সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার ইতি

Send
কাজী জাহিন হাসান
প্রকাশিত : ১৭:০২, আগস্ট ১৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৮, আগস্ট ১৯, ২০১৭

কাজী জাহিন হাসানপৃথিবী উষ্ণ হয়ে উঠছে। অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, চলতি শতাব্দীর শেষে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি জেলা স্থায়ীভাবে পানির নিচে তলিয়ে যাবে। ওই জেলাগুলোর কৃষি জমি হারিয়ে যাবে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান ওয়েবসাইটে রবার্ট গ্লেনন ‘দ্য আনফোল্ডিং ট্র্যাজেডি অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ’ (জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দুর্যোগ) শিরোনামের নিবন্ধে লিখেছেন, ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা তিন ফুট বৃদ্ধি পেলে পুরো দেশের প্রায় ২০ শতাংশ তলিয়ে যাবে এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে। অনেক বিজ্ঞানী আশঙ্কা করছেন, ২১০০ সালের দিকের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পাঁচ থেকে ছয় ফুট বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে করে ৫ কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে...। এরই মধ্যে সমুদ্রের পানি ভূ-গর্ভে প্রবেশ করে উপকূলে অঞ্চলের খাবার পানির সরবরাহকে বিষাক্ত করে ফেলেছে। উর্বরতা হ্রাস কৃষি জমির অবদমন ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে’।
যখন কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে ফেলবে, কাজের সন্ধানে তারা নতুন শহরে ভিড় করবে। শহরগুলোকে কোটি অভিবাসীকে স্থান দেওয়ার জন্য বিস্তৃত করতে হবে। এতে করে আরও কৃষি জমির পরিমাণ কমে আসবে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশকে পুরোপুরি আমদানি করা খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এখন আর দীর্ঘমেয়াদে বাস্তব সম্মত কোনও লক্ষ্য নয়। এরচেয়ে বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ হতে পারে শিল্পে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যাতে করে দরিদ্ররা কাজ পাবে এবং আমদানি করা চাল কিনতে সক্ষম হবে। এমনটি সম্ভব কিন্তু এজন্য সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে লাখ লাখ অভিবাসীর জায়গা হবে না। সাধারণত সারাদেশ থেকে অভিবাসীরা এই দুই শহরে আসছে। ঢাকা শহরের বস্তিগুলো বসবাসের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়েছে। বস্তিগুলো বেশিরভাগই শহরের নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত। যা প্রায়ই বৃষ্টির পানিতে বন্যা ও পয়ঃনিষ্কাশনের ময়লা পানিতে তলিয়ে যায়। চট্টগ্রাম এরইমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষের বিপজ্জনক ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই দুই শহরে অপরিকল্পিত বিস্তার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সৌভাগ্যের বিষয় হলো অভিবাসীদের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামের বিকল্প গন্তব্য তৈরির জন্য প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব অঞ্চল শিল্পনগরীতে পরিণত হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পাশের শহর ও গ্রামে বিনিয়োগ করে সরকার প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে উৎসাহ জোগাতে পারে। এসইজেডগুলোতে কর্মসংস্থান হওয়া মানুষের সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিচারক আদালত প্রয়োজন হবে।  সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশন, রেল ও বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবস্থাতো অত্যাবশ্যকভাবে প্রয়োজনীয়। সরকার যদি এসব খাতে বিনিয়োগ করে তাহলে প্রতিটি এসইজেডের পাশে একটি পরিকল্পিত শিল্পনগরী সহজেই গড়ে উঠবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে প্রায় ৫ কোটি অভিবাসী তৈরি হতে পারে। ফলে আমাদের অন্তত ২০টি শিল্পনগরী গড়ে তুলতে হবে। যেগুলোতে বাড়ি ও কর্মসংস্থান মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষ বাস করতে পারবে। এই ২০টি শিল্পনগরীর অবকাঠামো খাতে সরকারকে অন্তত দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে পারবে। সৌভাগ্যের কথা, সরকার জীবাশ্ম জ্বালানিতে (তেল, গ্যাস ও কয়লা) করারোপ করেই এই অর্থায়ন করতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ফলে এই জ্বালানিতে করারোপ করে সৃষ্ট মোকাবিলা করা যুক্তি সংগত হবে।

শিল্পনগরী গড়ে তোলার অর্থ শুধু ভবন অবকাঠামো নির্মাণ করা নয়। নতুন এইসব শহরে কারখানা গড়ে তুলতে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। প্রতিটি কারখানা স্থাপনে গড়ে ২০ লাখ ডলার হিসেবে ধরলে দশ হাজার কারখানা গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হলো বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সুযোগ দেওয়া। এর ফলে ব্যাংকগুলো কারখানা নির্মাণে কম সুদে ঋণ দিতে পারবে। (বিদেশ থেকে সাধারণত কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়)। অতীতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছিল। অন্যান্য দেশগুলোতে পরিবর্তন ও ভাসমান মুদ্র রয়েছে যা বিদেশ থেকে বড় অংকের বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করে। এখন সময় হয়েছে টাকাকে মুক্ত ভাসমান মুদ্রায় রূপান্তরিত করা এবং পূঁজিতে রূপান্তর করার (ট্রান্সফার টু এসেট) সুযোগ তৈরি করা। এতে করে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোকে বড় অংকের অর্থ ঋণ দিতে আত্মবিশ্বাস পাবে।

বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে অনুমোদন দেওয়া উচিত। ব্যাপক জালিয়াতি ও ঋণ খেলাপি প্রমাণ করেছে সরকারি ব্যাংকগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে এসব সরকারি ব্যাংকের ঋণ বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ রাখা উচিত হবে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলোকেই সরকারি ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া উচিত।

শিল্প নগরী স্থাপনের পর এবং বাংলাদেশের নতুন কারখানায় বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পর জমি হারানো মানুষেরা স্বাভাবিকভাবেই নতুন এসব নগরে কর্মসংস্থানের জন্য ছুটবে। বাংলাদেশ সফলভাবে একটি শিল্প অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। অনাহার দূর করা তখন একেবারে সহজসাধ্য হয়ে যাবে। কারণ ন্যূনতম মজুরি দিয়ে নিশ্চিত করা হবে শ্রমিক পরিবারগুলো যেন আমদানি করা চাল কিনতে পারে।

লেখক: চেয়ারম্যান, টু-এ মিডিয়া লিমিটেড।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ