X
শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২
১৭ আষাঢ় ১৪২৯

ডা. মুরাদ কি একজনই?

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:০১
ডা. জাহেদ উর রহমান ডা. মুরাদ হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ৭ ডিসেম্বর এই লেখা যখন লিখছি তখন অনলাইন মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে তিনি ইমেইলের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। ডা. মুরাদের বিরুদ্ধে কোনও না কোনও পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছিল সরকারের দিক থেকে।

আমি ঠিক মনে করতে পারি না, সহসা কোনও ইস্যুতে সরকারি দলের সমর্থকরাও সরকারি দলের প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে খুব শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাটি ব্যতিক্রম এই ক্ষেত্রে। ফেসবুকে আমার পরিচিত বা বন্ধুদের মধ্যে সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের আমি বহুদিন পর সরকারের কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিতে দেখলাম। সরকারের প্রায় সব   ‘অকাজ’কেও  মোটামুটি অন্ধভাবে সমর্থন করা মানুষরাও ‘যদি-কিন্তু’ দিয়ে হলেও জনাব মুরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছিলেন।

এই দেশের সাধারণ নাগরিক কিংবা বিরোধীদলীয় কর্মীদের সরকার আদৌ গুরুত্ব দেয় কিনা সেটা নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। বরং মজা করে এই কথাও বলা হয়, বিরোধী দল সরকারি দলের কারও সমালোচনা করার মানে হচ্ছে তার অবস্থান আরও পোক্ত হওয়া। কিন্তু এবার খুব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল তাদের দলের ভেতরেই প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের একজন মন্ত্রী এমন ভয়ংকর যৌন হয়রানিমূলক, নারীবিদ্বেষী এবং বর্ণবাদী বক্তব্য দিয়ে মন্ত্রী থেকে যেতে পারছেন, এটা নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরকারের জন্য খুব খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতো। সর্বোপরি আরেকটা গুরুতর ব্যাপার ছিল, যে প্রসঙ্গে পরে আসছি। সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনও একটা ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া সরকারের সম্ভবত উপায় ছিল না।

এই দেশে সরকারি দলের সঙ্গে জড়িত যে কেউ কোন ‘অকাজ’ করলে এবং সেটা যদি অস্বীকার করার উপায় না থাকে তাহলে দলটির পক্ষ থেকে এটাকে তার ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ এবং ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে প্রচার করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে ডাক্তার মুরাদ যা করেছেন এটা কি আসলেই খুব বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

প্রথমে ঘটনাটি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাক। অনলাইন সাক্ষাৎকারে জাইমা রহমানের বিরুদ্ধে তিনি যা বলেছেন তেমন কথা একবার বলাও ভয়ংকরতম অন্যায়। তবু আলোচনার খাতিরে ধরে নিই সেদিন কথাগুলো হঠাৎ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এটাও সত্য, তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যে ভদ্রলোক, তার মতো এত নোংরা বডিল্যাঙ্গুয়েজ এবং মুখভঙ্গির মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তার দিক থেকেও উসকানি ছিল তাকে দিয়ে নানা কথা বলানোর।

একটা মানুষের মধ্যে ন্যূনতম, একেবারে ন্যূনতম বোধ থাকলেও সেই মানুষটার উচিত ছিল এই সাক্ষাৎকারটি ছড়িয়ে পড়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমা চাওয়া। কোনও মানুষ তার মন থেকে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া সর্বোত্তম। কিন্তু এমনকি কেউ যদি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হলেও ক্ষমা চায় সেটার মধ্যেও এক ধরনের শুভবুদ্ধির পরিচয় থাকে- অর্থাৎ সেই মানুষটা অন্য মানুষদের কিছুটা হলেও পরোয়া করে। কিন্তু না, তার মধ্যে অনুতাপ তো ছিলই না, ছিল না নিম্নতম সৌজন্যে প্রকাশের তাগিদও।

যেসব বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেগুলোকে ভুল বলে স্বীকার করেন কিনা কিংবা প্রত্যাহার করবেন কিনা, এমন কথা বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল জনাব মুরাদের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না’। আন্তরিক ক্ষমা দূরে থাকুক, ন্যূনতম সৌজন্য প্রকাশের জন্য হলেও ক্ষমা তিনি চাইবেন না কেন সেটার জবাবও পাওয়া যায় বিবিসি বাংলাকে তিনি যা বলেন তাতে। তিনি বলেন, তার বক্তব্য নিয়ে নানারকম সমালোচনা হলেও তার ওপর দল বা সরকারের তরফ থেকে বক্তব্য প্রত্যাহারের কোনও চাপ নেই।

অনুমান করি, জাইমা রহমানকে নিয়ে সেই ঘটনাটি তার ভাগ্যলিপি নির্ধারণ করে দেয়নি। কারণ, সেই ঘটনাটি নিয়ে ন্যূনতম সংশয়ের কোনও সুযোগ ছিল না। ঘটার পরই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে ফেলা যেত, কিন্তু নেওয়া হয়নি। তাই যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায়, এরপর তার ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপটি তার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটিয়েছে। সেই ক্লিপে একজন নারীকে যে ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে, সেটাও সম্ভবত প্রধান কারণ নয়। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে সেই অভিনেত্রীকে ধর্ষণ করার জন্য তুলে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। এটা ভয়ংকর অভিযোগ; এটাই সম্ভবত প্রধান কারণ।

ইদানীং সরকারি দলের কারও কোনও অডিও ক্লিপ ফাঁস হলে সেটিকে ‘এডিট’ কিংবা হালে ‘সুপার এডিট’ টাইপের কথা দিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা করা যায়নি, কারণ সেই ক্লিপে কথা বলা অভিনেতা ইমন মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই কথোপকথন সত্যিই তার, মাহির এবং জনাব মুরাদের।

আমি জানি বাংলাদেশের বড় দুই দল বহু দিন হলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী আর নয়, তারা স্পষ্টতই শত্রুতে পরিণত হয়েছে। হোক শত্রু দল, তবু সেই দলে সক্রিয় নয় এমন কারও সম্পর্কে বীভৎস মন্তব্য করার পরও তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটা দুঃখজনক, কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়।

তিনি এখনও ক্ষমতাসীন দলের সদস্য এবং তার চাইতে বড় কথা এখনও একজন সংসদ সদস্য অর্থাৎ আইনপ্রণেতা। অর্থাৎ তার মন্ত্রিত্বের ‘আম’ গেলেও সংসদ সদস্য থাকার ‘ছালা’টি কিন্তু রয়ে গেছে এখনও। যে কারও কাছে যৌক্তিকভাবেই মনে হবে, যে অপরাধটি একজন মানুষের মন্ত্রিত্ব যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়, সেটা কি তার এমপি পদ যাওয়ার জন্য যথেষ্ট না? এমন একজন মানুষ সংসদে থাকাটা কি সংসদের জন্য চরম অবমাননাকর না?

সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারতো তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে শুরু করা। জানি, বর্তমান বাংলাদেশে এসব হবে না। কিন্তু নিদেনপক্ষে উচিত ছিল তাকে দল থেকেও পদত্যাগ করতে বলা। তাকে বহিষ্কার না করে পদত্যাগ করতে বলার কথা বলেছি, কারণ বাংলাদেশ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে কোনও সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবার ক্ষেত্রে সদস্যের তার দল থেকে পদত্যাগের কথা আছে, বহিষ্কারের কথা নেই। বহিষ্কার করলে আসন শূন্য কিনা সেটা নিয়ে বাংলাদেশের আদালতে বিতর্ক হয়েছে এবং দুই রকম রায় দেওয়ার নজির আছে। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তাকে সর্বোচ্চ মহল থেকে পদত্যাগ করতে বললে তিনি সেটা করতে বাধ্য হতেন।

শেষ প্রশ্ন হচ্ছে, জনাব মুরাদের এই যে আচরণ সেটাকে কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হচ্ছে? তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেশের নানা প্রান্তে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন নৌকায় ভোট না দিলে কী কী করা হবে সেটা নিয়ে যেসব ভয়ংকর মন্তব্য করেছেন সেসব স্মরণ করি। এমন মন্তব্য কয়েকটি না, ভূরি ভূরি আছে। সেই মন্তব্যগুলো যদি জনাব মুরাদের বক্তব্যের সঙ্গে মেলাই তাহলে নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারবো এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়।

এই দলে তৈরি হবে আরও নতুন ‘মুরাদ’। আমি নিশ্চিত, ‘ডা. মুরাদ’ একজন নয়।
 
লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জঙ্গিদের সুপথে ফেরানো ও সচেতনতা কার্যক্রম কতদূর?
জঙ্গিদের সুপথে ফেরানো ও সচেতনতা কার্যক্রম কতদূর?
‌‘আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না’ 
‌‘আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না’ 
ওডেসায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ১০
ওডেসায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ১০
গোমতীর পানি কমে বেরিয়ে আসছে ক্ষত
গোমতীর পানি কমে বেরিয়ে আসছে ক্ষত
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ