X
মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪
১১ আষাঢ় ১৪৩১

পহেলা বৈশাখ: যার বুকের ভেতর আগুন আছে

স্বদেশ রায়
১৪ এপ্রিল ২০২৩, ২১:৫১আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:৩৪

ভাষা ও ভূখণ্ডভিত্তিক বা আদর্শগত ও ঐতিহ্যভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলার জন্য প্রথম প্রয়োজন– ওই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর জন্য ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও অন্যান্য বিভেদের ঊর্ধ্বে বেশকিছু মিলনের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনোজাগতিক নবজাগরণ শুরু হয় তা মূলত রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে। ব্যক্তিজীবনে, নিজ শিক্ষায় এবং লেখায় রামমোহন রায় সকল ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের ঊর্ধ্বে থাকলেও ভারতে এই নবজাগরণের পীঠস্থান কলকাতাতেও তাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ভিত্তিক মিলন কেন্দ্রকে উচ্চ স্থান দিতে হয়েছিলো। ঈশ্বর সম্পর্কিত কোনোরূপ বিশ্বাস মনের ভেতর স্থান না দিয়ে একজন সম্পূর্ণ আধুনিক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কলকাতার হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের উৎসবের মাধ্যমে মিলনকেন্দ্র তৈরি করার জন্য তাকে কলকাতাতেই দুই হাজারের বেশি দুর্গা পূজার অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হতো। এর থেকে বোঝা যায়– ওই নবজাগরণ রাষ্ট্র, সমাজ বা ওই ভূখণ্ডের হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ধর্মের বেড়া ভেদ করে কোনও ঐক্যের বা মিলনের পথে আনতে পারেনি।

কলকাতার অপর বড় জনগোষ্ঠী মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাও তাদের নিজস্ব ধর্মীয় গণ্ডির ভেতরেই ছিলেন। তার প্রমাণ– রামমোহন-এর এ সময়ে ইংরেজরা ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চাইলে কলকাতার গণ্যমান্য মুসলিম ব্যক্তিত্বগণ ইংরেজদের দ্বারা আলাদাভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন।

বঙ্গদেশে ও সমগ্র ভারতে জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এইভাবে আধুনিকতা বা নবজাগরণের সূচনালগ্নে মিলনের পরিবর্তে ধর্মের নামে বিভেদের পথেই হাঁটা শুরু করে। হিন্দু, মুসলিম– এই দুই ধর্মের জনগোষ্ঠীর বাইরেও তৎকালীন বঙ্গদেশসহ ভারতবর্ষে নানান নৃগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নিয়ে প্রাচীরের বাইরে বা প্রান্তরের গোত্রহীন ফুলের মতই নানান স্থানে ছড়ানো ছিল। বঙ্গদেশসহ ভারতের নবজাগরণের ও পরবর্তীকালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অন্যতম একটি কালো তিলক হলো– এই প্রাচীরের বাইরের এবং প্রান্তরের গোত্রহীন ফুলদের এক অর্থে অস্বীকারই করা হয়।

এমনই ভুল ও অনৈক্য নিয়ে ব্রিটিশ বিতাড়নের কালে রাষ্ট্র সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সারাটা পথ চলেছিল। এই পথের প্রতি পদক্ষেপের বিস্তারিত আলোচনা অনেক দীর্ঘ বিষয়। তাই ওই দীর্ঘ বিষয়ে প্রবেশ না করে শুধু এটুকু বলা যায় যে– বঙ্গদেশসহ ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূর্তির ভেতরের প্রকৃত রূপটি সঠিকভাবে দেখতে পান রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে যোগ দিয়ে। ঐক্যের নবজাগরণ বা জাতীয়তাবাদের পথ দূরে রেখে বাস্তবে সেদিন অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা নিজের ভেতরের শঠতা, কপটতা ও ক্ষুদ্রতা একটি মিথ্যে খোলসে ঢেকে রেখে সারাক্ষণ মানুষের সামনে আসতেন। এই সত্য প্রত্যক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ শুধু ব্যথিত হয়ে রাজনীতি থেকে নিজেকে সহস্র হাত দূরেই সরিয়ে নেননি, তিনি শঠতার রাজনীতির বাইরে গিয়ে সংস্কৃতির ভেতর ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের ঊর্ধ্বে সকল মানুষের মিলনের উপাদান খোঁজেন। সংস্কৃতির ভেতর স্বাভাবিকই এ বিষয়টি রয়ে গেছে হাজার হাজার বছর ধরে। কারণ,  কোনও ধর্মেরই বয়স মাত্র কয়েক হাজার বছরের বেশি নয়। কিন্তু মানুষ তার সভ্যতার সংগ্রামের মাধ্যমে সংস্কৃতিকে গড়ে তুলেছে লক্ষ্য বছর না হলেও ৬০ থেকে ৭০ হাজার বছর ধরে। সভ্যতার ঊষালগ্নের এই সংগ্রামে মানুষে মানুষে কোনও বিভেদ ছিল না।

বঙ্গদেশের হাজার হাজার বছরের সংস্কৃতিতে তাই রয়ে গেছে ঐক্যের মিলন উৎসবের নানান উপাদান। প্রকৃতির সন্তান মানুষ তার সকল মিলন, সকল জাগরণ, সকল পথচলাকে আনন্দিত, উদ্বেলিত ও উৎসবরত করেছে প্রকৃতির নানান ছন্দের প্রতি উৎসর্গিত করে।

বঙ্গদেশ ষড়ঋতুর দেশ। তাই এই ভূখণ্ডে কঠিন লাল মাটি থেকে অতি নরম ধূসর পলিমাটির মানুষ সকলে সবসময়ই তার সংস্কৃতিতে এক একটি ফুল ফুটিয়েছে ঋতুকে আহ্বান করে নানান উৎসব সৃষ্টির মাধ্যমে। কলকাতার কুটিল, জটিল ও বৈশ্য তাড়িত সমাজ থেকে বোলপুরের নিরিবিলি ছাতিম তলার ছায়ায় তাই আশ্রয় নিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার চারপাশে তখন বেশিরভাগ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ– অর্থাৎ সেই গোত্রহীন ফুল– যাদের জীবন ধর্ম ও রাজনীতি গ্রাস করেনি। বরং হাজার বছরের সংস্কৃতির ধারা সেখানে পাহাড়ি নদীর মতো স্রোতস্বিনী। তাদের জীবনের প্রতিটি আনন্দিত মুহূর্ত প্রকৃতির পরিবর্তনের ছোঁয়াকে ঘিরে যে উৎসবে মেতে ওঠে তা রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধিকে আরও বেশি শানিত করে। যার ফলে তিনি শান্তিনিকেতনে চালু করেন ধর্মীয় উৎসবের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক উৎসব– যেখানে ঐক্যে, মিলনে, আনন্দে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানোর কোনও উপাদানই নেই।

রবীন্দ্রনাথ তাই বাঙালির জীবনে জড়িয়ে থাকা ফাগুনকে বরণ, পৌষকে ঘরে বেধে রাখা বা বর্ষার জন্যে কিশোরী ও তরুণীদের গান নিয়ে বাড়ি বাড়ি বের হবার মতো উৎসব বা রীতিকে আধুনিকতার সকল নান্দনিক ছোঁয়া দিয়ে শুরু করেন, বসন্ত উৎসব, পৌষ মেলা ও বর্ষা মঙ্গলের মতো উৎসবের। যেখানে মানুষ তার ধর্ম, বর্ণ, গোত্র এমনি সকল বিভেদ ভুলে এক হতে পারে। আধুনিক রাষ্ট্রে, আধুনিক জাতীয়তাবাদে ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ভারতের মতো ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র তাড়িত ভূখণ্ডে এটাই ছিল, রাষ্ট্রে, জাতীয়তাবাদে ও রাজনীতিতে মিলনের ক্ষেত্র তৈরি করার প্রকৃত পথ। আর এই উৎসব বা মিলনের বিন্দু শুধুমাত্র উৎসব নয় কখনও, বাস্তবে সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত এক শক্তি যা মানুষকে আধুনিকতার পথে, নতুন করে নিজেকে সৃষ্টির পথে নিয়ে চলে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন এই পথের সৃষ্টি করছেন সে সময়ে বাস্তবে তিনি ভারতবর্ষে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। কারণ ততদিনে রাজনীতিবিদরা রক্তের স্বাদ জেনে গেছে। তাদের দাঁতে তখন রক্তের তপ্ত ছোঁয়া। যার নামের আগে যে অভিধা জুড়ে দেওয়া হোক না কেন, তারা বুঝে গেছেন– প্রকৃত মানুষের রাষ্ট্র সৃষ্টি অনেক দীর্ঘ ও প্রজ্ঞা নির্ভর সংগ্রাম। বাস্তবে হিমালয়ের চূড়ায় ওঠার থেকে লক্ষ যোজন দূরে পৌঁছানোর এক পথ চলা। তার থেকে অনেক সহজ রক্তাক্ত পথ। যে পথে বারবার সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে কুড়ে ঘরের শিশুটির বুকেও তীর বিঁধেছে। তাই এই রক্ত খেলার পথে রাজনীতিবিদরা ধর্মকে অতি সহজে ব্যবহার করে রক্ত গঙ্গায় শুধু দেশ ভাগের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভ করেনি, মানুষকেও ভাগ করে ফেলে ধর্মের নামে। আর ধর্মের হাতিটার পা এতই শক্তিশালী করে দেয় যে তার পায়ের দাপাদাপিতে সংস্কৃতি চাপা পড়ে যায় মাটির অনেক গভীরে।

ধর্মের নামে মানুষের রক্ত নিয়ে ওই হোলি খেলার দেশ ভাগের তিন বছর আগে রবীন্দ্রনাথ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। তার সৃষ্ট  প্রকৃতির যে কোনও সূচনাকে আহ্বান করার এ মিলনের কেন্দ্রবিন্দু তাই শান্তি নিকেতনের উৎসব হিসেবেই আটকে থাকে বঙ্গদেশের এক নিভৃত কোণে। অন্যদিকে ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তের হোলি খেলে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে যে দুটি দেশ হয় সেখানে তখন আধুনিক জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে মানুষের মিলনের উপাদানগুলো খোঁজার কোনও তাড়া নেই। কারণ, এক অংশ পাকিস্তানের দুটি খণ্ডেই তখন ধর্মের জোশের স্রোত বইছে রাষ্ট্রকে ঘিরে আছে যারা তাদের মধ্যে। অন্যদিকে খণ্ডিত যে অংশটুকু ভারত নাম নিয়ে আছে তারা নিজেদের ধর্মীয় রাষ্ট্র ঘোষণা না করলেও ধর্মকে চাপা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

ভারতের দুই খণ্ড যখন এমনই এক শ্মশানভূমিতে সে সময়টাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত নামের অংশের বা এই অংশের খণ্ডিত বাংলায় দেশভাগ ও দেশ ত্যাগের একটি যন্ত্রণা ছিল, কিন্তু কোনও আত্ম -পরিচয় হারানোর যন্ত্রণা ছিল না। ভারতীয় সংস্কৃতির যতটুকু তাদের ধর্মের সঙ্গে মিশে আছে ওই ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে যতটুকু ধারণ করতে পারে– তার ভেতরই তারা পরিচয় খুঁজে তৃপ্ত ছিলেন। সম্পূর্ণ সংস্কৃতি নির্ভর একটি জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার স্বপ্ন কারও ভেতর ছিল না। এমনকি রবীন্দ্রনাথের চেতনাকে ওই ভাবে ধারণ করে মানুষের সভ্যতার সংস্কৃতি ও নিজভূমির সংস্কৃতিকে মিলিয়ে আধুনিক সমাজ গড়ে তোলার তাগিদও তাদের ভেতর জাগেনি। বাস্তবে যন্ত্রণা ছাড়া কোনও তাগিদ কখনই জন্মে না।

বাস্তবে তখন এই যন্ত্রণা ছিল শুধুমাত্র কয়েকজন মুসলিম ঘরে জন্ম নেওয়া আধুনিক বাঙালি সন্তানের মধ্যে। এবং যারা সকলেই তাদের নিজ নিজ জীবনে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করেছিলেন প্রকৃত বোধ ও উপলব্ধি দিয়ে। কারণ ভিন্ন ভূমি থেকে আসা তাদের ধর্মকে নিয়ে রাষ্ট্র যখন অতি বাড়াবাড়ি শুরু করে তখনও তারা দেখতে পান, বাস্তবে তাদের প্রকৃত পরিচয় সংস্কৃতির মধ্যে, ধর্মের মধ্যে নয়। তেমনই রবীন্দ্রনাথকে জীবনে গভীরভাবে ধারণ করে তারা সেই বোধে শাণিত ছিলেন যে মানুষের প্রকৃত জীবন ধর্ম বা জীবন বোধ তার সংস্কৃতির ভেতর নিহিত। কোনও উপাসনার ধর্মে নয়। তারা শুধু তাদের নিজেদের জীবনের মধ্যে এই বোধকে সীমিত রাখেননি। পাকিস্তানের ওই কঠোর সময়ে, ধর্মের চরম দাপাদাপির মধ্যেও তারা তাদের চিন্তা ধারাকে তরুণ সমাজের সামনে নিয়ে আসতে থাকেন। আজ তারা সকলেই বাঙালির চিরকালের ইতিহাসের নমস্য। শাণিত বোধের ধারা যারা সেদিন ছড়িয়ে দিতে সকল অনেকটা নিজেকে বিপদের ভেতর ঠেলে দিয়েও শক্ত হয়ে দাঁড়ান– তাদের অন্যতম ছিলেন, সৈয়দ মুজতবা আলী, কাজী আব্দুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহার হোসন চৌধুরী, আবুল হোসেন প্রমুখ। তাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সহচর হিসেবে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতি সচেতন কিছু তরুণও এগিয়ে আসেন। অবশ্য পরে তাদের বেশি অংশ নিজস্ব সংস্কৃতি কেন্দ্রিক সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের ঢেউয়ে ভেসে যান।

রবীন্দ্রনাথ একাকী যা শুরু করেছিলেন, তার পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে সংস্কৃতির সে ধারা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক এই জাগরণ শুরু করেন ঢাকা কেন্দ্রিক রবীন্দ্র অনুসারী এই লেখক ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী। তাদের একটি অংশ ইতিহাসে ‘শিখা' গোষ্ঠী নামে পরিচিত। তবে শেষ অবধি কঠোর ধর্মীয় রাষ্ট্রে যা হয় তাই ঘটে। দেশত্যাগ করে চিরকালের জন্যে দেশহীন মানুষ হতে হয় সৈয়দ মুজতবা আলী ও কাজী আব্দুল ওদুদকে।

তারপরেও তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন পূর্ব বাংলায় সেদিন হাজার হাজার বা লাখো লাখো না হোক শত শত মুসলিম ধর্মীয় ঘরে জন্ম নেওয়া তরুণকে বাঙালি হিসেবে আত্ম পরিচয় খোঁজার চেতনার পথে চালিত করে। এবং এ মিছিল ক্ষুদ্র তালে হলেও বাড়তে থাকে। সেদিন ওই বুদ্ধিজীবীদের হাত ধরে যেমন মনোজাগতিক পরিবর্তনের ধারা শুরু হয় তেমনি এই পরিবর্তনকে আরও বেগবান করে সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান ভাষাকে নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ও নরহত্যা।

এমনি সময়ে একদিকে যেমন পূর্ববাংলার মুসলিম ঘরে জন্ম নেয় তরুণ তরুণীদের মধ্যে সংস্কৃতির ভেতর নিজের পরিচয় খোঁজার একটি তাড়না জাগতে থাকে– অন্যদিকে ঢাকাও ক্রমে একটি নগরী হয়ে উঠতে থাকে। তাই স্বাভাবিকই ওই তরুণ তরুণীরা সেদিন ধর্মীয় উৎসবের বাইরে গিয়ে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির উৎসব খুঁজতে থাকেন নগরজীবনের বা আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে। আর সে কাজের নেতৃত্বে এসে দাঁড়ান একদিন এই সংস্কৃতি নির্ভর আত্মপরিচয়কে তুলে ধরার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব যারা দিয়েছিলেন তাদেরই এক জনের আত্মজা কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা রবীন্দ্র চেতনার পরিপূর্ণ ধারক সনজিদা খাতুন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি তিনি তাঁর এক বান্ধবীর বাসাতেই প্রথম বাঙালির গ্রামে গ্রামে যে নববর্ষ পালিত হতো পহেলা বৈশাখে, তাকে নগরের উপযোগী শুধু নয়, আধুনিক জীবন ও রাষ্ট্রের উপযোগী করে পালন করেন। তার এই কাজের সহযোগী ছিলেন, তার গভীরতর বন্ধু মুক্ত মনের আরেক তরুণ ওয়াহিদুল হক ও নওয়াজেশ আহমেদ সহ আরও বেশ কয়েকজন। তারা সকলে মিলে যোগ করেন সেখানে বাঙালির হাজার বছরের প্রবহমান ছন্দ ও সুর যা রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, নজরুলের হাত দিয়ে আধুনিকতা পেয়েছিল, ঘটিয়েছিল আন্তর্জাতিকতা। পরে তারা এটাকে নিয়ে আসেন, ঢাকার রমনার বটমূলে।

পঞ্চাশের দশকের এই মাঝামাঝি সময়ে পূর্ববাংলায় যেমন ধর্মের প্রভাব ছিল, দাপট ছিল তেমনই তার বিপরীতে আত্ম পরিচয়ের এই শাণিত ধারা, আধুনিক বাঙালি হয়ে ওঠার এই ধারা ক্ষীণকায় হলেও স্রোতস্মিনী ছিল। এবং এর সব থেকে বড় দিক ছিল, এই পথ চলা বাস্তবে সংস্কৃতি নির্ভর একটি উদার জাতীয়তাবাদী চেতনা। জাতীয়তাবাদের নামে কোনও উগ্রতা একে স্পর্শ করেনি। গ্রাস করতে পারেনি কোনও রূপ ধর্মীয় আচ্ছাদন। তবে চেষ্টা যে ছিল না বা এখনও নেই তা নয়। সম্পূর্ণ আত্ম পরিচয়ের জন্যে বাঙালি সংস্কৃতি থেকে আধুনিক বাঙালি হয়ে ওঠার যে মিলন ক্ষেত্র তৈরির জন্যে এই নব জাগরণের পহেলা বৈশাখ সৃষ্টি তার গায়ে এক ধরনের ‘মুসলমানিত্ব’ লাগানোর চেষ্টা করেন এক ধরনের ফোকলোর গবেষক বা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। তারা বাঙালির আত্মপরিচয় সৃষ্টি ও আধুনিক বাঙালি হয়ে ওঠার এই পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আকবরের খাজনা আদায়ের কাল জুড়ে দিয়ে এই ক্যালেন্ডার সৃষ্টিকে বড় করিয়ে দেখিয়ে পহেলা বৈশাখের গায়ে এক ধরনের মুসলমানিত্ব জুড়ে দেওয়ার চেষ্টায় নামে।

যারা এই চেষ্টায় নামে তারা সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসকের অনুগ্রহপ্রাপ্ত ছিল। এ চেষ্টা এখনও অব্যাহত আছে।

এর পাশাপাশি ততদিনে পূর্ববাংলা তখন পূর্ব পাকিস্তানে রূপ নিলেও পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে বৈষ্যমের শিকার পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি ধীরে ধীরে বৈষম্যর প্রতিবাদে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে রূপ নিতে থাকে। এবং ষাটের দশকের শেষে এসে সে জাতীয়তাবাদ অনেকখানি বাঙালি জাতীয়তাবাদে নিজেদেরকে চিহ্নিত করে। তবে রাজনৈতিক আন্দোলনের এই জাতীয়তাবাদ যতটা ছিল রাজনৈতিক- ততটা সংস্কৃতি নির্ভর ছিল না। এই জাতীয়তাবাদ সমগ্র দেশকে নাড়া দেয়নি। তবে শিক্ষিত ছাত্র ছাত্রীদেরকে আলোড়িত করে বেশি। তারা এক পর্যায়ে এসে নিজেদেরকে পাকিস্তানি’র বদলে বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করার জন্যে স্লোগান দেয়, “তুমি কে? আমি কে ? /বাঙালি, বাঙালি।”

এভাবে নিজেদেরকে বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করলেও তারা বাঙালির হাজার বছরের সকল সংস্কৃতিকে ধারণ করে না। কারণ তারা বাঙালির মধ্যে সীমা রেখা টেনে দেয়, “তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।/” এই ভূগোলের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ যে সমগ্রতার মিলনের মাধ্যমে আধুনিক বাঙালি জাতির চিন্তা করেছিলেন, সেখানে রাজনৈতিক পথ চলায় একটা সীমা রেখা চিহ্নিত হয়। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক পথচলার ভেতর দিয়ে আধুনিক পহেলা বৈশাখের সৃষ্টির ভেতর দিয়ে যে পরিপূর্ণ সংস্কৃতি নির্ভর উদার জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির ধারা তৈরি হয়েছিলো– রাজনীতি তার প্রয়োজনে এই পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এসে মিললেও এর অন্ত সলীলে রয়ে যায় দুটি ভিন্ন ধারা। একটি স্থায়ীভাবে সংস্কৃতির ওপরে দাঁড়ানো অন্যটি রাজনৈতিকও  রাষ্ট্রিক প্রয়োজন। রাজনীতি ও রাষ্ট্র দুই-ই কখনও চিরকালীন স্রোতধারার ফল নয়। কিন্তু সংস্কৃতি চির প্রবহমান ফল্গু ধারা।

তাই রাজনীতি এসে সংস্কৃতি নির্ভর এ পহেলা বৈশাখের হাতে হাত ধরে নিজেকে শক্তিশালী করে নিলেও ধর্মের গর্ভে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান যতই বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাক- সেখানে রাজনীতিকে সম্পূর্ণরূপে ধর্মকে ফেলে দিয়ে সংস্কৃতিকে ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এবং পৃথিবীর কোনও দেশের রাজনীতি এখানে পৌঁছাতে পারেনি। চার্চ রাষ্ট্রের ওপর থেকে তারা ছায়া সরিয়ে নিলেও চার্চ নির্ভর শিক্ষা ও ব্লাসফেমি আইন এখনও ব্রিটেনে রয়ে গেছে। তাই যত বড় সংগ্রাম ও যত গতিশীল রাজনীতি তৃতীয় বিশ্বের ধর্মপীড়িত দেশে হোক না কেন, সেখানে রাজনীতির পক্ষে ধর্মকে শতভাগ ফেলে দিয়ে সংস্কৃতিকে শতভাগ গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

তারপরেও স্বাধীন বাংলাদেশে সংস্কৃতি নির্ভর পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয়ের অন্যতম একটি মিলন কেন্দ্র, অন্যতম বড় চূড়া হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। এবং ক্রমেই আপন শক্তিতে বলিয়ান হয়ে অপশক্তি’র বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়। রাজনীতিও তাই সে শক্তির কাছে এসে রাষ্ট্রের ওপর চেপে বসা অপশাসন বিরোধী আন্দোলনের জন্যে হাত পাতে। বিরোধী প্রগতিশীল রাজনীতি এভাবে পাশে আসাতে আধুনিক পহেলা বৈশাখ সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি পৌঁছে যায়। ১৪০০ সাল পালনে তাই প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলও পিছিয়ে থাকে না পহেলা বৈশাখে। রাজপথে নামে পহেলা বৈশাখের বিশাল মিছিল। যে মিছিলে স্থান পায় কৃষি নির্ভর বাঙালি সংস্কৃতির নানান উপকরণ। রাজনীতিকদের এ মিছিলের উৎসাহ কমে গেলেও সংস্কৃতি কর্মী অর্থাৎ বিশেষ করে চারুকলার শিল্পীদের উদ্যোগে ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখের এই মিলনের উৎসবে যোগ হয় ‘মঙ্গল শোভা যাত্রা’। যে মঙ্গল শোভা যাত্রা ইতোমধ্যে ইউনেস্কো’র ঐতিহ্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে।

শুরু থেকে এই শোভা যাত্রার বিরোধিতা করতে থাকে ধর্মীয় মৌলবাদীরা। অন্যদিকে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। নিহতের লাশে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তবুও সংস্কৃতির এই যাত্রাকে রুখতে পারে না। অনেক বিধি নিষেধের বেড়াজালে এখনও পহেলা বৈশাখ এলেই সনজিদা খাতুনের হাত ধরে তৈরি শিল্পীরা এখনও আসেন রমনা বটমূলে। র‌্যাব পুলিশের প্রহরায় এখনও ছোট হলেও বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

এই দুইটি ছোট হয়ে এলেও বাড়ছে পহেলা বৈশাখ পালন। সরকারিভাবে আছে পহেলা বৈশাখের উৎসবের ভাতা। যা বেসরকারি অফিসকেও দিতে হয়। অর্থাৎ ঈদ ও পুজোর বোনাসের পাশে নতুন বোনাস বৈশাখী ভাতা। তাই ঈদ ও পুজোর মতো পহেলা বৈশাখকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে এক অর্থনীতি। যা কোভিডের আগের বছরে ১৯০০ কোটি টাকার মতো ছিল।

এবার পহেলা বৈশাখের আগে মৌলবাদীরা হুংকার দেয় মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে। মৌলবাদী আইনজীবী ধর্মবিরোধী বলে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে কোর্টে রিট পিটিশন করে। অন্যদিকে সরকারও মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইউনেস্কোর স্বীকৃত এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখে বের করতে।

ধর্ম তাড়িত জনগোষ্ঠীতে খুব কম প্রগতিশীল রাজনীতি ধর্মকে বাদ দিতে পারে। বিশেষ করে ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম ও জিরাফকে পাশাপাশি নিয়েই তাদের চলতে হয়। তারপরেও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা এই শোভা যাত্রা করার নির্দেশ দিয়ে প্রমাণ করেছে পহেলা বৈশাখের চেতনাকে রাষ্ট্র ধারণ করে। ভোটের রাজনীতিতে সব রাজনীতিবিদ হয়তো এভাবে আসতে পারবে না।

তবে রাজনীতির সহায়তায় এই পহেলা বৈশাখ পালন, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা কিছুটা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে পহেলা বৈশাখকে আরও বেশি করে নিয়ে যায়। তবে তারপরেও সব থেকে বড় সত্য হলো ধর্মের নামে দাঙ্গা বিধ্বস্ত ভূখণ্ডের এই পলিমাটি নির্ভর পূর্ববঙ্গে দশ বছর না যেতেই শুরু হয়েছিলো সংস্কৃতি নির্ভর উদার বাঙালি হিসেবে নিজের আত্মপরিচয় সৃষ্টির এক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখের’। যা বোমার আঘাতে লাশ হয়েও, মৌলবাদীর রক্ত চক্ষুর শিকার হয়েও থেমে যায়নি। ক্ষীণ স্রোতধারা হলেও বাঙালির সংস্কৃতি নির্ভর একটি আত্মপরিচয় খোঁজার ও সৃষ্টি করার পথ। একমাত্র উৎসব। যে উৎসবে শুধু আনন্দ ও গান ও নাচেই শেষ হয় না তার বুকের ভেতর একটা আগুন আছে। যে  আগুনে সে নিজেই পুড়ে একদিন না একদিন খাঁটি সোনা তৈরি করবে সব কয়লাকে। বিপর্যয়ে যদি হাজার বছর পাথর চাপাও পড়ে- তার পরেও ইতিহাসের গহ্বর থেকে একদিন চিরযৌবনা সে বেরিয়ে আসবেই।

লেখক: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।  

       

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জামাল কি আবাহনীতেই থাকছেন?
জামাল কি আবাহনীতেই থাকছেন?
সোনার দাম আরও বাড়লো
সোনার দাম আরও বাড়লো
১০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ: সাবেক শ্রমিক লীগ নেতা কারাগারে
১০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ: সাবেক শ্রমিক লীগ নেতা কারাগারে
বাঙালির আবেগ নিয়ে আর কত খেলবেন সাকিব-শান্তরা?
বাঙালির আবেগ নিয়ে আর কত খেলবেন সাকিব-শান্তরা?
সর্বশেষসর্বাধিক