X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

‘কত বড় সাহস, বাসে বসে সরকারের বদনাম বলতেছে!’

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:১৭

ডা. জাহেদ উর রহমান ফেসবুক লাইভ ভিডিওটি ভাইরাল। অনেকে শেয়ার করেছেন বলে ভিডিওটি সামনে এসেছে। কেউ কেউ ম্যাসেঞ্জারে লিংক পাঠিয়েও দেখতে বলেছেন। বরাবরের মতো আমরা প্রায় সবাই ট্রল করছি ভিডিওটি নিয়ে। কেউ কেউ আবার প্রকাশ করেছেন তীব্র ক্ষোভ। প্রথম দিকে না দেখলেও পরে দেখলাম ভিডিওটি। বুঝলাম ভিডিওটি দেখা জরুরি ছিল। 

অনুমান করি এই লেখার পাঠকদের প্রায় সবাই ভিডিওটি দেখেছেন। যারা দেখেননি তাদের জন্য অল্প কয়েকটি কথা। একজন তরুণী বাসে ফেসবুক লাইভ শুরু করে বাসের বাতি জ্বালাতে বলেন। এরপর প্রথমেই তিনি একজন যাত্রীকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন কেন তিনি সরকারের বদনাম করেছেন। এরপর তারা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। আমরা খুব স্পষ্টভাবে শুনতে পাই ওই তরুণীর কথাগুলো। অপরপক্ষ থেকে কী বলা হচ্ছে সেটা খুব ভালোভাবে বোঝা যায় না। 

ওই তরুণী যত কথা বলেন তার মূল বক্তব্য হচ্ছে, এই তরুণদের কত বড় সাহস যে তারা বাসে বসে এই সরকারের আমলে এই সরকারের বদনাম করছে। যে যাত্রীদের সঙ্গে তরুণীটি বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন তাদের পক্ষে সম্ভবত কেউ কথা বলতে গিয়েছিল, তিনি তাকেও একইভাবে আক্রমণ করেন। তিনি যাদের প্রতি অভিযোগ করছেন তাদের বিএনপি-জামায়াতের লোক বলে ঘোষণা করছেন। লাইভে তিনি তাদের ‘হাত-পা ভেঙে দেবার’, তাদের ‘শেষ’ করে ফেলার হুমকি দেন। তাদের গ্রেফতার করানোর ভয় দেখান। তিনি এই অভিযোগও করছেন, যেসব যাত্রীর সঙ্গে তার সমস্যা হয়েছে তারা তাকে আক্রমণ করবে। 

যে তরুণী লাইভটি করেছেন তার নিশ্চয়ই কোনও চাকরি লাগবে কিংবা আছে অন্য কোনও ‘ধান্দা’, তাই তিনি কাজটি করেছেন–ভিডিওটি শেয়ার করার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষই এই কথাটি বলেছেন। মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি যে ক্ষোভ আছে তার কিছু অংশ সরকার সমর্থক ওই নারীর ওপর উগড়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখেছি কারও কারও কথায়। কিন্তু শুরুতে যে বললাম ভিডিওটি দেখার পর আমার কাছে জরুরি মনে হয়েছিল, তার প্রতি নেটিজেনরা কেমন ধারণা করছেন কিংবা আচরণ করছেন, সেটা একটা দিক, কিন্তু তরুণীর মনস্তত্ত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

তরুণীর আচরণের ব্যাখ্যায় একটি সম্ভাব্যতা হতে পারে, তিনি যা করেছেন সেটা অভিনয়। এই ভিডিওতে আমরা জানতে পারি না তিনি সক্রিয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করেন কিনা। তবে এটা হতেই পারে তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হোন বা না হোন, এই প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমে তিনি সরকারি দলের কারও না কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। তার প্রত্যাশায় না থাকলেও তিনি এখন সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেছেন। ওদিকে তরুণীটি সত্যি সত্যি তার প্রিয় সরকারের সমালোচনা শুনে সহ্য করতে পারেননি, ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন এটা আরেকটা সম্ভাব্যতা। ঝগড়াঝাটির একপর্যায়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘সহ্য করতে পারতেছি না, সরকারের বদনাম করতেছে’। কোনও সম্ভাব্য ব্যাখ্যার প্রতি পূর্বানুমান না রেখে দুটি দিকই ব্যাখ্যা করা যাক।

প্রথম সম্ভাব্যতাটা নিয়ে কথা বলা যাক। এই তরুণী রাজনৈতিক দলের কর্মী হোক বা সমর্থক, তিনি জানেন সরকারি দলের পক্ষে দাঁড়িয়ে এমন একটি হৈ-হট্টগোল বাসে তৈরি করার মাধ্যমে তিনি সরকারি দলের নেক নজরে আসতে পারবেন। তরুণীর উদ্দেশ্য সফল  হয়তো হয়েই যাবে। কোনও কিছুর জোগান থাকা মানেই সেটার চাহিদা আছে। বর্তমান বাংলাদেশে এটা জানে না কে? হতেই পারে তার এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ দেখলাম আমরা।

আর দ্বিতীয় ব্যাপারটি যদি সত্যি হয়ে থাকে সেটা আমাদের দেয় আরেক ভয়ংকর পরিস্থিতির প্রমাণ। এই দেশে শেষবার সবচেয়ে কম বয়সে যে মানুষটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছিল (১৮ বছর বয়সে) তার বয়স এখন ৩২ বছর। এর নিচের বয়সের মানুষরা অতীতের তুলনায় সম্পূর্ণ এক ভিন্ন বাংলাদেশে বেড়ে উঠেছে।

একটা দেশে যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে, তবে সেই দেশে সরকারের সমালোচনা করা যায়, সমালোচনা করা যায় প্রধানমন্ত্রীরও। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটা সরকারের ব্যর্থতার প্রতিটি বিষয়ের জবাবদিহি চাইতে পারেন নাগরিক। সমালোচনা করতে পারে সরকারের। সরকারি দলের সমর্থকদের এসব সমালোচনা শোনার মানসিকতা থাকতে হবে। কোথাও কোনও সমালোচনা পছন্দ না হলে সেটা নিয়ে বিতর্কও করতে পারেন। কোনও সমালোচনার প্রত্যুত্তরে কাউকে ‘শেষ’ করে ফেলা, ‘হাত-পা ভেঙে দেওয়া’ কিংবা ‘পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার’ করানোর হুমকি হতে পারে না। 

সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের একটা প্রজন্ম প্রচণ্ড রকম রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার একটা পরিবেশের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। যে কিশোর-তরুণ এমন পরিবেশের মধ্য দিয়ে বড় হয়, তার ধারণা হতেই পারে সরকারের সমালোচনা করা একটা অপরাধ। তার প্রতিবাদে সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

বর্তমান সময়ের অনেক কিশোর-তরুণ এটা জেনে বড় হচ্ছে, এই দেশে যারা বিরোধীদলীয় রাজনীতি করে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। কারও গায়ে ‘বিএনপি-জামায়াত’ ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে তার বিরুদ্ধে যেকোনও কিছু করে ফেলা যায়।

বর্তমান সময়ের কিশোর-তরুণ কানে গণতন্ত্রের কথা হয়তো শোনে কিন্তু গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলতে আসলে কী, সে বড় হয় সেটা না দেখেই। পরমত সহিষ্ণুতার চরম অভাবের একটা পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে নিজের অজান্তেই সে নিজেও পরমত অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। ভয়ংকর আশঙ্কার কথা হচ্ছে, এই পরমত অসহিষ্ণুতা যে শুধু রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রে হয় বা হবে তা নয়। একটা অসহিষ্ণু মানুষ তার অসহিষ্ণুতাকে ছড়িয়ে দেবেন তার পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রেও।

তরুণীর আচরণের সম্ভাব্য কারণের যেটাই সঠিক হোক, সেটা এই দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে পারার পরিবেশ নিয়ে বিরাট প্রশ্ন তৈরি করে। এমন একটা পরিবেশে বেড়ে ওঠা পরমত অসহিষ্ণু একটা প্রজন্ম যখন এই রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে যাবে, তখন কেমন হতে পারে দেশের অবস্থা?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেলো দুই মোটরসাইকেল আরোহীর
ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেলো দুই মোটরসাইকেল আরোহীর
অবশেষে এ সপ্তাহ থেকে বিরোধী দলগুলোর কার্যালয়ে যাচ্ছে বিএনপি
অবশেষে এ সপ্তাহ থেকে বিরোধী দলগুলোর কার্যালয়ে যাচ্ছে বিএনপি
জিন্স ও টপস পরায় তরুণীকে মারধরের ঘটনায় যুবক আটক
জিন্স ও টপস পরায় তরুণীকে মারধরের ঘটনায় যুবক আটক
বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব
গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ-এর প্রথম উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকবৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ