একজন লর্ড কারলাইল: বিএনপির নতুন দুরভিসন্ধি!

Send
আশরাফ সিদ্দিকী বিটু
প্রকাশিত : ১৪:২৯, মার্চ ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৪, মার্চ ২৮, ২০১৮

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছরের জেল হয়েছে। তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামিদের ১০ বছর সাজা হয়েছে এবং প্রত্যেককে ২ কোটির বেশি টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। বেগম জিয়া এখন কারাগারে। ২৭ বছর আগের এতিমদের জন্য টাকা আনা হয়। ২০০৮ সালে ১/১১-এর সরকারের সময় এই মামলা হয় এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেই মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। বিএনপির আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে বিএনপি নেত্রীর জামিনের জন্য আবেদন করেছেন। বিষয়টি এখন আদালতের এখতিয়ার। বিএনপি নেত্রীকে হাইকোর্ট জামিন দিলেও আপিল বিভাগ তা স্থগিত করেছেন। সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার আপিল ও জামিন আবেদন করা নিয়ে আইনজীবীদের ত্রুটির অভিযোগ রয়েছে। তার দলের আইনজীবীদের মধ্য থেকেই এ অভিযোগ করা হয়। যদিও জ্যেষ্ঠ ১০ আইনজীবীকে নিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেল এসব আবেদন প্রস্তুত করেন। আপিল বিভাগ দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি গ্রহণ করে জামিন স্থগিত করেন। আইনি প্রক্রিয়ায় এর সুরাহা হবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কোনও সুযোগ এখানে নেই। বক্তৃতা বিবৃতি বা এসবের মাধ্যমে আদালতকে চাপ প্রয়োগ করে এখানে জামিন পাওয়া সম্ভব নয়।

বিএনপি নেত্রীকে আইনি সহায়তা দিতে বিদেশি আইনজীবীর পরামর্শ চাইতে যাচ্ছে বিএনপি। ২০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলায় তার আইনজীবী প্যানেলকে আইনি পরামর্শ দিতে যুক্ত হয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইল। এই লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ প্রদান নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া গণমাধ্যমে এসেছে। এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বিদেশি আইনজীবীর কোনও প্রয়োজন নেই।’ বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘লর্ড কারলাইলের নিয়োগের বিষয়ে দলের আইনজীবীদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি। এটি শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। যতটুকু জানি, লর্ড কারলাইল মামলা পরিচালনা করবেন না। শুধু আইনি পরামর্শ দেবেন।’ অন্যদিকে ফখরুল সাহেব বলেছেন, লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আরেক নেতা বলেছেন, লর্ড কারলাইলকে পেয়ে তারা আনন্দিত। অর্থাৎ খোদ বিএনপিতেই এ নিয়ে মতানৈক্য!

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিদেশি কোনও আইনজীবীকে দেশের কোনও আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানিতে অংশ নিতে হলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। তবে আইনি পরামর্শ দিতে কোনও সমস্যা নেই। মামলা পরিচালনার প্রথম শর্তই হলো আইনজীবীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। লর্ড কারলাইল বিদেশি হওয়ায় তার সেই সুযোগ নেই। তবে তিনি চাইলে মামলার বিষয়ে মতামত দিতে পারবেন।

কিন্তু কথা হলো, কেন লর্ড কারলাইল?  বাংলাদেশে তাকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে তার কর্মকাণ্ডের জন্য। সে প্রসঙ্গে এখানে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারলাইল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের সদস্য, পোল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত ইহুদি আইনজীবী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে জামায়াতের লবিস্ট হিসেবে বিচার কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রথম প্রশ্ন তোলেন কারলাইল। লর্ড কারলাইল বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কঠোর সমালোচক। জামায়াত নেতাদের বিচার ঠেকাতে ২০১২ সাল থেকেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ঠেকাতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠিও লেখেন তিনি।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের ৮ মার্চ জামায়াত নেতা যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখার পর লর্ড কারলাইল বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। এতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এবং ওই আদালতের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার সুপারিশ করেন। আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর না করার দাবিতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন এই আইনজীবী। জেনেভার ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশন ফর হিউম্যান রাইটসের হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই বরাবর লিখিত এক চিঠিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপও চেয়েছিলেন লর্ড কারলাইল। মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সাকা চৌধুরীরও লবিস্ট হিসেবে কাজ করেন তিনি। এমনকি ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলেন লর্ড কারলাইল।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ২০১৭-এর জুলাই মাসে লন্ডনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপের আয়োজনও করে একটি সংগঠন। তবে লন্ডনে যাওয়ার পর আয়োজক সংগঠনের নেপথ্যে কারলাইলের পরিচয় প্রকাশ পেলে আওয়ামী লীগের নেতারা তাতে যোগদান দেননি। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা যোগ দিয়েছিলেন।

অবশ্য এ বিষয়ে লর্ড কারলাইলের বিবৃতি ২৪ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যা বলেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ২০১৬ সালে যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের ফাঁসির রায় হওয়ার পর বিবৃতি দিয়ে বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছিলেন কারলাইল। কেন তিনি এটা করেছিলেন। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেখানে যুদ্ধাপরাধের মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেখানে কেন তিনি যুক্ত হলেন বা তিনি কেন উৎসাহী হলেন, এর পেছনে কী উদ্দেশ্য, এসব নিয়ে কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারবেন না বলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্তর্জাতিক মানসম্মতই হয়েছে, এ নিয়ে কোনও দ্বিধা বা শঙ্কা নেই। বরং অনেক দেশ এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশকে ফলো করতে চাচ্ছে তা আগেই উল্লেখ করেছি।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের অবদান কেউ ভুলে যায়নি। সে সময় ব্রিটেনের পার্লামেন্টে একাত্তরের গণহত্যার নিন্দা করা হয়েছিল। অনেক আইন প্রণেতা মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার নিন্দাজ্ঞাপন করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার নিন্দা করেছে। ব্রিটেনের গণমাধ্যম ও সেদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পক্ষে ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইংল্যান্ড হয়েই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।  এসব হয়তো কারলাইল জানেন না। নাকি অর্থই তার কাছে মুখ্য কিংবা বর্তমান সরকার তার পছন্দের নয়। জামায়াতের পর দুর্নীতিবাজ খালেদার জন্য তার দরদ প্রশ্নহীন হতে পারে না। এতে মানুষের মনে বিরূপ মনোভাব জন্মানোই স্বাভাবিক।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাদের দলীয় নেতাও বটে। লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেওয়ায় প্রমাণিত হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরে একে অপরের প্রতি এবং দলীয় আইনজীবীদের প্রতি দলের আস্থার সংকট রয়েছে।

লর্ড কারলাইল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছেন- এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। দেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেই ব্যক্তিকেই আমাদের স্বাধীনতা মাস, মার্চ মাসে আইনি পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে  প্রশ্নবিদ্ধ করার অশুভ উদ্দেশ্য বিএনপির থাকতেই পারে। এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটা পরিষ্কার, বিএনপি-জামায়াতের আদর্শ একই এবং তা হলো স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষেই, সেই অপশক্তির সাথেই সখ্য। বিএনপি-জামায়াত হলো একে অন্যের। এই বিএনপিই সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি চেয়েছে। রায়কে ঘিরে সহিংসতা করেছে।

লর্ড কারলাইল বিতর্ক বিএনপি নেতৃবৃন্দ ইচ্ছাকৃতভাবে করছে কিনা সে প্রশ্ন আসতেই পারে। তারা আসলেই বেগম জিয়ার মুক্তি চান কিনা সেটা নিয়ে কিন্তু জনমনে প্রশ্ন জাগা অবান্তর নয়। স্বাধীনতার মাসে বিএনপির এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের আইনজীবীকে পরামর্শক নিয়োগ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ভয়াবহ বেইমানি। বিএনপির এই পদক্ষেপ গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। কারণ, এই পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। দেশের বিচার ব্যবস্থাকে হেয় করতে রাজনৈতিকভাবে এই নিয়োগ প্রদান করা হয়ে থাকতে পারে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার জন্য লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে তুললেই কী বেগম জিয়া সাজা পাবে না বা এতিমের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণিত হবে? আসলে বিএনপি নেতাদের এহেন বক্তব্য দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছু নয়! তাই যে ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করতে পারে, জামায়াতের নেতার জন্য বিবৃতি দিতে পারে তাকে আইনি পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে বিএনপি আদতে এটাই প্রমাণ করল, এই যুদ্ধাপরাধী জামায়াতচক্রই তাদের আপন, আত্মার আত্মীয় এবং এদের নিয়েই তারা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও রাজনীতি করবে– যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। আসলে কয়লা ধুলে যে ময়লা যায় না তা বিএনপি আবারও প্রমাণ করলো।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ