X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

শ্রেণিহীন আনন্দের আলপনা!

আপডেট : ০৬ মে ২০২২, ১৮:৪৪

আহসান কবির ছয় বছরের এক শিশুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম ঈদের মজা কোথায়? সে তার মায়ের মোবাইল এনে ট্রেন আর লঞ্চ বোঝাই  অসংখ্য মানুষের ঈদযাত্রার ছবি দেখিয়ে বললো– আমি ট্রেনের ছাদে চড়ে নানাবাড়ি যেতে চাই! আমি বললাম মাকে বলেছো? সে জানালো তার নানার বাড়ি বরিশাল। সেখানে নাকি ট্রেনলাইন নাই। তাই মা তার শখ পূরণ করতে পারেনি। এরপর সে কানে কানে বললো– মা কী মিথ্যে বলেছে?

মাঝে মাঝে ট্রেনের ছাদে চড়ে পথশিশুদের ভ্রমণ করতে দেখা যায়। এই ভ্রমণের ভেতর কী অনাবিল আনন্দ আছে? ঈদের সব আনন্দ কী শৈশবেই থেকে যায়? শৈশব থেকে পরিণত বয়সে পরিভ্রমণ করতে করতে আনন্দ কি রঙ হারাতে থাকে? সমস্যাসংকুল আফগানিস্তানের ঈদ উৎসবের একটা পর্ব ডিম ছোড়াছুড়িতে এসে পৌঁছায়! এই আনন্দের নাম ‘তাখখাম জাঙ্গি’। ‘তাখখাম জাঙ্গি’র শুরুতে একটা খোলা মাঠে অনেকেই সমবেত হয়। এরপর একজন আরেকজনের দিকে ‘সিদ্ধ ডিম’ ছুড়ে মারে। আফগানিস্তানের এক বিখ্যাত কবির কবিতার লাইন এমন– স্বাধীনচেতা আফগানদের বুলেট আর ডিমের অভাব হয় না।

একসময় সৌদি আরবের নাগরিকদের নাকি অনেক অভাব ছিল, তেলের যুগ আসার পর তাদের আর অভাব নেই। তাই অবস্থাসম্পন্নরা ঈদের দিন এলে বাড়ির সামনে চাল বা মিষ্টান্ন রেখে দেয়। এখনও যাদের অভাব আছে তারা এই চাল নিয়ে যায়, মিষ্টান্ন খেয়ে ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করে। চীনে মুসলিম অধ্যুষিত কিছু কিছু এলাকায় নাকি সরকারিভাবে ভেড়ার মাংস বিলানো হয়। জিন জিয়াং নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাইনিজ খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। ‘জিয়াং’ চাইনিজ এক খাবারের নাম, যা আটা বা ময়দা ও মিষ্টান্ন দিয়ে তৈরি করা হয়। যারা জিয়াং বা এই সরকারি মাংস খায় তাদের প্রার্থনা আর সৌদিয়ানদের প্রার্থনা বা আনন্দের সুর কী এক?

পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে মানুষের আনন্দের সুর বা রঙ নাকি এক। আনন্দের কোনও শ্রেণি নেই বিধায় বলা হয় ধর্ম যার যার উৎসব সবার। ঈদ উপলক্ষে সৌদি নাগরিকরা যে জোব্বা পরেন তার নাম ‘কান্দর’, প্রায় একই রকম ঈদ পোশাকের ইন্দোনেশিয়ান নাম হচ্ছে ‘বাজুইকোকো’ আর মরক্কোর পুরুষরা পরে ‘জেলাবা’! বহুদিন থেকে বাংলাদেশের পুরুষরা যে পোশাক পরেন তার আলাদা কোনও নাম নেই। কেউ পাঞ্জাবি, কেউ পাকিস্তানি বা আফগানদের আদলে ‘কাবলি’ আবার কেউ কেউ শার্ট, ফুলপ্যান্ট বা ফতুয়াও পরে থাকেন। সব ‘ঈদের পোশাকের’ অন্তর্ভুক্ত আর আনন্দ মনের অন্তর্ভুক্ত। এই আনন্দ আনে সুখ। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি কারা?

আমেরিকায় একবার এ বিষয়ে জরিপ করা হয়েছিল। চার জন মানুষকে চিহ্নিত করা হলো, যারা নিজেদের সবচেয়ে বেশি সুখী বলে দাবি করেছিলেন। তাদের আমন্ত্রণ জানানো হলো; চার জন এসে বললেন তারা সপ্তাহের সাত দিন ঈশ্বরের নামে চাঁদা তোলেন। তাদের আলাদা দানবাক্স এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। কেউ চাইলে নগদেও দিতে পারেন। প্রতি রবিবার তারা আসেন উপাসনালয়ের সামনে। ঈশ্বরের নামে তোলা চাঁদা তারা সুন্দর এক মখমলের চাদরের ওপর রাখেন। এরপর ঈশ্বরের উদ্দেশে প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা শেষে চার জন চাদরের চারকোনা ধরে ডলারগুলো শূন্যে ছুড়ে মারেন। ঈশ্বর যা রাখেন তা তো রাখলেনই! বাকিটা মাটিতে এসে পড়লে ওই চার জন সব ডলার সমানভাবে ভাগ করে নেন।

বাংলাদেশে সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি কারা? কৌতুকের সুরে কেউ কেউ বলেন ঈদের চাঁদ দেখা কমিটির সদস্যরা। বছরে দুইবার ছাড়া তাদের চাঁদও দেখতে হয় না। আর চাঁদ দেখার জন্য যদি কোনও অর্থযোগ থাকে তাহলে তো কথাই নেই। ভাত ফোটার পরে যেমন উপচে পড়ার উপক্রম হয়, সুখও তখন তেমনি। সুখী মানুষরা আসলে হাতির মতো। হাতি রমন করলেও দূর্বাঘাসকে পিষে ফেলে, মারামারি করলেও তাই। দূর্বাঘাস চিরকালীন গরিব বা নিম্নবিত্তের প্রতীক।

সুখী মানুষের বাংলা গল্পে সুখী মানুষের গায়ের জামা থাকে না আর বিদেশি গল্পে যারা ঈশ্বরের নামে চাঁদা তোলেন তারাই ভালো থাকেন। ভাগাভাগিতে মনোমালিন্য না হলেই ভালো। হলে ভয়াবহ অসুবিধা। হোক সেটা ঢাকা কলেজ, নিউ মার্কেট কিংবা যেকোনও ধর্মীয় ফান্ড। আর সুখ নাকি বছরে দুই তিনবার আসে স্বজনের কাছে ফেরাতে। ঈদের ছুটি মানেই নাড়ির কাছে ফেরা। তাই ফিরতে হয় সব ভোগান্তি মাথায় রেখেই। কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নের অনেক উত্তর আছে। আসল উত্তর স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায়। দেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামের বাড়িকেই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে পরিচিত করতে ভালোবাসেন। চাকরি, ব্যবসা, পড়ালেখা বা কাজের জন্য হয়তো তারা রাজধানীতে আসেন। যেকোনও ছুটি বা পার্বণে তাই তারা যেতে চান স্থায়ী ঠিকানায়। কত মানুষ ঈদ পার্বণে ঢাকা ছাড়ে? একটা জনপ্রিয় দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখের ভেতর। মোবাইল ফোনের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা কমপক্ষে ৬৫ লাখ। একসঙ্গে এত মানুষ বাড়ি ফেরে এটা ভাবলেই মনে হয় এই উৎসবের নাম ঘরে ফেরা উৎসব। সব ঝক্কি-ঝামেলা মাথায় নিয়ে, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কালোবাজার থেকে বেশি দামে টিকেট কিনে এই যে ঘরে ফেরা সেসব মা, স্ত্রী বা সন্তানের মুখের হাসির কাছে একেবারে ম্লান। রাস্তা ভাঙ্গা থাকুক, চব্বিশ ঘণ্টা রাস্তা বা ফেরির জ্যাম থাকুক, ঈদের নামাজের আগে স্থায়ী ঠিকানার বাসায় পৌঁছাতে পারলেই হলো। বাঙালির প্রাণশক্তি এই পরিবারে। শিশুর জন্য মার রঙ্গের জামা, স্ত্রী বা মার জন্য যে শাড়ি, উৎসবের আনন্দের রঙ সেটাই।

উৎসব আসুক, যার যা সামর্থ্য তার ভেতর উৎসবের রঙ নিয়ে আনন্দের আলপনা আঁকুক মানুষ। যত দিন যাবে তত ঘরে ফেরা মানুষের সংখ্যা বাড়বে। ঘরে ফেরা মানুষের মতো আনন্দের রঙ আরও উজ্জ্বল হোক। এই আনন্দ একদিন স্মৃতি হবে, শৈশবের আনন্দ পরিণত বয়সে স্মৃতি হবে, ঘরের কোনও এক সিনিয়র সদস্য শৈশবে থাকা কোনও এক সদস্যকে তার আনন্দের বিবরণ দেবেন। বলবেন ঢাকার ঈদে একসময়ে হাতি ঘোড়া পালকিসহ রাস্তায় নামতো নবাব বাড়ির লোকজন। মিছিল হতো রঙিন! তারা রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে মিষ্টি বা সেমাই খেতে দিতেন। কারও গল্পে থাকবে ফেরিঘাটে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার স্মৃতি। স্মার্ট টিভিতে পছন্দের অনুষ্ঠান দেখতে থাকা কোনও এক নাতিকে তার বৃদ্ধ দাদা হয়তো বলবেন, আগে কাগজ কেটে তারা টেলিভিশন বানাতেন। সেই টেলিভিশনে ঈদ মোবারক লেখাটা ঘুরে ফিরে আসতো। বলবেন কাগজ কেটে কত কিছু বানিয়ে যে তারা ঘর সাজাতেন! মার হাতে বানানো পায়েস বা সেমাইয়ের স্বাদ তিনি এখনও মিস করেন।

ঈদের নামাজের পর যে কোলাকুলি তারপর বাসায় ফিরে সেমাই বা ফিরনি খাবার পর দবিরের মনে পড়বে ডেভিড বা আশীষের মুখ। দবির তাড়াতাড়ি খেয়ে যাবে ডেভিড আর আশীষের বাসায়। তাদের বাসায় এনে ফের খাওয়া দাওয়া, এরপর হয়তো পরিবারের সদস্যদের চোখ এড়িয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া। বাঙালির উৎসব সবাইকে নিয়ে, কখনোই আলাদা আলাদা বা স্বতন্ত্র নয়। হোক কোনও ধর্মের উৎসব, আনন্দের কোনও শ্রেণি থাকতে নেই। থাকতে নেই বন্ধনহীনতা। ছুটি পেলে তাই উৎসবের এনার্জি নিয়ে শত ভোগান্তি সয়ে ঘরে ফিরুক দবিরেরা, খুঁজে বের করুক ডেভিড আর আশীষদের।

উৎসবের রঙটা থাকুক সর্বজনীন!


লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
গৌরবের পদ্মা সেতুএই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী
এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ