দুর্নীতি দমন এবং বঙ্গবন্ধুর আর্তনাদ...

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৯:১১, জুলাই ৩০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২০, জুলাই ৩০, ২০১৭

শুভ কিবরিয়াদুর্নীতি নিয়ে এবার সরব হয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রীর অভিজ্ঞতা বিস্তর। বছরের পর বাজেট শুধু দেন নাই, সরকারের সঙ্গে নানারকম কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে তার। সরকারের আমলা হিসেবেও বহু ধরনের সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন জনাব মুহিত। জীবন সায়াহ্নে এসে তাই যখন তিনি কথা বলেন, তখন সে কথার একটা গুরুত্বও আছে। আছে অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব জ্ঞান। দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন তিনি ২৭ জুলাই ২০১৭। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। দুর্নীতিতে আমরা সবাই নিমজ্জিত। সবাই যদি নিমজ্জিত না থাকত তাহলে দুর্নীতি হতো না। যাদের ক্ষমতা তারাই দুর্নীতি করে। যদি এতে সবাই অংশ না নেয় তাহলে দুর্নীতি হয় কিভাবে? পরোক্ষভাবে আমরা সবাই দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত।’
অর্থমন্ত্রীর এই কথার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। তিনি বলতে চাইছেন, ‘ক্ষমতাবানরাই’ দুর্নীতিবাজ। সেটা তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসলও বটে! বছরের পর বছর অর্থমন্ত্রীর গদিতে তিনি আছেন, অনেককাল অর্থ সচিবের চেয়ারেও বসেছেন- তার অভিজ্ঞতার মূল্যকে অবহেলা করা হবে বোকামির নামান্তর। কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি কি সব ক্ষমতাবানদেরই কাজ? তিনি অবশ্য দুর্নীতির সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে দেখেছেন ভীন্নতরভাবে। তিনি ভাবতে চাইছেন, ‘দুর্নীতিতে আমরা সবাই নিমজ্জিত’। এই সবাইকে চিহ্নিত করে আসলে তিনি কি বলতে চাইছেন সেটা স্পষ্ট নয়। কেননা মানুষ দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে চায়। বাধ্য না হলে খুশীতে কেউ ঘুষ দিতে চায় না। ঘুষমুক্ত ব্যবস্থা তৈরি না করে , দুর্নীতি দূর না করে ভুক্তভোগীদের দায়ী করে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে লাভ কী?
দুর্নীতি দূর করতে হলে এখন তাহলে কী করা উচিত? রাষ্ট্রের যারা প্রকৃত ক্ষমতাবান, যারা মন্ত্রী তাদের কর্তব্যই বা কী? আর দুর্নীতি রোগে সারা দেহে পচন ধরলে আগে ‘মাথার পচন’ নিয়ে ভাবনা করা উচিত কিনা তা আবুল মাল আবদুল মুহিত সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। অবশ্য স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তিনি দুর্নীতিসহ্য সমাজকে একটু খোঁচানি দিতে ভুল করেননি। তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতি এক সময় একটা গোপনীয়তার মধ্যে ছিল। দুর্নীতি করতে একসময় মানুষ শরম পেতো। এখন আর তা নেই’।
কিন্তু কেন নেই? এর প্রকৃত উত্তর অবশ্য এম এ মুহিত খুঁজতে চান নাই। প্রশ্নটা উল্টোভাবেও করা যায়, দুর্নীতি বন্ধ হোক এটা কি অর্থমন্ত্রী আবুল মুহিত নিজে চেয়েছেন?

যদি চাইতেন, তবে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার বর্তমান শাসনামলে সোনালী বা ব্যাসিক ব্যাংকের বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তিনি কোনও পদক্ষেপ নিলেন না কেন?

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির রাঘব বোয়ালদের তিনি জামাই আদর করলেন কেন?

হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি আর বেসিক ব্যাংকের চিহ্নিত শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে পারলেন না কেন?

অর্থমন্ত্রী এখন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু নাটুকে কথা বলছেন বটে, কিন্তু তার শাসনামলেই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে হাজার হাজার টাকা লুটপাট হলো, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলো- তিনি কোনও পদক্ষেপ নিলেন না। কিন্তু কেন? এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে কি তার গদি হারাতে হতো? নাকি এসব লুটেরাদের ছেড়ে দিয়ে, তাদের সহায়তা করে, তিনিও দুর্নীতির অংশীজন হয়ে রইলেন।

অর্থমন্ত্রীর দুর্নীতিবিষয়ক এসব ঠাট্টা মশকরা শুনে তাই একজন অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, ‘যাদের হাতে ক্ষমতা তারাই দুর্নীতি করে শুধু এমন বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজ কারা তা স্পষ্ট করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে হবে’।

দুই.

দুর্নীতি নিয়ে এই আলোচনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান অবশ্য দুর্নীতি দমনের একটা দাওয়াই বাতলে দিয়েছেন। তার মতে, ‘আজকের বাংলাদেশে দুর্নীতি একটা বড় সমস্যা। আমরা যারা রক্ষক, তাদেরই কেউ কেউ ভক্ষক হিসেবে পরিণত হয়েছি। তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এদের প্রতিহত করতে হবে’।

দু’দক চেয়ারম্যানের এই দুর্নীতি দমন ভাবনার কথা ও বাস্তব কাজ দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবে শোনা একটা হাসির গান মনে পড়ে গেলো। এই গানটির কথা রবীঠাকুর তার জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন-

‘ও কথা আর বোলো না, আর বোলো না,

বলছ, বঁধূ, কিসের ঝোঁকে-

এ বড় হাসির কথা, হাসির কথা, হাসবে লোকে-

হাঃ হাঃ হাঃ, হাসবে লোকে।

তিন.

দুর্নীতি একটা কাঠামোগত সমস্যা। উপরি কাঠামোতে দুর্নীতি বজায় রেখে, নিচে এর সমাধান খুঁজতে চাইলে, তা কেবল রসিকতারই জন্ম দেবে। দুর্নীতি দমনের প্রধানতম উপায় হচ্ছে, শাসন কাঠামোর উঁচু তলাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা। শাসন কাঠামোর উপরিভাগ যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়, দুর্নীতি করলে যদি শাস্তি পায়, এবং দুর্নীতিকে দমন করতে যদি আন্তরিক হয় তবে নিচ কাঠামোতে দুর্নীতি এমনিতেই হাওয়া হয়ে যাবে। আবার দুর্নীতি চালু আছে এমন সমাজের উপরিতলে যে পরিমাণ, যে বিশালায়তনে দুর্নীতি হয়, তাকে সুরক্ষা দিলে, নিচ কাঠামোর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্কের দুর্নীতিকে রোধ করে লাভই বা কী? হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ছেড়ে দিয়ে দু-চারশ টাকার দুর্নীতি ধরার মতো রাবিশ কাজ করলে লোকে তা দেখে হাসবে।

সম্ভবত সে কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে দেওয়া তার ভাষণে শক্তভাবেই বলেছিলেন, ‘আজকে করাপশনের কথা বলতে হয়। এ বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন- আমাদের রাস্তা খুঁড়তে যান- করাপশন। খাদ্য কিনতে যান- করাপশন। জিনিস কিনতে যান- করাপশন। বিদেশ গেলে টাকার ওপর করাপশন। তারা কারা? আমরা যে ৫% শিক্ষিত সমাজ, আমরা হলাম দুনিয়ার সবচেয়ে করাপ্ট পিপল, আর আমরাই করি বক্তৃতা। আমরা লিখি খবরের কাগজে, আমরাই বড়াই করি।...

এই দুঃখী মানুষ যে রক্ত দিয়েছে, স্বাধীনতা এনেছে, তাদের রক্তে বিদেশ থেকে খাবার আনবো সেই খাবার চুরি করে খাবে, অর্থ আনবো চুরি করে খাবে, টাকা আনবো তা বিদেশে চালান দেবে। বাংলার মাটি থেকে এদের উৎখাত করতে হবে’। [তথ্যসূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; জীবন ও রাজনীতি দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা-৮৯০]

চার.

বঙ্গবন্ধু যে দুর্নীতিবাজদের উৎখাত করতে চেয়েছিলেন তাঁর সেই কাজ অসমাপ্ত থেকে গেছে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিটি সরকার এরপর ঘোষণা দিয়েছেন বটে, অনেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাও করেছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নাই। বরং দু’দক অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধপক্ষকে দমন করতে উৎসাহিত হয়েছে।

এখন অর্থমন্ত্রী যতই দুর্নীতি বিরোধী বাণী দিন না কেন তাতে কাজ হবে না। কেননা পাওয়ার হাউস থেকে দুর্নীতি বের করা না গেলে অপরাপর জায়গা থেকে দুর্নীতি উৎখাত করা সহজ হবে না। আর বৃহত্তম দুর্নীতি করে যে ৫% মানুষ , সেই ক্ষমতাবান অংশকে নিস্ক্রিয় করতে না পারলে দুর্নীতি দুর করার এই কাজ কাগজে কলমে থাকবে বটে বাস্তবে তার দেখা মিলবে না। দুর্নীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর যে আর্তনাদ, যে আহাজারি, সেই দিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। দুর্নীতিরোধের জন্য একটা যুগোপযোগী পদ্ধতি তৈরি করতে হবে আর সমাজের ওপরতলার মানুষকে দায়মুক্তি দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরুতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ