অদ্ভুত আঁধারে কেবল শেয়ালের হুয়া

Send
শেগুফতা শারমিন
প্রকাশিত : ১৪:২৭, এপ্রিল ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, এপ্রিল ০৬, ২০১৮

শেগুফতা শারমিন‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি চোখে দেখে তারা’
যুগে যুগেই কি পৃথিবী মুড়ে থাকলো এই অদ্ভুত আঁধারে? তা না হলে সেই আশি নব্বই বছর আগের আঁধার দেখে যে কবি অনুতাপ করে গেলেন, সেই আঁধার কেন এখনো কাটে না? আঁধারে ভরে যায় চারদিক। আঁধারে চোখ নিভে আসে। অথচ একই সঙ্গে চলে নানারূপী অন্ধের অদ্ভুত দৃশ্যমানতা! উভয়েরই অদ্ভুত প্রতিযোগিতা, জিতে থাকার। ঠিক হোক বা ভুল—এরা জিতে থাকবেই থাকবে। একদল প্রতিনিয়ত থামিয়ে দিতে চেয়েছে আমাদের বেড়ে ওঠা, আমাদের কথা বলা। মাথায় ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে মৃত্যুর খড়গ। কথা বলার কারণে এদেশে খুন হয়ে গেছেন হুমায়ুন আজাদ। কথা বলায় সাহস হারাতে বসেছে প্রজন্ম। এক অর্থে জিতে গিয়েছে মৌলবাদী জঙ্গি সমাজ। এর সাথে সাথে কথা বলতে বাধা দিতে শিখেছে রাষ্ট্রযন্ত্র। রাষ্ট্রের কাছে হারতে বসেছে জনগণ। আর কথা বলা বন্ধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সবকিছুকে গুলিয়ে ফেলছে আরেক দল। পান থেকে চুনটি খসার অপেক্ষায় ওঁত পেতে বসে থাকা এই দল, কারণে অকারণে নিজস্ব সংজ্ঞায়, নিজস্ব ব্যাখ্যায় সবকিছু সাধারণীকরণ করে ফেলে। নিজেদের পাল্লায় মেপে মেপে মত দিয়ে দেয়, ওমুকের কথাতে ভুল, সুতরাং কথা বলা বন্ধ।

সব বিষয়ের বিরুদ্ধে যেতে নেই। তাহলে ঠগ বাছতে গা উজাড় হয়। প্রতিবাদ হবে, বিক্ষোভ হবে, হবে বিরুদ্ধাচরণ। এর সাথে কোনও দ্বিমত নেই। অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে সবাইকে শত্রু বানিয়ে বসলে, সবাইকে মূর্খ ভাবতে শেখালে, সবাইকে অপরাধী করে ফেললে, শেষদানে আসলে পরাজিত হবে কে? আজ  যার পক্ষে থাকি, কাল তার বিরুদ্ধে। পরশু আবার মিলে যাবে ভাইয়ে ভাই। মাঝখানে বিরুদ্ধাচরণকালে তৈরি হবে ঘৃণা। ভালোবাসার চেয়ে তীব্রগতিতে ঘৃণা ছড়ায় চারদিকে। ঘৃণায় সাথে বেড়ে চলে অবিশ্বাস। অবিশ্বাসে অবিশ্বাসে শেষ হয়ে যায় সমাজ। কোথাও কোন ভ্রূক্ষেপ হয় না। কারো কিছু যায় আসে। লাভের মধ্যে লাভ হয় সোসাল মিডিয়ার লাইক কমেন্ট!

বড়ই হাস্যকর, বড়ই অনুতাপের এই সামাজিক যোগাযোগ। প্রতিনিয়ত মানুষের পরস্পরবিরোধী মুখোশ উন্মোচন করে দেয় মুখবই। আবার এই সোশ্যাল মিডিয়াই মানুষকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলার হাতিয়ার যেন। আজকে যাকে কাছে টানছি, কালকে তাকেই ছিঁড়ে ফেলছি। পরশু আবার সেই যেন পরম প্রিয়। প্রতিনিয়ত অবস্থান বদলে ফেলছে মানুষ। প্রকাশ পাচ্ছে তার পরস্পরবিরোধী দৈতসত্তা, দ্বিমুখী অবস্থান। জোয়ার ভাটার মতো ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান বদলে যাওয়া দেখার নিদারুণ মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগ। কারো গভীরে যেতে হয় না, সঠিকভাবে ভাবতে হয় না। শুধু নির্দিষ্ট নিজস্ব কি ওয়ার্ডে ধরা পড়লেই হলো। মানুষ লাফিয়ে উঠবে। খামচে ধরবে। রক্তাক্ত করবে,কিবোর্ডে কিবোর্ডে।

এই অদ্ভুত আঁধারে চোখে দেখা অন্ধের দল,আসানসোলের ইমাম ইমদাদুল রাশিদির পিঠে ভারতীয় মিডিয়ার বাহবার বহর দেখে মারহাবা মারহাবা বলে যাবে। এসব অন্ধের চোখে পড়ে না এর পিছনের রাজনীতি, চোখে পড়ে না সংখ্যালঘুর সীমাহীন সীমাবদ্ধতা। সীমাহীন বেদনার মুখে পড়েও মেনে নিতে হয়, মাফ করে দিতে হয় কেবল সংখ্যালঘুদেরই। মহত্ত্বের চেয়েও এখানে বড় হয়ে ওঠে পরাধীনতা।

অন্ধরা হুক্কার সাথে হুয়া রব করে ওঠে। স্বাধীন অন্ধরা টের পায় না ইমদাদুলের বেদনা। উল্টো মারহাবায় একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়  সেদেশের সংখ্যাগুরুর কাতারে। অদ্ভুত আঁধারে চোখে দেখা পেঁচার দলের সঠিক উপলব্ধি, সঠিক ডি কোডিংয়ের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রে। অথচ কত বড় বিষয় গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে একই সময়কালে। একদিকে জঙ্গিবাদের অস্ত্র গলা কেটে ফেলে। আরেকদিকে টুঁটি চেপে ধরে প্রগতির পতাকাধারীরা। যার যার অবস্থানে কঠিন, কঠোর, মৌলবাদী। কেউ কোন বিতর্কে রাজি না। যুক্তি শোনার ধার ধারে না। যার যার মৌলবাদী অবস্থান থেকে রায় ঘোষণা করে বসে থাকে।

মাঝখান দিয়ে কথা বলতে ভুলে যায় তারা,এবং সংখ্যাটা বাড়তে থাকে। সংখ্যা বাড়ে তাদের যারা কথা বলা ভুলে যায়। সংখ্যায় বাড়ে তারা যারা মৌলবাদে বিশ্বাস করে,তা অন্ধকারের হোক বা অতিরিক্ত আলোর। মাঝখান দিয়ে করুণভাবে সত্য হয়ে যান, জীবনানন্দ দাশ।

“যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ  তাদের হৃদয়।”

লেখক: উন্নয়নকর্মী

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ