X
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২
২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

তেলে আগুন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
১০ আগস্ট ২০২২, ১৬:৩১আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২২, ১৬:৩১
বাজারে জিনিসের দামের সঙ্গে এমনিতেই নিজেদের আয় মিলাতে সারাক্ষণ অঙ্ক করতে হচ্ছিল আমজনতাকে। গত শুক্রবার মধ্যরাতে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশের মতো বাড়ার পর অস্বস্তির সঙ্গে জীবনের অনিশ্চয়তা যুক্ত হলো। তাদের জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করার ইঙ্গিত দিয়ে কোনোটাই বাদ গেলো না, ডিজেল, অকটেন আর পেট্রোলের দাম রেকর্ড ছুঁয়ে ফেললো।

প্রথম প্রভাবই এলো নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী পরিবহন খাত থেকে। চার বা দু’চাকার যানবাহনের মালিকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ! গণপরিবহন সরকারকে চাপে ফেলে বাড়তি ভাড়া ন্যায্য করে নিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে তার চেয়ে বেশি। জ্বালানি তেলের দাম দৈনন্দিন জীবনে থাবা বসিয়েছে। প্রতিদিনের খাবারে সামান্য কিছু জোগাড় করা এখন কষ্টসাধ্য। কারণ, পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আর সেই খরচের কড়ি তো গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এবং সরকারের পক্ষ থেকে আরও অনেকে নানা তথ্য দিচ্ছেন দাম বাড়ার পক্ষে। অনেকে আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি, ইংল্যান্ড কিংবা ইউরোপের দেশগুলোর দামের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের দামের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করছেন। এগুলোতে হয়তো যুক্তি আছে। কিন্তু মানুষ মানছে না। মানুষ মানছে না, কারণ বিশ্ববাজারে এখন জ্বালানি তেলের দাম কমছে। উন্নত দেশে বাড়ছে, কিন্তু সেখানে কী পরিবহন নৈরাজ্য হয়? সেখানকার মানুষকে দিনশেষে পেট চালানোর দুশ্চিন্তা করতে হয়? সেখানকার সরকার যত প্রকার নাগরিক সুবিধা দেয় সেটা কি এ দেশে দেওয়া হয়?

তেলের এমন নজিরবিহীন দৌড়ে কার্যত হতবাক মানুষ। প্রশ্ন উঠছে, করোনার ধকল কাটিয়ে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে সংগ্রামরত অবস্থায় এই অভিঘাত মানুষের জন্য কি আরও এক আঘাত না? সব জিনিস ও সেবার দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতিকে করবে নিয়ন্ত্রণহীন। সে ক্ষেত্রে এখনই শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ করে দামে রাশ না-টানলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটাই অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

কোনও কিছু হঠাৎ করে করলে এবং এত বেশি চাপ দিলে মানুষের প্রস্তুতির সময় থাকে না। গত শুক্রবার জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে মানুষ প্রস্তুতির সময়ও পায়নি। মানুষকে এমন অবজ্ঞা কোনও শাসন প্রণালি হতে পারে না। মানুষকে সময় দিলে মানুষ খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। সরকার যখন দেশজুড়ে পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলো মানুষ কিন্তু কষ্টটা করতে মেনে নিলো। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছে পুরো পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে সমস্যাটা আমাদের কাছেও চলে এসেছে। কিন্তু এক রাতের মধ্যে ৫০ ভাগ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এক লাফে এত না বাড়িয়ে ধাপে ধাপেও বাড়াতে পারতো সরকার।

ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৩০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। এখন অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৫ ডলার। এ দামটা আরও নামতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে নামছে, তাতে দু-তিন মাসের মধ্যে তা ৮০ ডলারের কাছাকাছিও চলে আসতে পারে। সেটা সহনীয় মূল্য। তাই আমার কাছে মনে হচ্ছে সরকার আরেকটু অপেক্ষা করতে পারতো। বিশ্ববাজারে অনেক বেশি মূল্য, সেই যুক্তি তাই এখন জনগণ মানছে না।

এ কথা মানতেই হবে যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকেই অস্থির করে তুলেছে। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্তসমূহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কম। নীতির প্রশ্নে আমরা হয়তো সঠিক ছিলাম না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা গ্যাস অনুসন্ধান করলাম না, উত্তোলন করলাম না। বরং এলএনজি আমদানিতে উৎসাহিত হলাম। সেটাই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন। আত্মনির্ভরশীলতার নীতি না নিয়ে আমরা পরনির্ভরশীল আমদানি নীতিতে অটল থেকেছি, ফলে এখন সংকট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর লোকসান কমানোর যুক্তিটাও গোলমেলে। করোনা মহামারির সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য যখন অনেক কম ছিল, সে সময় দেশের বাজারে দাম কমানো হয়নি। তখন অনেক লাভ করেছে বিপিসি। সিরিয়া যুদ্ধের সময় যখন জ্বালানি তেলের দাম তলানিতে ঠেকেছিল, তখনও বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি দাম তেল কিনেছে। গত সাত বছরে বিপিসি ৪৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। সেটা তো জনগণেরই টাকা। বিপিসির সেই লাভের টাকাটা যদি ভর্তুকিতে ব্যবহার করা হতো, তাহলে তো জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যেতো। এছাড়া বিপিসি এত বছরেও কেন শোধনাগার বাড়াতে পারলো না, সেই জবাব নেই। বিপির অদক্ষতাকে কেন জনগণের পকেট থেকে অর্থায়ন করতে হবে সেটাও জানা যাচ্ছে না। সরকার যে শুল্ক কর নেয় বিপিসি থেকে সেটা কমালেও কি পারতো? বিপিসির ওপর একক নির্ভরশীলতা না রেখে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে আমার মনে হয় প্রতিযোগিতা আসতো, দামেও একটা প্রভাব আসতো। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ পদ্ধতির পরিবর্তন করে যখন বিশ্ববাজারে বাড়বে তখন বাড়ানো, যখন কমবে তখন কমানোর অটোমেটিক পদ্ধতি করা প্রয়োজন। সরকার ভাবতে পারে, আন্তর্জাতিক মূল্যস্তরের সঙ্গে শুল্কের পরিমাণের ওঠানামার একটি নীতি বেঁধে দেওয়া যায় কিনা।

দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও মধ্যবিত্তের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র অনেক অর্থনৈতিক খাতের উদ্যোক্তারা অত্যধিক চাপে পড়বে। তাদের জন্য সরকার কী করবে পরিষ্কার করে বলা দরকার। কৃষি খাতে পরপর দুটি বড় সিদ্ধান্ত এসেছে। সারের মূল্যবৃদ্ধির পর ডিজেলের দামও এক ধাপে অনেকটা বাড়লো। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সেচে একটা বড় খরচ বেড়ে যাবে। অনেকে কৃষি কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। তাই অন্তত ডিজেলের দাম পুনর্মূল্যায়ন করা যায় কিনা ভাবা দরকার। কৃষক ডিজেলে ভর্তুকি না পেলে কৃষি খাতে বড় ধাক্কা আসবে। সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা এখন– সরকার মুখ তুলে তাকাবে আমজনতার দিকে? করের বোঝা কমিয়ে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষা করবে আমাদের? নাকি সে আশা দূরস্থ?

লেখক: সাংবাদিক।
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে ‘ভুল তথ্য দিয়েও’ উত্তীর্ণ, নিয়োগ বাতিলের দাবি
পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে ‘ভুল তথ্য দিয়েও’ উত্তীর্ণ, নিয়োগ বাতিলের দাবি
মার্চে ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ 
মার্চে ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ 
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ