X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

আইন করে কি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:৪৭

প্রভাষ আমিন পাঁচ বছর পরপর আমাদের রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের একটি আইনের কথা মনে পড়ে যায়। সংবিধানের ১১৮(১) বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনও আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ কিন্তু ৫০ বছরেও নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে কোনও আইন প্রণীত হয়নি। এ নিয়ে পাঁচ বছর কারও কোনও মাথাব্যথাও থাকে না।

মেয়াদ শেষে নতুন কমিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেই রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের ঘুম ভাঙে। নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন প্রণয়নের বিষয়ে কারও কোনও দ্বিমত থাকে না। সবাই আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বিকল্প পন্থায় নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়ে যায়। এবং পরের পাঁচ বছর আমরা সবাই আবার শীতনিদ্রায় ঢলে পড়ি। আইন না করার জন্য এখন সবাই আওয়ামী লীগকে দুষছে। আওয়ামী লীগের দায় অবশ্যই আছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। সময়ের হিসাবে আওয়ামী লীগের দায় বেশি হলেও বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিও দায় এড়াতে পারবে না। জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনের আমল না হয় বাদই দিলাম। স্বৈরাচার পতনের পর গণতান্ত্রিক আমলেও বিএনপি তিন দফায় ক্ষমতায় ছিল। তাই নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন না হওয়ার দায় সবাইকে নিতে হবে। তবে আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হলেই কি সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের লেখা।   

আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। যথারীতি সবার ঘুম ভেঙেছে। আইন প্রণয়নের দাবিতে সোচ্চার সবাই। রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে এসেছে। এই সংলাপ চলবে এবং শেষ মুহূর্তে ‘এবার আর আইন প্রণয়নের সময় নেই’ বলা হবে। এবারও যে আইন প্রণয়ন হচ্ছে না এবং সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে, এটা বলার জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা জ্যোতিষী হওয়ার দরকার নেই। আগের দুইবারের মতো এবারও সার্চ কমিটির মাধ্যমে যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে, তার অধীনেই ২০২৩ বা ২০২৪ সালে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আইন না হলেও পর্দার সামনে পেছনে আলাপ-আলোচনা, সমঝোতার মাধ্যমে যদি নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নইলে এই জটিলতার রেশ থেকে যাবে, যা নির্বাচনের আগে আরও বাড়বে শুধু।

কোনও আইন না থাকায় রাষ্ট্রপতিই নির্বাচন কমিশন গঠন করতেন। তবে গত দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি বিষয়টিকে একটি ভদ্রস্থ চেহারা দিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা, সার্চ কমিটি গঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে নামের তালিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করছেন। এই প্রক্রিয়ার সুবাদেই বিএনপির পছন্দের মাহবুব তালুকদার নির্বাচন কমিশনার হতে পেরেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত হওয়া দুটি নির্বাচন কমিশনের অধীনেই ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এ দুটি নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক সমালোচনা আছে।

তার মানে সার্চ কমিটি নির্বাচন ভালো করার গ্যারান্টি দিতে পারেনি। ধরে নিচ্ছি, এবার আইন প্রণয়ন করেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। তাতেই কি আগামী নির্বাচন ভালো হওয়ার গ্যারান্টি মিলবে? আইন না হয় হলো, কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনারদের তো আর মঙ্গল গ্রহ থেকে আনা হবে না।

এই বিচারপতি রউফ, বিচারপতি আজিজ, কাজী রকিব, নুরুল হুদারাই নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব দেবেন। বিচারপতি বলেন আর আমলা বলেন, ‘যেই লাউ সেই কদু’। আইন করে বিচারপতি এম এ আজিজকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বানালেও কোনও পরিবর্তন তো আসবে না। আইন তো আর কারও মেরুদণ্ড শক্ত করে দিতো না।  সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন করা দরকার। কিন্তু আইন হলেই নির্বাচনি ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে, এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই।

সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।’ কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন কখনোই নিজেদের এই স্বাধীনতা প্রয়োগ করে না। আসলে তারা যে স্বাধীন, সেটাই বোধহয় তারা ভুলে যান। অনেক দিন খাঁচায় রাখার পর খাঁচা খুলে দিলেও অনেক পাখি উড়ে যায় না। তারা যে স্বাধীন হয়েছে, সেটা তারা বুঝতেই পারে না। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনগুলোকে সরকারের নির্বাহী বিভাগের অধীনের কোনও প্রতিষ্ঠানের বেশি কিছু মনে হয় না। অথচ সংবিধানে দেওয়া স্বাধীনতা ছাড়াও নির্বাচনের সময় আসলে সর্বময় কর্তৃত্ব নির্বাচন কমিশনের হাতেই থাকে। তারা চাইলেই সে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু সাধারণত ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বাইরে তারা নিজেরা কোনও ক্ষমতার প্রয়োগ করেন না। সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা আমলাদের মধ্য থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এরপর তারা আর কোনও দায়িত্ব পালনের যোগ্য থাকেন না। তার মানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই একজন ব্যক্তির জীবনের সর্বোচ্চ ও শেষ পদ। নির্বাচন কমিশনাররা বড় জোর প্রধান নির্বাচন কমিশনার হতে পারেন। যদিও বাংলাদেশে এখনও কোনও নির্বাচন কমিশনার পদোন্নতি পেয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হননি। চাইলে নির্বাচন কমিশনার বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেদের ক্ষমতার পরিপূর্ণ প্রয়োগ করে জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু কীসের আশায়, কীসের লোভে তারা সরকারের ধামাধরা হয়ে জাতির কাছে কলঙ্কিত হয়ে বিদায় নেন, আমার মাথায় ঢোকে না।

মাগুরা উপনির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির একটা বড় টার্নিং পয়েন্ট। তখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ মাগুরা উপনির্বাচনে অনিয়ম দেখে রীতিমতো পালিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। তিনি যদি হেলিকপ্টারে চড়ার আগে উপনির্বাচনটি বাতিল করে দিতেন, যে ক্ষমতা তার ছিল, তাহলে আজ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতো। বিচারপতি রউফও থাকতেন জাতীয় বীরের মর্যাদায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে তিনি তা করেননি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারতেন কাজী রকিব বা ২০১৮ সালের অস্বাভাবিক নির্বাচনের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারতেন নুরুল হুদা। কিন্তু তারা তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেননি বা নিজেদের ক্ষমতার ব্যাপারে তারা সচেতনই নন। বিচারপতি রউফ, বিচারপতি আজিজ, কাজী রকিবরা গণমানুষের ঘৃণা ছাড়া বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কিছু পাননি। নুরুল হুদার ভাগ্যেও কিছু জোটার সুযোগ নেই। আমার কাছে মনে হয়, সাবেক বিচারপতি বা আমলারা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বকে চাকরির এক্সটেনশনের বেশি কিছু মনে করেন না। তাই আগের চাকরির মতো সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করেন না তারা। তাই ব্যক্তির সততা, দৃঢ়তা নিশ্চিত করতে না পারলে আইন বলুন, সার্চ কমিটি বলুন; কিছুতেই কিছু হবে না। আবার স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে নির্বাচন মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তখন তো আইনও ছিল না, সার্চ কমিটিও ছিল না।

তবে সব দায় নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে দিলে হবে না। নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দায় নিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেও। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি বলেই ২০১৪ সালে নির্বাচন হওয়ার আগেই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সংবিধানে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। তাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। আবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগও সংবিধানেই আছে। আবার চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে ঘটনা ঘটছে, তা নির্বাচনি ব্যবস্থাকেই ‘হাস্যকর’ করে তুলেছে।

নির্বাচন নিয়ে নানান কৌশলের কারণে নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর দায় সরকারি দলকেও নিতে হবে। এখন মানুষ ভোট দিতে যায় না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারেও মানুষের আগ্রহ কমে গেছে।

নির্বাচন কমিশন যখন বলে, মানুষ ভোট দিতে না এলে বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে, আমার কী করার আছে; তখন আসলে তাদের অসহায়ত্বটা আমরা টের পাই।

নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা, মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আসতে অনুপ্রাণিত করা, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারে আগ্রহী করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। বিএনপি বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এখন আর সংবিধানে নেই। ফিরে আসার সম্ভাবনা বা বাস্তবতাও নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিপক্ষে। যাদের হাতে পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার ভার তুলে দিতে পারবো, তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে না, এটা হওয়া উচিত নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হলো, রাজনীতির প্রতি অনাস্থা। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেই বসে ঠিক করতে হবে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কেমন হবে। মাঠের আন্দোলন দিয়ে যে বিএনপি দাবি আদায় করতে পারবে না, সেটা তারাও বুঝে গেছে। তাই রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সংলাপে হোক, পর্দার পেছনের আলোচনায় হোক; আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য জরুরি। সবাই মিলে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারলে জটিলতা অনেকটাই কমে যাবে। নইলে রাজনৈতিক জটিলতা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত বা তারপর পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়ী করছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীরা
দল বদলের হিড়িককেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়ী করছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীরা
৬ মিনিটে তিন গোলে চ্যাম্পিয়ন ম্যান সিটি
৬ মিনিটে তিন গোলে চ্যাম্পিয়ন ম্যান সিটি
এবারও কি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে বাংলাদেশ?
এবারও কি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে বাংলাদেশ?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ