X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

চলমান রাজনীতি:  ইসির দুর্গম পথযাত্রা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২২, ১৮:০৮

নাসির আহমেদ সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত গঠিত হলো নতুন নির্বাচন কমিশন। অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ক্ষমতা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। শপথগ্রহণ শেষে কমিশন সদস্যরা প্রথম কর্মদিবসেই করণীয় নির্ধারণের জন্য  বৈঠকও করেছেন। এবারের নির্বাচন কমিশন এমন এক সময়ে গঠিত হলো যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট তীব্রতর। কমিশন গঠনের আগেই দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কমিশন গঠন প্রসঙ্গে যথারীতি তার নেতিবাচক মনোভাবই প্রকাশ করেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বিএনপি’র মতো নির্বাচন কমিশনকে উপেক্ষা না করলেও ‘আমলা নির্ভর এবং সরকারের প্রতি অনুগত কমিশন’ বলে মন্তব্য করেছে। তাদের ভাষ্য হচ্ছে– আমলা নির্ভর এই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে তারা অপেক্ষা করবেন নবগঠিত ইসি কতটা নিরপেক্ষ, তা দেখার জন্য।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় মুখর ছিল রাজনৈতিক অঙ্গন এবং গণমাধ্যমগুলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সার্চ কমিটির আহবানে সাড়া দিয়ে ইসির জন্য সদস্যদের নাম প্রস্তাব করলেও বিএনপি ও তাদের শরিকরা কোনও নাম প্রস্তাব করেনি। সিপিবিও এই প্রক্রিয়া থেকে এবার নিজেদের বিযুক্ত রেখেছিল।

আওয়ামী লীগসহ তাদের জোটের শরিক দলগুলো এবং বেশ কিছু ছোট ছোট রাজনৈতিক দল কমিশন গঠনের জন্য তাদের পছন্দের নাম প্রস্তাব করেছিল। মজার ব্যাপার হলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী  লীগ প্রস্তাবিত নামগুলো গৃহীত হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়ালের নাম প্রস্তাব করেছিল তরিকত ফেডারেশন এনপিপি এবং সাম্যবাদী দল। বিএনএফ, খেলাফত মজলিস ও গণতন্ত্রী পার্টি প্রস্তাবিত নামগুলো থেকেও একজন করে কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন! কট্টর মৌলবাদী সংগঠক মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফতের প্রস্তাব থেকেও কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন!

সব মিলিয়ে তাই এবারের কমিশন গঠন নিয়ে নানামুখী আলোচনা- সমালোচনা রয়েছে। অনেকে সমালোচনা করছেন, যে পাঁচ সদস্যকে নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রপতি বরাবর সার্চ কমিটি দশটি নাম পাঠিয়েছিলেন, সেই নামগুলো কেন প্রকাশ করা হলো না?

রাষ্ট্রপতি বরাবর দশটি নাম পাঠানোর পরদিনই বেশ কয়েকটি দৈনিক এবং অনলাইন পোর্টাল সরকারের সাবেক দুই সিনিয়র সচিব এর ছবি পত্রিকার প্রথম পাতায় ছেপে মন্তব্য করেছিলেন এই দুইজনের একজন হবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তাদের একজন সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব শিক্ষা সচিব এবং পিএসসির সফল চেয়ারম্যান হিসেবেও স্বনামখ্যাত, অন্যজন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব এবং জাদরেল সিনিয়র সচিব হিসেবে খ্যাতিমান। ফলে এই দু’জনের বাইরে থেকে নতুন সিইসি নাম দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। দশটি নাম প্রকাশ করা হলে বিষয়টি স্বচ্ছতা পেত।

মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচক এবং বিএনপি’র শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শক হিসেবে যিনি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে পরিচিত, সেই ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী সিইসি নিয়োগের জন্য যার নাম দিয়েছিলেন, সাবেক সেই সিনিয়র সচিব হাবিবুল আউয়ালই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সুতরাং কমিশন গঠনে কোনও দলের প্রস্তাব উপেক্ষিত হয়েছে এমন ভাবাও এখন কঠিনই মনে হয়। তারপরও বিএনপি আস্থায় নেয়নি নবগঠিত কমিশনকে। অবশ্য সদ্য বিদায়ী নুরুল হুদা কমিশন নিয়েও বিএনপি বরাবরই ছিল অনাস্থায় অনড়। যদিও ওই কমিশন গঠনের সময় বিএনপি’র দেওয়া নামের তালিকা থেকে একজন কমিশনার হিসেবে নিয়োগও পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে এও স্মরণ করা যেতে পারে, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এই প্রথম দেশে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করা হলো এবং সেই আইনের অধীনেই রাষ্ট্রপতি এই কমিশন গঠন করলেন। নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়নের জন্য কয়েক মাস আগে পর্যন্তও বিএনপিই সবচেয়ে সোচ্চার ছিল। কিন্তু এই আইন প্রণয়নের পর কোনও ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায়নি বিএনপির। কেবলই বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা কখনও ইতিবাচক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করে না, এসত্য সকলেরই জানা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এ দেশের রাজনীতিতে যে ধারা চলে আসছে, তাতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কখনও কোনও প্রশ্নেই ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে না।

এরকম রাজনৈতিক প্রতিকূল বাস্তবতায় গঠিত নির্বাচন কমিশন কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সুখের বিষয়, দক্ষ প্রশাসক সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন- চ্যালেঞ্জ ছাড়া কোনও কিছু নেই। সেই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই আমাদের সফলতার পথে এগিয়ে যেতে হবে। সেজন্য তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন। সর্বশেষ গত বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন ইসির ওপরে কোনও রাজনৈতিক চাপ নেই। পরিস্থিতি এরকম হলে তো ভালো খবরই।

কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য মোটেই সুখকর নয়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনতে হলে ইসিকে যেমন আস্থা অর্জন করতে হবে, তেমনি সরকার ও বিরোধীদলের সংশ্লিষ্ট সকল রাজনীতিকদেরকেও ইসিকে সহযোগিতা করতে হবে।  নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেওয়ার জন্য নবনির্বাচিত ইসি’র সামনে সুযোগ রয়েছে। বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার আস্থা অর্জনের পথে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা রয়েছে কমিশনের সামনে। সেগুলো হলো দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সমস্ত দৃশ্য-অদৃশ্য প্রভাব এড়িয়ে নিরপেক্ষভাবে আসন্ন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন, দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা পরিষদ নির্বাচন এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ পৌরসভা ও বাকি ইউপি নির্বাচনসমূহ এমনভাবে অনুষ্ঠান করতে হবে যাতে এই নির্বাচনগুলোতে সত্যিকারের জনমতের প্রতিফলন ঘটে। স্থানীয় নির্বাচন যেন রক্তপাতের গ্লানি থেকে মুক্ত হয়, সে জন্য নির্বাচনকালীন শৃঙ্খলা রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকার সহযোগিতা না করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে পাওয়া কঠিন হবে।

এ প্রসঙ্গে বিদায়ী হুদা কমিশনের কথা এসেই যায়। তারা সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়েছে মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে পৌরসভা এবং ইউপি নির্বাচনে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসবমুখরতায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা, সেই নির্বাচনগুলো সংঘাত-সংঘর্ষে সারা দেশে এমন রক্তপাতের ঘটনা ঘটিয়েছে, যার নজির নেই। নির্বাচনে ছোটখাটো সহিংসতার ঘটনা ঘটে না তা নয়। অতীতে প্রতিটি নির্বাচনেই কিছু-না-কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে কিন্তু গত দু’বছরে যে চিত্র সারাদেশে দেখা গেছে, যে বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছে, তা নজিরবিহীন। অবশ্য এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে কমিশন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল কিনা এই প্রশ্ন থেকেই যায়। পারলে তো এত রক্তপাত হবার কথা ছিল না।

নির্বাচন কমিশন সরকার অনুগত কোনও প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। যে যে এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেসব এলাকার নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক যাবতীয় ক্ষমতাতো কমিশনের করায়ত্তেই থাকার কথা। বাংলাদেশের সংবিধান তাদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে। যদি সেই ক্ষমতা বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে না থাকার কারণে ওইসব নজিরবিহীন সহিংসতার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডহীনতাই প্রকটভাবে ধরা পড়ে। আশাকরি নবগঠিত কমিশন সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন এবং নির্বাচন যেসব এলাকায় হবে, সেসব এলাকার সবকিছু কমিশনের নিয়ন্ত্রণে নিয়েই ভোট গ্রহণ শুরু করবেন। আইন- শৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনি এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা অটুট রাখতে কমিশনের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাধ্য। তাদের কেউ কমিশনের অবাধ্য হলে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আসবার কথা।

আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরে যত নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, কোনও কমিশনই বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। যেখানে যখনই যারা পরাজিত হয়েছেন, সেখানেই তারা কমিশনকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করেছেন! আবার অনেক সময় মাগুরা উপ নির্বাচনের মতো কলঙ্কিত ঘটনাও নিরব দর্শকের মতো নির্বিকার প্রত্যক্ষ করেছেন কোনও কোনও কমিশন। এসব ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু। কিন্তু সেই শিক্ষা খুব কমই গ্রহণ করি আমরা।

আরেকটি শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা কিন্তু রেখে গেলো হুদা কমিশন। সেটা খুবই দুঃখের বিষয়। অতীতে কখনও নির্বাচন কমিশনের ভেতরের কোনোরকম মতবিরোধ বাইরে আসেনি, যা এসেছিল হুদা কমিশনের আমলে। এমনকি এই কমিশন যেদিন বিদায় নিচ্ছে সেদিনও একদিকে সংবাদ সম্মেলন করে কথা বলছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, অন্যদিকে দলীয় রাজনৈতিক নেতার মতো কমিশনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে সাংবাদিকদের লিখিত বক্তব্য দিচ্ছেন এক কমিশনার। এটি যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে জনাব  হুদার অনেক বড় ব্যর্থতা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কমিশনের ভেতরে অনেক বিষয়ে মতবিরোধ হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হবে। কিন্তু তা নিয়ে দলীয় কর্মীর ভূমিকা কোনও সদস্যই নিতে পারেন না। এতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয়। এ ব্যাপারেও বর্তমান কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। ওই কমিশনারকে সংযত করার দায়িত্ব ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের। যাইহোক বর্তমান কমিশন এসব ব্যাপারে নিশ্চয়ই সতর্ক থাকবেন এবং ভিতরের বিরোধ ভিন্নমত ভিতরে রাখতে সর্বাত্মক প্রয়াস পাবেন, এই আমাদের প্রত্যাশা।

নতুন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সবাইকে আস্থায় আনা এবং আস্থা অর্জন করা। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নিশ্চয়ই সে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিএনপিসহ সকল বিরোধী দলের অংশগ্রহণে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ভালো নির্বাচন হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও অগ্রসর হতে হবে। জেদ ধরে কোনও কিছু অর্জন করা যায় না, সবকিছুই সম্ভব আলাপ আলোচনার টেবিলে। সে ধরনের সংলাপের ব্যবস্থা করা যায় কিনা নির্বাচন কমিশন তাদের এখতিয়ারে থাকলে ভেবে দেখতে পারেন। অতীতেও নির্বাচন নিয়ে নানান সংকট দেখা দিয়েছে কিন্তু তার নিরসন হয়েছে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়েই। অতীতে এ রকম অচলাবস্থা নিরসনে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে আস্থা ফিরিয়ে এনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছিলেন। এবারও চলমান অচলাবস্থা নিরসনে সরকারি দলকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। প্রয়োজনে কিছু ছাড়ও দিতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকেও নমনীয় মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের যুগ বহু আগে শেষ হয়ে গেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতায় আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার চেয়ে বাস্তবতায় মাটিতে অবশ্যই থাকতে হবে আমাদের।

অন্যদিকে দেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডটাও শক্ত থাকা যেমন জরুরি, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও উদার গণতান্ত্রিক আচরণ জরুরি। অতীতে আমরা দেখেছি নির্বাচনের মাঠে প্রচারে না থেকেও শুধু মনোনয়ন বাণিজ্যের অর্থ কুড়ানোয় ব্যস্ত থেকে পরাজয়ের পর ‘ভোট কারচুপি’র জন্য ইসিকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের মাঠ ছেড়ে দিলে কে না নেবে অনৈতিক সেই সুবিধা? আশাকরি সুষ্ঠু গণতন্ত্রের স্বার্থে সবাই কিছুটা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হবেন।

দেশের গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে একটি অবাধ সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানে। কেবল দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই পারে সমাজের নানারকম অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা নিরসনে সহায়ক ভূমিকা নিতে। অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি দেশের গণমাধ্যমগুলো সংকটকালে কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই না পালন করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাংবাদিকতার সেই মহান দায়িত্ব সঠিকভাবে এখন আর সবাই পালন করেন না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র কিংবা চক্রান্তের সঙ্গেও দেশের কোনও কোনও গণমাধ্যম জড়িয়ে যায়! বিস্ময়কর হলেও এটাই নির্মম বাস্তবতা।

যাই হোক, সব কথার বড় কথা, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের জন্য সবরকম প্রভাবমুক্ত থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতেই হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পূরণ নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার বহির্ভূত। সেটি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের বোঝাপড়ার বিষয়। বিতর্কিত ওই বাতিল ব্যবস্থা ফিরে আসবে, এমন ধারণা করাও এখন সত্যি কঠিন। কেননা ওয়ান ইলেভেন-পরিস্থিতি সৃষ্টিতে যে ভয়ঙ্কর ভূমিকা পালন করেছিলেন চারদলীয় জোট সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, তার তত্ত্বাবধায়ক সরকার,  ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবেই তা লিপিবদ্ধ থাকবে। একদিকে বিতর্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আজিজকে বিএনপির  রাখতেই হবে, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সংঘাতমুখর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর খোদ রাষ্ট্রপতিকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বানিয়ে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল চারদলীয় জোট সরকার, তারই  বিষফল ওয়ান ইলেভেন এবং তিন মাসের জন্য গঠিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ক্ষমতা দখল করে রাখা। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী এবং বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে পুরে দেশকে বিরাজনীতিকরণের যে ভয়ঙ্কর অপচেষ্টা, তা কি কেউ কোনদিন ভুলতে পারবে?

তারও আগে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে মারাত্মক পক্ষপাতদুষ্টতার পরিচয় দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে গেলেন ২০০১ সালে, তার পরিণতি দেশে কোন পরিস্থিতি ডেকে এনেছিল, তা কারও অজানা নেই। রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল নাসিম বীরবিক্রমকে হঠাৎ বরখাস্ত করে দিয়ে যেভাবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিপদে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাতে কারো ভুলে যাবার কথা নয়।

এতকিছুর পরে যখন জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যখন যৌক্তিক কারণেই বিলুপ্ত  করা হয়েছে, তারপর এর আর পুনরুত্থানের স্বপক্ষে কোনও যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। হতে পারে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় না গিয়েও সর্বজনগ্রাহ্য এমন একটা ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা, যাতে একটা সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে।

এর সবকিছুই নির্বাচন কমিশনের বাইরের ব্যাপার। নির্বাচন কমিশনকে সততার সঙ্গে, তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্বই বিশ্বস্ততার সঙ্গে  পালনই কেবল সফলতার পথ দেখাতে পারে। কোনোরকম রাগ- অনুরাগ, মোহ বা চাপমুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালনেই তা সম্ভব। প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে করা গেলে বিরোধী দলেরও আস্থা ফিরে আসবে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচনানুষ্ঠান ছাড়াও আরও অনেক জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে নতুন ইসিকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করা, সংসদীয় আসনের সীমানা বিরোধ মীমাংসার মতো জটিল কাজ সম্পন্ন করা এবং নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নজিরবিহীন বিজয়ের অপসংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসার পথ এই কমিশনকে উদ্ভাবন করতে হবে।

আশা করি নতুন কমিশন এই কঠিন চ্যালেঞ্জিং পথ পাড়ি দিয়ে বিরোধী দলসহ সবার আস্থায় গিয়ে ভালো নির্বাচন উপহার দিয়ে অতীতের কলঙ্কমোচন করবেন।

লেখক: একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ, সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সীতাকুণ্ডে আগুন: ঈদের আগে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না অধিকাংশ হতাহত
সীতাকুণ্ডে আগুন: ঈদের আগে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না অধিকাংশ হতাহত
জোর করে গরু নামাতে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেফতার ৩
জোর করে গরু নামাতে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেফতার ৩
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ