেবান নেতৃত্বাধীন কম্বোর মধ্যে এক বা দুই বছরের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব বা বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে আগামী ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জন্য চূড়ান্ত বিজয়ের পরিস্থিতি তৈরি হবে। নরেন্দ্র মোদির অধীনে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে মোট ভোটের প্রায় ৩১ শতাংশ পেয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি) পেয়েছিল মাত্র ২০ শতাংশের মতো ভোট। অন্য দলগুলোর অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই নির্বাচনে বিজেপি এবং তার মিত্ররা মিলে মোট ভোটের ৩৭ শতাংশ পেয়েছে। ফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও অন্যদের চেয়ে তারা বেশ এগিয়ে ছিল।

দিল্লিভিত্তিক বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক বলছেন, কোনও দেশ বা শক্তি সামরিকভাবে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আধুনিক ভারতের শক্তি ও সহনশীলতা তাদের অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মারুফ রাজার মতে, আজকের ভারত তার প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দিতে পাকিস্তান ও ‘আজাদ’ কাশ্মিরের অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সম্ভাবনা উপভোগ করবে।

রাজা, মেজর গৌরব আর্য এবং অন্য বিশ্লেষকরা পাকিস্তান এবং তার জইশ-ই-মোহাম্মাদ (জেইএম), লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) মতো প্রক্সিদের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির সাম্প্রতিক তিনটি দৃষ্টান্তের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

প্রথমত, ভারত সুউচ্চ হিমালয় উপত্যকার কারগিলে খুব কঠিন যুদ্ধে স্থল সুবিধা ভোগ করে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিহত করতে সমর্থ হয়।

দ্বিতীয়ত, দিল্লি পাকিস্তানি অর্থায়নে পরিচালিত পুলওয়ামার হামলাকারীদের তাড়া করে আজাদ কাশ্মিরের ভূখণ্ডে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই হামলার কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তৃতীয়ত, ভারতীয় সেনারা হিমালয়ে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করে পুরো দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

কলকাতাভিত্তিক একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘মার্কিন সেনাদের আফগানিস্তানে রেখে যাওয়া অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের কথা মাথায় আনবেন না। তালেবান কখনও বিদেশি ভূখণ্ডে বা সমভূমিতে তাদের প্রধান শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি। তারা তাদের পার্বত্য আবাসভূমিতে শত্রুদের অভিযানে নাশকতার জন্য কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গেরিলা পদ্ধতিতে হামলা করা হয়েছে। প্রচলিত যুদ্ধের মাঠে তারা এখনও পরীক্ষিত নয়।’

যেকোনোভাবে সংঘাত শুরু হলে অন্য দলগুলোর চেয়ে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে সেনা অভিযানের সুফল অধিক পরিমাণে উপভোগ করবে বিজেপি। কেননা, তারা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয়তাবাদকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে অন্য কোনও রাজনৈতিক দল গেরুয়া শিবিরের ধারেকাছেও নেই।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-এর বিরুদ্ধে খুব একটা ভালো ফল ঘরে তুলতে পারেননি কলকাতাভিত্তিক বিজেপি নেতারা। তারা মনে করেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যদি নতুন সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি তাদের পক্ষে ঘুরে যেতে পারে। যদিও তারা এ ধরনের ইস্যুতে এখনও জনসমক্ষে আলোচনায় আসেননি এবং প্রকাশ্যে মন্তব্য করা থেকে বিরত আছেন।

আরও একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি বিবেচনায় রয়েছে:

নিকি হ্যালি ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিকের আশঙ্কা মতো যদি লাদাখ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিতর্কিত হিমালয় সীমান্ত অঞ্চলে নিজেদের আক্রমণের শক্তি বাড়িয়ে ভারতে হামলা চালাতে পাকিস্তানকে সক্রিয় সহযোগিতা করে চীন, তাহলে দিল্লির জন্য এই পথ আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। অবশ্য এমন কোনও ঘটনা ঘটতে বা সংঘটিত হতে অনেক সময় লাগবে, যার ফলে প্রস্তুতির জন্য ভারত অনেক সময় পাবে।

অবশ্য এর ফলে বেইজিং নিজস্ব সামরিক চলাচলে আরও সীমাবদ্ধতা আনতে পারে। কারণ, এই অঞ্চলে ইসলামি জিহাদি কিংবা চীন আঞ্চলিক মিত্র ভারতকে আক্রমণ করলে চুপচাপ বসে থাকবে না যুক্তরাষ্ট্র। হিমালয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র/ পশ্চিমা বাহিনীর আগমন বা কোনও সামরিক ভূমিকা পালন করলে বেইজিং খুশি হবে বলে মনে করার কোনও কারণ নেই।

অদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতে বিভিন্ন কৌতূহল জাগানিয়া পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চীনকে পর্যবেক্ষণ করা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সংসদ সদস্য সুব্রামানিয়ার স্বামী পূর্বাভাস দিয়েছেন, আফগান রাজনীতির বিশৃঙ্খলায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান আর্থ-সামাজিক অরাজকতা সহকারে জিহাদি চরমপন্থার দিকে এগিয়ে যাবে।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক ড. পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়্যবা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদের সদস্যরা পুলওয়ামার মতো ভারতে আরও একটি হামলা চালিয়ে নতুন করে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি যাচাই করবে। নিকি হ্যালির মতো কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় জেনারেলও উদ্বিগ্ন এ ক্ষেত্রে চীন ফ্যাক্টরের ভূমিকা কেমন হবে। 

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-(আইএনসি) থেকে শুরু করে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর কাছে কাবুলের পতন ও পরবর্তী ঘটনাগুলোতে ভারতের সতর্ক প্রতিক্রিয়া ছিল বিজেপি নেতাদের সমালোচনার মোক্ষম অস্ত্র। আর এমনটি ছিল প্রত্যাশিতই। প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তোপের মুখে পড়েছেন। রাহুল গান্ধী ও পি. চিদাম্বরামের মতো কংগ্রেস নেতারা ভারতীয়দের মনে করিয়ে দিয়েছেন, দিল্লি এখনও নতুন দখল করা এলাকা থেকে চীনা সেনাদের ফেরত পাঠাতে পারেনি। গত কয়েক মাসে ভারতের দৃঢ় প্রতিরোধের পরও এটি চীনা পর্যবেক্ষকদের কাছে অপ্রত্যাশিত।

বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তোলার মতো আরেকটি উদ্বেগজনক প্রশ্ন রয়েছে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের লজ্জাজনক প্রস্থান এবং শান্তিপ্রিয় বেসামরিক আফগান জনগণের প্রতি আমেরিকার ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র পর দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্নের উদয় হচ্ছে।  শুধু যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন এমন নয়।

প্রশ্ন উঠছে, যদি ক্ষমতাসীন দলকে এবং দেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের মিত্র দেশকে সহযোগিতা করতে না পারে তাহলে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? ভারতের সংবাদমাধ্যমে দীর্ঘদিন পর সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন উঠছে ভারত বা জাপানের মতো কোয়াড মিত্র দেশের কোনও নৌযান উন্মুক্ত সাগরে যদি চীনা হামলার শিকার হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কতটা নির্ভর করা যাবে? এমন প্রশ্ন উঠে আসাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ডানপন্থী রিপাবলিক চ্যানেলসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের সুপারিশে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভূ-কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়নের সময় কি এখন নয়?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলকাতা

/এলকে/এমপি/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ