X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

ইউক্রেন-গাজার যুদ্ধ কূটনীতি

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ২০:৫৬আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ২০:৫৬

সংকট সমাধানে কূটনীতির পথই সর্বোত্তম পন্থা। বিশ্বের বড় বড় সংকট ও সমস্যা যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, কূটনীতির মাধ্যমে শুভ ফল পেয়েছে। যুদ্ধ দূরত্ব বাড়ায়, কূটনীতি দূরত্ব কমায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বৃহৎ শক্তিগুলো অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান কূটনীতির বদলে অস্ত্রের মাধ্যমে করতে চাইছে। তাই বিশ্বের নানান প্রান্তে যুদ্ধের সাইরেন বাজছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তার প্রমাণ। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শেষ না-হতে হতেই হামাস-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইউরোপের পর এবার মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়েছে। উপর্যুক্ত দুটি ঘটনার শুরু কূটনৈতিক চালের পরিপ্রেক্ষিতে হলেও কূটনৈতিক পন্থায় সমাধান খোঁজার বদলে পক্ষ-বিপক্ষ উভয়েই যুদ্ধের ময়দানে লড়ছে। যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের কূটনীতিতে ফিরতে হবে। কারণ, যুদ্ধের ময়দানে নয়, কূটনীতির রাজনীতিতেই রয়েছে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান।

রাশিয়া-ইউক্রেন ও হামাস-ইসরায়েল প্রতিপক্ষের কূটনৈতিক সফলতাকে বানচাল করতে যুদ্ধে জড়ায়। ইউক্রেনের ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। একইভাবে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা রোধ করাই হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের প্রধান কারণ ছিল। ইউক্রেন ন্যাটোভুক্ত দেশে পরিণত হলে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য তা হুমকি তৈরি করতো, এমন অভিযোগেই রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। অন্যদিকে প্রকাশ্য হামাস স্বীকার না করলেও এই দাবি করা যায়, ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের উন্নতি হলে, সৌদি আরবসহ তার বলয়ের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি প্রদান করলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলের ওপর ওই অর্থে আর কোনও আন্তর্জাতিক চাপ থাকতো না। জনমিতি-জনবসতি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে গাজার অবশিষ্ট অংশকে ইসরায়েল সহজে তার জমির অন্তর্ভুক্ত করতে পারতো। ফিলিস্তিনের মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য অংশকে সিনাই উপদ্বীপে পুনর্বাসনের মাধ্যমে গাজা সংকটের সমাধান হতো। পশ্চিম তীরে তখন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতো। ইসরায়েল বিশাল সমুদ্র উপকূল পেতো, যা তার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতো। ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যেতো। দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান হতো।

কিন্তু হামাসের সাম্প্রতিক ইসরায়েল আক্রমণের ফলে পশ্চিম তীরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে। অবশ্যই হামাসের কাছে ইসরায়েল আক্রমণ করে সংঘাত উসকে দেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। কারণ, ইসরায়েলের জনমিতি-জনবসতি পুনর্বিন্যাসের কূটনীতি সফল হলে, গাজা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হলে, পশ্চিম তীরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে হামাসেরও আর কোনও গুরুত্ব থাকতো না। হামাস অস্তিত্ব সংকটে পড়তো। তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় হামাস ইসরায়েল আক্রমণ করেছে। রাশিয়ার মতো হামাসও আপাতত সফল হয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা থমকে গেছে। বাংলাদেশের মতো সৌদির ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে যারা সৌদি আরবের মতো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবার প্রস্তুতি পর্বে ছিল, তারা এখন ইসরায়েলের গাজা অভিযানের কঠোর সমালোচনা করছে। ফলে আপাতত সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। 

অন্যদিকে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে ইউক্রেনের ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্তি থেমে গেছে। যুদ্ধরত কোনও দেশকে ন্যাটোর সদস্য করা হয় না বিধায় ইউক্রেনের পক্ষে আপাতত ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ সম্ভব হবে না।

দুই.

“রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়ার প্রাণ যায়”- বাংলা এই প্রবাদ-প্রবচন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে সত্য হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন ও হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে প্রতিনিয়ত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ প্রচলিত-অপ্রচলিত অস্ত্রে প্রাণ হারাচ্ছে। আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় অনেকে মরণযন্ত্রণায় ছটফট করছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবার নারী ও শিশু। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়,  “ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্র পল্লিতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না”- মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝির ওই বিখ্যাত উক্তিকে যদি আমরা পদ্মার পাড়ের বদলে ইউক্রেন অথবা গাজার ক্ষেত্রে ব্যবহার করি, তাহলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একদমই বেমানান হবে না। 

রাশিয়া ইউক্রেনে লড়লেও গাজায় লড়ছে না। আর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন অথবা ফিলিস্তিন কোনও ফ্রন্টেই সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অস্ত্রশস্ত্র উভয় যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। তাদের মিত্রদের রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ মানুষদের রক্ষার জন্য তার মিত্রদের অস্ত্র অর্থ প্রদান করছে বলে বারবার দাবি করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের ওই তৎপরতা সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন অথবা হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ চলমান থাকায় উভয় অঞ্চলেই প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে। অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালের বেডে মরণযন্ত্রণায় ছটফট করছেন।

তিন.

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কূটনীতিতে নতুন বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতায়নের ছক সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের বাইরে রাশিয়া, চীন, ইরান, সৌদি আরব মিলে নয়া বিশ্বব্যবস্থার তোড়জোড় লক্ষ করা যায়। যদিও সৌদি আরব একসময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষিত মিত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধোত্তরকালে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের শীতলতা দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে। সৌদি আরব চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে সম্মত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে তেলের উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায়শই তৎপর হয়েছে। সৌদি আরবের এমন পদক্ষেপ তাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। রাশিয়া-চীন-ইরান-সৌদি আরব এক বলয়ে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট গঠন করছে কিনা সেই প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। এমনটি যদি বাস্তবে ঘটে তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি-রাজনীতির ক্ষেত্রে এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা লক্ষ করবে বিশ্ব। ওই নয়া বিশ্বব্যবস্থা সফল হলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব কমবে।

 
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কৃষ্ণ সাগরে আরেকটি রুশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি ইউক্রেনের
কৃষ্ণ সাগরে আরেকটি রুশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি ইউক্রেনের
জাতীয় পাট দিবসে পুরস্কার পাচ্ছেন ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
জাতীয় পাট দিবসে পুরস্কার পাচ্ছেন ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
পুরো দেশটাই অগ্নিঝুঁকিতে: জিএম কাদের
পুরো দেশটাই অগ্নিঝুঁকিতে: জিএম কাদের
‘সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকির অভাবই অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ’
‘সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকির অভাবই অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ