X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
২০ আষাঢ় ১৪২৯

সিইসি কবে চা খেতে খেতে নির্বাচন করতে পারবেন?

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ১৮:০৮

চেয়ারে বসে চা খেতে খেতেই নির্বাচন শেষ করে ফেলতে পারলে খুশি হতেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। তাতে তাঁর শরীরে কোনও স্ট্রেস (চাপ) পড়তো না। প্রেশার বাড়তো না। তাঁর ভাষায়, এটা তিনি পারতেন, যদি তিনি নিউজিল্যান্ড কিংবা বিলেতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হতেন।

সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে সিইসি বলেছেন, তাঁরা (ইসি) চান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। যদিও অনেক সময় ভোটে বড় ধরনের সহিংসতা হয়। একজন লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের নির্বাচনের সংকট নয়, সংস্কৃতির সংকট।’

মুশকিল হচ্ছে, জনাব হাবিবুল আউয়াল এমন একটি দেশের সিইসি, যেখানে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল তো বটেই, সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন ও সংশয়ের অন্ত নেই। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের ওপরে মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে; গণহারে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতীক পাওয়া মানেই তার বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তাতে অবশ্য সিইসি পায়ের উপরে পা ফেলে চেয়ারে বসে বসেই নির্বাচনটা করে ফেলতে পারেন। কারণ যখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে যান কিংবা প্রধান প্রধান দলগুলো ভোটে অংশ না নেয়, তখন নির্বাচন কমিশনের কাজ অনেক কমে যায়। সুতরাং তখন সিইসি চাইলে চেয়ারে বসে চা খেতে খেতেই নির্বাচন করতে পারেন। কিন্তু দেশের মানুষ তো বটেই, কমিশন নিজেও কি এমন একটি নির্বাচন প্রত্যাশা করে যেটি অংশগ্রহণমূলক নয়, যে নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হয় না কিংবা যে নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পরেই ভোটাররা জেনে যায় যে কে নির্বাচিত হচ্ছেন? নিশ্চয়ই সিইসিও এটি চান না।

নির্বাচন কমিশন যে এরকম নির্বাচন চায় না সেটি পরিষ্কার করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান। শনিবার মাদারীপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট দিনেই হবে। রাতে কোনো ভোট হবে না।’ প্রশ্ন হলো, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান কি বুঝাতে চেয়েছেন যে, গত জাতীয় নির্বাচন রাতে হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেশবাসী জানে। অতএব সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং বলা ভালো, নির্বাচন কমিশন যে একটি অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চায়, সেটিই আশার কথা।

গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরে বর্তমান কমিশনের সামনে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা আগামী ১৫ জুন কুমিল্লায়। এদিন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। ফলে অনেকেই মনে করছেন এটি বর্তমান কমিশনের জন্য একটি টেস্ট কেস। তারা সত্যিই কতটা নিরপেক্ষ ও সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারবেন, তার একটা মহড়া হয়ে যেতে পারে।

আসলে কি তা-ই?

স্মরণ করা যেতে পারে, বিগত নুরুল হুদা কমিশনও এই কুমিল্লা সিটি নির্বাচন দিয়ে শুরু করেছিল এবং ওই নির্বাচনে তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা বেশ প্রশংসিতও হয়েছিল। কিন্তু এরপরে তাদের অধীনে যেসব স্থানীয় সরকার এবং বিশেষ করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাদের অধীনে যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেটি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওই নির্বাচনে তারা সেই নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সুতরাং, এবারও সেই কুমিল্লায় একটা ভালো ওপেনিং হলেও যে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনটি বর্তমান কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং সর্বোপরি গ্রহণযোগ্য করতে পারবে, তার গ্যারান্টি দেওয়া কঠিন।

স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা কাউন্সিলর হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তারা সাধারণত স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হন এবং দলীয় প্রতীকের বাইরেও তাদের ব্যক্তি ইমেজ এবং এলাকায় প্রভাব-প্রতিপত্তি সেখানে বড় ভূমিকা পালন করে। ফলে তাদের কারণেই নির্বাচনে একটা টানটান উত্তেজনা থাকে। মেয়র প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন হয় না। সুতরাং সরকার চাইলেই এই নির্বাচনগুলোয় কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ না করেও থাকতে পারে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যক্তির চেয়ে দল তথা দলীয় প্রতীক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে বলা হয়, ‘ভোট ফর বানানা ট্রি’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি নয়, কলাগাছকে ভোট দিন। কলাগাছ এখানে প্রতীকী। অর্থাৎ ব্যক্তি যিনিই হোন না কেন, জাতীয় নির্বাচনে কলাগাছই ফ্যাক্টর। অতএব এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ থাকা তথা মেরুদণ্ড সোজা করে থাকা খুব কঠিন। চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে নির্বাচন করে ফেলা আরও কঠিন। যদি সত্যিই সেখানে নির্বাচনের আমেজ থাকে। যদি সেখানে প্রধান প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকে।

নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য বেশ আশাজাগানিয়া। তিনি বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। বর্তমান কমিশনে যারা আছেন সবাই জনগণের অধিকার জনগণকে প্রয়োগ করতে দেবেন। যত ধরনের বাধা বিপত্তি আসুক না কেন তারা তা প্রতিহত করবেন। যদি প্রতিহত করতে না পারেন তাহলে চলে যাবেন।

মূলত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদের মেরুদণ্ড এরকম সোজা করেই কথা বলতে হয়। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, তারা শেষ পর্যন্ত মেরুদণ্ডটা এরকম সোজা রাখবেন এবং দিনের ভোট সত্যিই দিনে হবে এবং মানুষ তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাতে পারবে। সর্বোপরি ভোটের ফলাফল সব দল নেবে তথা ভোটটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটও অনেক সময় গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে যদি সেটি অংশগ্রহণমূলক না হয়। কারণ ভোট গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বেশ কিছু মাপকাঠি রয়েছে। সেইসব মাপকাঠি ও মানদণ্ডে নির্বাচনটি যতক্ষণ না উত্তীর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ ওই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলার সুযোগ নেই। সুতরাং, আগামী ১৫ জুন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে বর্তমান নির্বাচন কমিশন যদি টেস্ট কেস হিসেবে গ্রহণ করে এবং তারা যদি মর্নিং শোজ দ্য ডের মতো এই নির্বাচনটি অবাধ সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য করতে পারে, তাহলে অন্তত বোঝা যাবে যে আগামী দিনগুলোয় তারা নিজেদের মেরুদণ্ড কতটা সোজা রাখতে পারবেন। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারলেও জাতীয় নির্বাচনে গিয়ে সেটি কতটা সোজা থাকবে, তা এখনই বলা মুশকিল। অন্তত বিগত নুরুল হুদা কমিশনের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।

স্মরণ করা যেতে পারে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছিলেন, দলীয় সরকারের অধীনে থেকেও যে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব, একাদশ জাতীয় নির্বাচন সেই ইতিহাস সৃষ্টি করবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেশি-বিদেশি সকল স্তরের সংস্থার পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। এ বছর নির্বাচনের পরিবেশ হবে ভিন্ন। আমাদের দেশে কখনও নির্বাচন হয়েছে রাষ্ট্রপতি শাসিত নির্বাচন, কখনও সেনাবাহিনী, কখনও কেয়ারটেকারের অধীনে। কিন্তু অন্যান্য নির্বাচন থেকে এই নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ সংসদ ও সরকার বহাল রেখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৪ সালে এমন একটি নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনে সব দল অংশ নেয়নি। আমরা এবার আনন্দিত যে, এই নির্বাচনে সব দল অংশ নিতে যাচ্ছে। সে কারণে আপনাদের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেছে এবং ভেজালমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।’

কিন্তু সাবেক সিইসির এই ইতিহাস গড়ার প্রতিশ্রুতি যে দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে কী ইতিহাস নির্মাণ করেছিল, তা দেশবাসী জানে। আসলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে সেটা রক্ষা করা কঠিন। অন্তত জাতীয় নির্বাচনে। অতএব বর্তমান কমিশনও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কী ইতিহাস গড়বে—তা এখনই বলা মুশকিল। সিইসি সত্যিই চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে নির্বাচনটি সম্পন্ন করে ফেলবেন নাকি কাজের প্রেশারে চেয়ারে বসারই সময় পাবেন না—সেটি নির্ভর করবে অনেকগুলো ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’র উপরে।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
৩ ঘণ্টা ধরে স্টেশনে আটকা ‘দোলনচাঁপা’
৩ ঘণ্টা ধরে স্টেশনে আটকা ‘দোলনচাঁপা’
রফতানিতে রেকর্ড হলেও বেড়েছে ঘাটতি
রফতানিতে রেকর্ড হলেও বেড়েছে ঘাটতি
সরকারি হাসপাতালে ঢুকে নিয়ে গেলো ১৪ লাখ টাকা
সরকারি হাসপাতালে ঢুকে নিয়ে গেলো ১৪ লাখ টাকা
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ ঘোষণার প্রস্তাব রুশ আইনপ্রণেতার
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ ঘোষণার প্রস্তাব রুশ আইনপ্রণেতার
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ