X
বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
১৯ মাঘ ১৪২৯

বিদ্যুৎ না পেলে সমালোচনা কিন্তু থাকলে প্রশংসা নেই কেন?

লীনা পারভীন
২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৯:২৭আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ২১:০৫

আমাদের দেশের মানুষের মানসিকতা এক অদ্ভুত যন্ত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এই মানসিকতার আসল পরিচয়টা পাওয়া যায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে। এই যে ধরেন, সরকার যখন ঘোষণা দিলো যে জ্বালানি সমস্যার কারণে দেশে লোডশেডিং হবে তখন কিন্তু আমরা সরকারকে তুলাধুনা করতে ছাড়ি নাই। শতভাগ বিদ্যুতের দেশে কেন লোডশেডিং হবে এমন প্রশ্ন তখন মুখে মুখে। বৈশ্বিক নির্ভরশীলতাও যে একটা বড় কারণ হতে পারে এটাকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই আসেনি। কিন্তু ধরেন আজকে প্রায় এক মাসের ওপর হয়ে গেলো লোডশেডিং কমে গেছে বা অনেক জায়গায় তো একদম হচ্ছে না, এ নিয়ে কিন্তু কোনও কথা নেই। কোথাও একটা বাক্য লেখা হচ্ছে না সরকারকে প্রশংসা করে। আমার এলাকায় আমি লাস্ট কবে লোডশেডিং পেয়েছি গত দুই মাসে সেটা মনে করতে পারছি না।

২৪ নভেম্বর পত্রিকায় দেখলাম ডিপিডিসির কোনও এলাকায় এই মুহূর্তে লোডশেডিংয়ের কোনও শিডিউল নেই। তার মানে হচ্ছে বিদ্যুৎ যাবে না। আর ডেসকোর কোথাও কোথাও যেতে পারে। দুইটারই আপডেট জানতে তাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট করলাম। দেখলাম ডিপিডিসি বলছে, ‘এই মুহূর্তে ডিপিডিসি এলাকাতে কোনও লোডশেডিং নেই’। ডেসকোর কিছু এলাকাতে আছে, তবে কোথাও একবার আবার কোথাও দুইবারের সূচি আঁকা আছে গ্যান্ট চার্টে।

পাঠক, আমাকে ‘দালাল’ গালি দেওয়ার আগে কষ্ট করে একটু পড়েন আমি আসলে কী বলার চেষ্টা করছি। যুক্তিতে আসেন যে আমার এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা আছে কী নেই।

একটা সময় ছিল যখন এই দেশের বিদ্যুৎ আসতো। মানে আমরা বিদ্যুৎ কয়বার গেলো সেই হিসাব করতে অভ্যস্ত ছিলাম না। তাহলে কী ছিল হিসাব? আমরা গুনতাম কয়বার এলো আর কতক্ষণ থাকলো। এবং সেটাতেই আটকে গিয়েছিল আমাদের নিয়তি। কোন সেই সময়? আমি জানি সেই সময়টাকে এখন অনেকেই ঝাপসা মনে করতে চান। সেই সময়টায় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত। মনে আছে খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান মানুষের বিদ্যুতের টাকায় সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। বিদ্যুতের লাইন দেওয়ার বদলে কেবল খাম্বা পাওয়া যেত, যার কারণে তারেক রহমানের আরেক নাম ‘খাম্বা তারেক’। তখন দিনে তো হিসাবই থাকতো না আর রাতে বুঝতাম যে আমাদের অন্ধকার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই থাকা লাগবে। অবশ্য সেই আমলে আইপিএস, চার্জার লাইট, চার্জার ফ্যান, মোমবাতি আর হারিক্যানের ব্যবসা ছিল রমরমা। সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ সেগুলো ব্যবহার করে সমস্যা থেকে বাঁচতো।

সেই দিনগুলো এখন আমাদের কাছে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। একটি বিশাল প্রজন্ম এখন জানেই না একটা সময় এই বাংলাদেশে বিদ্যুতের কতটা সমস্যা ছিল। সরকারের কাজ মানুষের জীবনকে নিরবচ্ছিন্ন করা। সমস্যাযুক্ত করা নয়, মুক্ত করা। আর সভ্যতার উন্নয়নে বিদ্যুতের ভূমিকা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিএনপি-জামায়াতের অন্ধকার যুগ গিয়ে এখন আমরা শতভাগ বিদ্যুতের দেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশের কোথাও আর অন্ধকার নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এসেছে লক্ষণীয় উন্নতি। পরিসংখ্যান বলে ২০১৮/১৯ সালে এ দেশের মোট ৪৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পেতো। ২০২২-এ সেটা উন্নীত হয়েছে ১০০ শতাংশে। মাত্র ১৩/১৪ বছরে ৫৩ শতাংশ মানুষের ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার এই অর্জনকে আমরা কি কোনও অর্জনই মনে করছি না? এ নিয়ে খুব কম মানুষের মাঝেই উচ্চবাচ্য শুনেছি। সামাজিক মাধ্যমে কোথাও খুব একটা সুবিধাজনক কিছু পাইনি। গুজবকারীরা নিশ্চুপ থাকলেও সাধারণ মানুষের মাঝে এ নিয়ে কোনও আলোচনাই আসেনি।  

এই ব্যর্থতার কিছু দায় সরকারকেও নিতে হবে। তারা সঠিক সময়ে, সঠিক উপায়ে সঠিক ও উপযুক্ত তথ্যটুকু সরবরাহ করতে পারে না কোনও সময়েই। আর তাই তো গুজবকারীরা সহজেই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয় বারেবারে। বিদ্যুতের অগ্রগতি মানেই শিল্পের উন্নয়ন। আর শিল্পের উন্নয়ন মানেই অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার আগমন। এই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল কি সরকার একাই ভোগ করবে? সাধারণ মানুষের জীবনমানের যে উন্নয়ন হয়েছে বা হবে এর অবদান স্বীকৃতিতে বাধা কোথায়?

সরকার যখন জুলাই মাসে ঘোষণা দিলো বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট সূচি অনুযায়ী লোডশেডিং হবে তখন দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেলো চিৎকার আর গালিগালাজ। একটি গ্রুপ এ নিয়ে রীতিমতো সিরিজ বানিয়ে ট্রল শুরু করলো। ভাবখানা এমন ছিল যেন সরকার চুরি করে সেটা জায়েজ করছে। অথচ লোডশেডিংয়ের কারণও ব্যাখ্যা করা ছিল। আসলে বিষয়টা হচ্ছে, আমরা সবাই সবটা বুঝি কিন্তু মানতে চাই না। কোথায় যেন আমাদের মননে এক ধরনের বিষবৃক্ষ রোপণ করা আছে। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল একটি গ্রুপ কেবল শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে মানবে না বলে। সেই মানুষগুলোই আজকে সমাজে অস্থিরতার এক বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছে।

অস্বীকারের উপায় নেই যে এই সরকারের সবকিছুই ‘ওয়াও’ মাপের না। তাদের অনেক কিছুর সমালোচনা করার আছে। অর্থনৈতিক অর্জন যেমন আছে আবার তেমনি অর্জনের অপব্যবহারের বদনামও আছে। অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতাও কম নয়। সবকিছুকে ছাপিয়ে যে বেসিক জায়গাগুলো আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি নিশ্চিত করে সেগুলোর প্রতি যদি সুবিচার না করি তাহলে এই ব্যর্থতার দায় কার সেটি আমার কাছে পরিষ্কার নয়।

ব্যক্তিগতভাবে এই যে লম্বা লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে আমরা অতি অল্প সময়ে মুক্তি পেলাম সেটির জন্য আমি সরকারকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আপনি দেবেন কিনা সেটা নির্ভর করছে সমস্যা ও সমাধানকে আপনি কতটা চিনতে পারছেন।

লেখক: কলামিস্ট

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ফুলকপির মাঠে রঙিন হাসি
ফুলকপির মাঠে রঙিন হাসি
যে রেকর্ডে রোনালদোর চেয়েও এগিয়ে মেসি
যে রেকর্ডে রোনালদোর চেয়েও এগিয়ে মেসি
সবাইকে হিসাব করে চলার অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর
সবাইকে হিসাব করে চলার অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর
সাত পদে ১১৭ জনের সরকারি চাকরির সুযোগ
সাত পদে ১১৭ জনের সরকারি চাকরির সুযোগ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ