প্রেস কাউন্সিল বন্ধ করে দিলে ক্ষতি কী?

Send
ফজলুল বারী
প্রকাশিত : ১৪:০৫, মে ০২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৬, মে ০২, ২০১৭

Fazlul Bariমনটা খুব খারাপ। বাংলাদেশে আরেকজন সাংবাদিককে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রেস কাউন্সিল আছে। সেখানে দলীয় সাংবাদিকদের পদায়ন আছে, কিন্তু সেই প্রেস কাউন্সিলকে অকর্মা রেখে একের পর এক সাংবাদিককে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গ্রেফতারে যারা ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছেন, তারাও কিন্তু এই বিপদে পড়বেন একদিন। হাওরের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতার একটি লাইন পড়তে গিয়ে চমকে উঠেছি! তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি প্রধানমন্ত্রী নাও থাকি...’। দেশজুড়ে এত কর্মযজ্ঞ শুরু করেও কি প্রধানমন্ত্রীর মনে হয়েছে আগামীতে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী নাও থাকতে পারেন! আর এই হয়রানিমূলক তথ্যপ্রযুক্তি আইনটি যারা করেছেন, তাদের মনে কি একবারও এসেছে, তারা ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন আগামীতে!
তথ্যপ্রযুক্তি আইনটিকে সাংবাদিকদের জন্যে হয়রানিমূলক বললাম এই কারণে যে, এরমাঝে তিনটি ঘটনায় স্পষ্ট সাংবাদিক নির্যাতনের হাতিয়ার করতেই এটির শব্দগুচ্ছ সাজিয়েছেন আইন প্রণেতারা!
বাংলাদেশের মূর্তিমান আরেক দুর্নীতির খাত শিক্ষাখাত! প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে কী দুর্নীতি সেখানে নেই? সারাজীবন ছাত্র-ছাত্রীদের সততার শিক্ষা দেন যে শিক্ষক, চাকরি জীবন শেষে ঘুষ না দিলে তার পেনশনের ফাইল নড়ে না! এমন দুর্নীতির এক চরিত্রকে নিয়ে রিপোর্ট করায় সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান খানকে গ্রেফতার করে জেলে দেওয়া হয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মামলায়! আমাদের প্রতিবাদের মুখে সিদ্দিককেও জামিন দিতে হয়েছে। কিন্তু মামলার খড়গটি তো তার মাথার ওপর থাকলোই! সাংবাদিককে তার কাজ ফেলে কোর্টের বারান্দায় ঘোরানোর নিয়ত যদি কেউ করে থাকেন, একই ফাঁদে তারা পড়বেনই একদিন!
বাংলাদেশে এখন এত নিউজপোর্টাল! সাংবাদিক আহমেদ রাজুকে গ্রেফতারের আগে রাইজিং বিডি, নতুন সময় ডটকম অনলাইন নিউজ পোর্টালের কথা আমি জানতামই না! মানুষ হিসেবে আমার এই অজ্ঞতা-সীমাবদ্ধতার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু এই অতি উৎসাহী গ্রেফতার, রিমান্ড প্রক্রিয়া শুনে চমকে উঠেছি। আমাদের দেশের এমন অনেক কাঁচা টাকার মালিকের আজকাল একটা মিডিয়ার দোকান অথবা নিদেনপক্ষে একটি অনলাইন থাকা না থাকাটা যেন বড় একটি প্রেস্টিজ ইস্যু। জেনেশুনে এসব জায়গায় যারা কাজ করেন, কেন কাজ করেন এ নিয়ে ভবিষ্যতে লিখব।
কিন্তু একজন আপনার অনলাইন পোর্টালে থাকলো না বা আপনি রাখলেন না, এরপর আবার মামলা দিয়ে একজন সাংবাদিককে আপনি নিগ্রহের শিকার করবেন, এমন নিয়তকে শুধু ধৃষ্টতা বললে কি কম হয়ে যায় না? আপনি ফ্রিজ বেচেন ভালো কথা, আরও বেশি করে বেচুন, দেশটা আপনাদের ব্যবসার পণ্যে সয়লাব করে দিন। কিন্তু টাকার গরমে সাংবাদিক নিগ্রহের ফল যে ভালো হবে, এমন গ্যারান্টি আপনাদের কে দিয়েছে? আর একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা শুনেও তাকে অতিদ্রুত গ্রেফতার, তাকে রিমান্ডে নেওয়ার অতি তৎপরতার সুফল না কুফল মিলবে তা কি পুলিশ বিভাগ জানে না?  এসব প্রশ্নে কেউ ক্ষিপ্ত হবেন না। কাজটা একটু বেশি বাজারি হয়ে যাওয়াতে বাজারের এসব প্রশ্ন কারও এড়ানোর সুযোগ নেই।
তথ্যমন্ত্রী প্রিয় হাসানুল হক ইনু ভাইকে বলি, প্রতিদিন এত বিবেকবানের মতো কথাবার্তা বলেন! কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বিবেক খাটাতে বাধা কোথায়? এসব যখন দেশে চলছে বা চলবে প্রেস কাউন্সিলটা বন্ধ করে দিলেইতো পারেন। দেশের কিছু খরচাপাতির অন্তত সাশ্রয় হবে। শুধু সরকারি কিছু সাংবাদিকের পদায়নের জন্যে প্রেস কাউন্সিল রাখার যৌক্তিকতা কী? সাংবাদিক আহমেদ রাজুর গ্রেফতার নিয়ে সাংবাদিক নেতাদের সরগরম হতে দেখেছেন কে কে? ওই প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিশ্চয় আপনাদের কাছে অত মহার্ঘ নয়। দয়া করে এই নিগ্রহের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন। অথবা যদি আওয়াজ তুলতে সমস্যা থাকে সেটিই বলুন।
আমি এসব নিয়ে তরুণ প্রজন্মের সাংবাদিকদের সক্রিয় হওয়ার অথবা করা পক্ষে। তরুণ বয়স যার সমাজের পচাগলা সবকিছু তাকে এখনও সেভাবে স্পর্শ করতে পারেনি। এখনও অনেক পবিত্র তাদের সংকল্প। প্রিয় প্রজন্ম সাংবাদিকবৃন্দ, তোমাদের খুব ভালোবাসি। প্লিজ প্রতিবাদী হও। ভয় ধরাও শয়তানের মনে। রাজুকে মুক্ত করতে হবে সবার আগে। প্রবীর শিকদার, সিদ্দিক, রাজুদের বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধ করাতে হবে। দরকার হলে বন্ধ করাতে হবে সেই প্রতিষ্ঠানটির সব দোকান। কারণ কাঁচা টাকার গরমে তারা সাংবাদিক নিগ্রহে মন দিয়েছে! প্রিয় প্রজন্মবৃন্দ, আইসিটির ৫৭ ধারার বিরুদ্ধে সোচ্চার হও। পরপর তিনটি ঘটনায় স্পষ্ট এই আইনটি করা হয়েছে সাংবাদিকদের টার্গেট করে। যে নিজেকে যত শক্তিশালী ভাবুক সংবাদকর্মী, সৎ মিডিয়া যে দুর্বল নয় তা শাসকদের জানিয়ে দিতে হবে। প্রতিবাদের আগুন জ্বালো প্রিয় প্রজন্ম, সুন্দর আমার।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ