X
মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২
২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

উদ্বেগ ও অবসাদ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
১৩ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৪৬আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৪৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা করোনাকালে দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ৮৪ শতাংশের বেশি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এদের মধ্যে ৪ ভাগের ৩ ভাগ শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। গ্রামে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। মানসিক সমস্যা বেশি হয়েছে নারী শিক্ষার্থীদের। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের একদিন আগে ৯ অক্টোবর পত্রিকায় প্রকাশিত বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের ‘করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক বিপর্যয়’ শীর্ষক জরিপের ফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।  জরিপে অংশ নেন দেশের প্রখ্যাত পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ৯২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী, যাদের গড় বয়স ২৩ বছর।

করোনাকালে মানসিক উদ্বেগের কথা বারবার উঠে আসছে আলোচনায়। আরও একটি মানসিক অসুখের কথাও এ সময়ে প্রবলভাবে আলোচিত হয়েছে। তা হলো অবসাদ। আসলে উদ্বেগ আর অবসাদ এখন ঘরে ঘরে। এরমধ্যে হয়তো ব্যবধান আছে অনেক, তবে দুটোই মানসিক সমস্যা।

জরিপে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা উঠে এলেও শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের, সব পেশার মানুষের একটা বড় অংশেরই মানসিক স্বাস্থ্য চুরমার হয়েছে এই করোনাকালে। সামাজিক অনাচার, সংঘর্ষ, সংঘাতময় পরিবেশ মানুষকে দুমড়েমুচড়ে একা, বিষণ্ণ করে দেয়। করোনা সেই কাজটি আরও ত্বরান্বিত করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অতিমারি বিনাযুদ্ধে মানুষের সমাজ, মন ভেঙে দিয়েছে। দেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থাভেদে সমস্যা কমবেশি হলেও মানব মনের পঙ্গুত্বের ছবিটি সর্বত্রই স্পষ্ট।

জরিপে বড় শিক্ষার্থীদের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু স্কুল পড়ুয়ারা কী অবস্থার ভেতর দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে সে খবর পাচ্ছি না আমরা। করোনার প্রকোপ এড়িয়ে অবশেষে কিছু কিছু ক্লাস শুরু হয়েছে। স্কুল কবে খুলবে কেউ বুঝতে পারছিল না। সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা ছিল না বহু মাস। সুযোগ ছিল না মাঠে দৌড়ঝাঁপ করারও। এক রকম ঘরবন্দি জীবনই কেটেছে পড়ুয়াদের। এই অবস্থায় শিশু কিংবা কিশোর মনকে মানসিক বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে নিশ্চয়ই, কিন্তু এর কোনও খবর আমরা রাখিনি। তবে কিশোর তরুণদের ভেতর আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বুঝিয়ে দেয় কচিকাঁচাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া জরুরি।

করোনার পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধিতে শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা বারবার আলোচনা হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের, বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখা হয়নি। সে বিবেচনায় জরিপের ফলকে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত হবে অতি দ্রুত ছাত্রছাত্রীদের মানসিক সমস্যা সমাধানে নজর দেওয়া।  

তবে সমস্যাটা সামগ্রিক বলেই ধারণা করছি। করোনার সংক্রমণ কমেছে, সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছে। কিন্তু যারা রোজগার হারিয়েছেন, কর্ম হারিয়েছেন, স্বজন হারিয়েছেন, তারা স্বাভাবিক নন। ঘরবন্দি জীবনে সৃষ্ট মানসিক অসুস্থতা অনেক। এমনিতেই মনের অসুখ নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতা আমাদের দেশে নেই। মন খারাপের বা মনের অসুখের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার রেওয়াজ নেই একেবারে। বরং চেপে রাখতে চাই আমরা, আমাদের পরিবার। সাইকোলজিস্ট এবং সাইকিয়াট্রিস্টদের আমরা ‘পাগলের ডাক্তার’ বলে সামাজিক সনদ দেই। কর্মক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা দেখা দিলে সেই মানুষটাকে তাড়াতে ব্যস্ত হয় মালিক ও সহকর্মীরা।

সবচেয়ে বেশি বিপদ তাদের যারা ইন্ট্রোভার্ট বা অন্তর্মুখী স্বভাবের। তারা তাদের যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতেও পারেন না। এ জন্য যথেষ্ট সামাজিক মেলামেশার সুযোগ বাড়াতে হবে প্রতিটি পরিবারকে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে তথ্য বেরিয়েছে তা আশঙ্কাজনক। এ নিয়ে ভাবতেই হবে। এদের  মানসিক সমস্যার স্বরূপ বিশ্লেষণ করা জরুরি। আমরা দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সদ্য সাবেক শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহাদী অপু আত্মহত্যা করেছেন। শিক্ষিকা কর্তৃক চুল কেটে দেওয়ায় মানসিকভাবে চুরমার হয়ে পাবনার রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। এগুলো স্বাভাবিক কোনও কাজ নয়। বোঝাই যাচ্ছে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ইদানীং পড়ালেখা ও তাদের পরবর্তী কর্মজীবন নিয়ে আগের চাইতে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সেখান থেকেই আসছে অবসাদ।    

২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার বিকল্প ছিল না। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক সর্বমহলেই জীবন বাঁচানোকেই অগ্রাধিকার বিবেচনা করা হয়। কিন্তু শহরে থেকে টিউশনি করে, খণ্ডকালীন কাজ করে যে ছেলেমেয়েরা, তারা পড়েছিল চরম বিপদে। যেটুকু আয় হতো এ দিয়েই চলতো। সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। অনেকে ক্যারিয়ার নিয়ে অবসাদে আক্রান্ত হয়।

দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় কাটাতে কাটাতে অনেকেই তাদের কষ্টার্জিত সামাজিক সম্পর্কগুলো হারিয়ে ফেলে। অনেককেই বাড়িতে অপ্রীতিকর পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভার্চুয়াল পৃথিবীতে ঘুরতে ঘুরতে বাস্তব জগৎ হয়তো অনেকে হারিয়ে ফেলেছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক হল খোলা হলেও ছাত্রছাত্রীরা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় আছেন। এদের কাউন্সিলিং করতে হবে। শিক্ষকরা কতটা সংবেদনশীল হয়ে তাদের দেখভাল করবেন, কতটা মমতার পরিবেশে পড়ালেখার সুযোগ তৈরি করবেন সেটাই দেখার বিষয়। ছাত্র রাজনীতির নামে যে অসুস্থতা আছে সেটা কী করে ছাত্রছাত্রীদের সহায়ক হয় তা নিয়ে ভাবা দরকার। কারণ, আমাদের সমবেত উদ্দেশ্য, একটা স্বাস্থ্যোজ্জ্বল আগামী তৈরি করা, যেন পড়ালেখায় ফেরা পড়ুয়ারা তরতাজা মন নিয়ে পূর্ণ উদ্যমে জীবনের মূল স্রোতে আবার মিশতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তুরাগে ভাঙারির দোকানে বিস্ফোরণ: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫
তুরাগে ভাঙারির দোকানে বিস্ফোরণ: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫
ভারতে জয় পেলেন বাবা ও ছেলে
ভারতে জয় পেলেন বাবা ও ছেলে
ডলার কারসাজির অভিযোগ, চাকরি হারাচ্ছেন ৬ ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান
ডলার কারসাজির অভিযোগ, চাকরি হারাচ্ছেন ৬ ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান
আজ পবিত্র আশুরা
আজ পবিত্র আশুরা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ