বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা কি শুধু ‘তাদের’ নেতা?

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১২:৫৬, জুলাই ০৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৯, জুলাই ০৯, ২০১৭

শারমিন শামস্দেশে এখন এমন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে আপনি যে দেশপ্রেমিক তা প্রমাণ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে থাকতে হবে। আপনি যদি তা না হন, তবে আপনাকে বুদ্ধিবৃত্তিক অথবা লেজুরবৃত্তিকভাবে সকল অবস্থায় রাজনৈতিক দলটির সার্বক্ষণিক গলাবাজ সমর্থক হতে হবে। যদি আপনি এর কোনোটিই না পারেন, মনে রাখবেন, দলটিকে আজীবন দেওয়া আপনার ভোট কখনোই গনায় ধরা হবে না, দলটির নেতার প্রতি আপনার আবেগ ভালোবাসা, পারিবারিকভাবে তাদের প্রতি আপনার কালব্যাপী সমর্থন সবকিছুই মিথ্যায় পরিণত হবে। কোনোক্রমে আপনি যদি দলটির কোনও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ফেলেন, তবে ‘সাড়ে সর্বনাশ’। আপনাকে তার জন্য যে খেসারত দিতে হবে, তা বহুকাল আপনাকে মনে রাখতে হবে। অথচ আপনি অন্তরের ভেতর থেকে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু দেশপ্রেমের পরীক্ষায় আপনি লাড্ডুই পাবেন, কেননা একজন নিছক সাধারণ মানুষ হিসেবে সমালোচনার অধিকার এই রাষ্ট্র আপনাকে তার মর্জিমতই দেবে। ঠিক কতটা তার সহ্যশক্তিতে ধরবে, তা সেই জানে।
এখন সাধারণ মানুষের, মানে যারা কোনও দলের কর্মী নয়, প্রকাশ্য গলাবাজ সমর্থক নয়, টকশোতে গিয়ে তেলতেলে কথক নয়- তাদের সরকার বা কোনও দলের কর্মকাণ্ডের আলোচনা সমালোচনা করার কোনও অধিকার নাই। তাহলে দল ও সরকারের ভুল-ত্রুটি, পছন্দ-অপছন্দের সমালোচনার অধিকার সংকুচিত করার যে রীতি, মুখ চেপে ধরার প্রয়াস কি সেই দল, সেই সরকার এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে? গণতন্ত্রের লেবাসে এই চরম অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক চর্চাটা আসলে কার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে? সাধারণ মানুষের সমালোচনাকে রুখতে আইনের ধারা এবং জুজুর ভয়ে রাখার পাশাপাশি যেকোনও সমালোচনা বা বিরুদ্ধ মতের বিপক্ষে দলীয় লোকজনের শিষ্টাচারহীন ঝাঁপিয়ে পড়া আসলে কার অমঙ্গলের পথ রচনা করে?

একই সঙ্গে আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। দলের কর্মীর ভূমিকাকেই দলের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা। দলের সমর্থকের ভূমিকা এখন নিতান্তই তুচ্ছ, নগণ্য। এমনকি কে সমর্থক আর কে সমর্থক নয়, সেটিও বিচার করেন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মীরা। আর সেই বিচারের পদ্ধতি কখনও কখনও এতই অনমনীয়, এতই শিষ্টাচারহীন যে, তা দেখে তাদের কুশিক্ষা ও রুচিহীনতার বিষয়টিই উৎকটভাবে ফুটে ওঠে। আর তারাই বিচার করেন কে প্রকৃত সমর্থক, কে শুভাকাঙ্ক্ষী আর কে নন। অথচ ভোটের বাক্সে ব্যালট ফেলার বিষয়টি গোপন, তাই এদেশের কোটি কোটি ভোটারের কে কাকে সমর্থন করেন, তা নব্য গজিয়ে ওঠা দলীয় কর্মীদের জানার সুযোগ কিভাবে থাকে, তা এক রহস্য বটে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি কলাম, কোনও বক্তব্য এবং সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে কোন লেখক, কলামিস্ট, শিল্পী, সাংবাদিক, উন্নয়ন কর্মী, অ্যাকটিভিস্ট, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী বা গৃহিনীর লেখা একটি নিতান্ত সাধারণ সমালোচনামূলক অথবা কোনও ক্ষেত্রে অভিমানভরা স্ট্যাটাসকে যখন দলের কর্মীদের কিছু অংশ ব্যক্তির রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিয়ে ঝাণ্ডা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন নতুন করে ভাবতেই হয়, কারা আর কিভাবে তারা এই ঝাণ্ডাবাজির ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেন? অথচ এমন লক্ষ লক্ষ প্রজ্ঞাবান নেতাকর্মী ওই দলটিতেই আছেন যারা সমালোচনাকে হাসিমুখে গ্রহণ করতে পারছেন এবং এ বিষয়ে নিজেদের চিন্তাভাবনাকেও নতুন করে শাণিত করতে চাইছেন। তাদের কাছে মানুষের মতামতের মূল্য আছে। তবে ওই যে নব্য ঝাণ্ডাধারীরা হা...রে... রে... রে... করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা শব্দ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিভাবে? কিভাবেই বা তারা কুক্ষিগত করে ফেলতে চাইছেন তাদের নেত্রীকে, দলের আদর্শ ও মূল্যবোধকে? হ্যাঁ, একজন সাধারণ, নিতান্ত সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের আদর্শ ও মূল্যবোধকে নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখার অধিকার কি এইসব কর্মী নেতাদের আছে?

একজন সাধারণ মানুষ, একজন সাধারণ সমর্থক, ভোটার কি দলটির আদর্শের প্রতি নিভৃতে একনিষ্ঠ থাকতে পারেন না? তার কি সেই অধিকার নেই? শেখ হাসিনা কি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের নেত্রী? তিনি কি বাংলাদেশের সেইসব কোটি মানুষের প্রিয় নেত্রী হতে পারেন না, যারা সক্রিয় আওয়ামী লীগ করেন না, কিন্তু ভোটের সময় নিজের ভোটটি আওয়ামী লীগের জন্য রেখে দেন এবং বছরের পর বছর ধরে তারা তাই করেছেন। তারা দলটির গলাবাজ বুদ্ধিজীবী নন,  অন্ধ সমর্থক নন, দলের ভুলত্রুটির সোচ্চার অথবা অভিমানী সমালোচক। কিন্তু এই সমালোচনা এখন মূল্যায়ন হয়, মুহূর্তে চিহ্নিত করে ফেলা হয় তার রাজনৈতিক অবস্থান, মুহূর্তেই তার পরিচয় হয়ে যায় যুদ্ধাপরাধী আর রাজাকার সমর্থক বলে, নয়তো বিএনপি জামাতের দোসর বলে। এ কেমন চর্চা? এ কেমন রীতি? কারা একে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে? কারা এই লাঠিয়াল গোষ্ঠীকে পথেঘাটে অনলাইনে ক্ষমতা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে যত্রতত্র গালিগালাজ, নামকরণ আর ঘেন্না ছড়ানোর কাজটি সুচারুভাবে করতে?

দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে রাজনীতির মাঠে এই দলটি সবচেয়ে পরীক্ষিত, জনপ্রিয় হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। সেই দলটির ভুল ভ্রান্তি, ত্রুটি, অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে শুধু তাদের রাজনৈতিক বিরুদ্ধ পক্ষই কথা বলবে- এটি একটি অবান্তর, অবাস্তব ব্যাপার। এটি গণতান্ত্রিকও নয়। যেকোনও সুস্থ প্রজ্ঞাবান মানুষ প্রিয়জনেরও সমালোচনা করেন। তার মানে প্রিয়জনের ভুলত্রুটি দোষ তাকে আঘাত করেছে, অভিমানী করেছে। কিন্তু আজ এই দেশে, এই স্বাধীন মাটিতে, গণতন্ত্র নামের সুবাতাস যেখানে বইছে বলে আমরা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি, সেইখানে আমাদের মুখ বাধা। বাধা ছিন্ন করে আমরা যখন তবু কথা বলি কিংবা বলতে চাই, আমাদের নামের পাশে নানা ধরনের তকমা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

মিছিলে, সভায়, সমাবেশে যে সমর্থক অথবা নিভৃত প্রেমিকটি স্লোগান ধরেন না, দলের প্রতি, সেই দলের নেতার প্রতি এবং সর্বোপরি জাতির পিতার প্রতি তাদের ভালোবাসা কি মিথ্যে হয়ে যায়? তাদের সমর্থন, বছরের পর বছর দেওয়া তাদের ভোট কি তবে মূল্যহীন? নাকি এই সবই আজ পরীক্ষার মুখোমুখি? নিজেদের আস্থা আর বিশ্বাস প্রমাণ ও সত্যায়িত হয়ে আসার জন্য এইসব সাধারণ মানুষকে আসলে কোথায় ধর্ণা দিতে হবে? এই পরীক্ষা নিতে যারা আজ তৎপর তারা আসলে কারা? দলের আজীবন যারা প্রকৃত ত্যাগী একনিষ্ঠ কর্মী নেতা তারা কি এইসব পরীক্ষার কথা ভাবেন? তারাও কি একইভাবে চিন্তা করেন? তারাও কি মুহূর্তেই তকমা লাগান কারো নামের পাশে? তারাও কি বারবার নিজেদের ত্যাগ আর পরিশ্রমের কথা প্রকাশ্যে বারবার প্রচার করেন?

সক্রিয় রাজনীতি সবাই করবে না। বরং জনসংখ্যার একটি খুব ছোট অংশ সরাসরি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হন। তাই বলে রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের ভূমিকা ছোট হয়ে যায় না। বরং প্রকৃত নেতাকর্মীরা ওই সাধারণ মানুষের কল্যাণেরই আত্মনিয়োগ করেন যাতে তাদের হৃদয় জয় করতে পারেন। তারা জনগণের মুখাপেক্ষী। জনগণের বন্ধু হয়ে ওঠাই তাদের লক্ষ্য। তবে কেন এই শত্রুভঙ্গি? কেন এত মারমুখী আচরণ সাধারণ সমালোচনাকারী প্রতি?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার প্রতি একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশে কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তির এই অপপ্রয়াস আদৌ কি দলটির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে? অনেকবার আশাহত হওয়ার পরও একটা আধুনিক, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত বাংলাদেশের জন্য এদেশের কোটি মানুষ এখনও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা রাখে, বিশ্বাস রাখতে চায়। শেখ হাসিনার জন্য বুকের গভীরে ভালোবাসা লালন করে। যারা এই নির্ভেজাল ভালোবাসার খোঁজ না রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ক্ষমতা দেখিয়ে নির্বিচারে মানুষের প্রতি নোংরা আচরণ করছে এই বলে যে তারা আওয়ামী লীগের প্রকৃত বন্ধু।  তাদের বন্ধুতা আর সততার পরীক্ষাটি নেওয়ার ক্ষমতা এদেশের মানুষের হাতে নেই। যার হাতে আছে, তিনি কোনোদিন এই লেখা পড়বেন কিনা, আমি জানি না।

লেখক: প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ