কেমন আছে ঢাকা উত্তর?

Send
সাইফুল হাসান
প্রকাশিত : ১৩:২৬, জুন ০১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৬, জুন ০১, ২০১৮

সাইফুল হাসানমিরপুরে যে এলাকায় থাকি, তার চারপাশের রাস্তাগুলোয় ভীষণ খোঁড়াখুঁড়ি। কোনও কোনোটি কেটে ফেলে রাখা হয়েছে অনেক দিন। অবস্থা এমন, ঘর থেকে বেরুনোই দায়। এর সঙ্গে বৃষ্টি-কাদা মিলে রাস্তাগুলো নরকে পরিণত হয়েছে। দুর্ভোগ ক্রমাগত নাগরিক হতাশায় রূপ নিচ্ছে।

এই চিত্র কমবেশি পুরো ঢাকাজুড়েই চলছে। মে-জুন মাসে সড়ক কাটাকাটির এই প্রবণতা কোনও দিন থামবে বলে মনে হয় না। নতুন পুরাতন সড়কের কোনও বাছবিচার নেই। যার যেমন ইচ্ছে তেমন কাটছে বা খুঁড়ছে। অভিভাবকহীন এই শহরের নাগরিকরাও অতিথির মতো। ফলে দুর্ভোগ-দুর্গতি অনেকটা নিয়তিই বলে মেনে নিচ্ছে নগরবাসী। কেননা, তাদের অভিযোগ-আবদার শোনার কেউ নেই এই শহরে।
প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক চলে গেছেন প্রায় ছয় মাস হয়ে গেলো। আনিসুল হক বিশ্বাস করতেন নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই শহর বদলে ফেলা সম্ভব। এই বিশ্বাস তিনি নাগরিকদের মধ্যেও ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ফলে মাত্র আড়াই বছরে তিনি এমন সব কাজের সাহস করেছিলেন, যা আগে কোনও দিন কেউ চিন্তাও করেনি। তিনি সমস্যার মুখোমুখি হতেন। চেষ্টা করতেন সমাধানের। ব্যর্থ হলে দুঃখ প্রকাশ করতেন। তবে হাল ছাড়তেন না, লেগে থাকতেন।
একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমছে। প্রধান ও পার্শ্ববর্তী সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। অলিগলির সড়কগুলো ভাঙা, কাটা, খুঁড়ে রাখা- যেন কারও প্রতিহিংসার শিকার। মশার আক্রমণ বাড়ছেই। ড্রেনগুলো উপচে পড়ছে ময়লায়। রাস্তায় গাড়ি আসলে চলে না, বরং হাঁটে। মানুষের হাঁটার গতি গাড়ির গতির চেয়ে বেশি কোনও কোনও ক্ষেত্রে। এসব নিয়েই আছে ঢাকা উত্তরের নাগরিকরা। আনিসুল হক থাকতেও এসব সমস্যা ছিল, কিন্তু তা সমাধানের দৃশ্যমান অগ্রগতিও ছিল। তখন সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অস্তিত্ব বোঝা যেতো। এখন যায় না।

রাস্তাগুলোর অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ। নাগরিকদের বেশিরভাগ অভিযোগও রাস্তা নিয়েই। কেউ জানে না এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়? প্রয়াত মেয়র ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'শুষ্ক মৌসুমে সড়ক খনন হবে'। তিনি নিজে সমন্বয়ের কাজটি করতেন। জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্বের কারণে সরকারের অন্য সংস্থাগুলোও তাকে সমীহ করে চলতো। ফলে প্রকল্পে একটা গতি থাকতো। সেটাই এখন অনুপস্থিত। বেশিরভাগ সড়ক কাটছে ওয়াসা, কিন্তু জনগণের গালি খাচ্ছে সিটি করপোরেশন।
'ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই, উন্নয়নশীল, পরিবেশবান্ধব, সৃষ্টিশীল শহর নির্মাণ ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই'-এই ছিল আনিসুল হকের ভাবনা। সেই শহর পুনরায় ধীরে ধীরে হতচ্ছাড়া চেহারা নিচ্ছে। নোংরা, আবর্জনা, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ফিরে আসছে ঢাকা উত্তরের শরীরে। ট্রাক লরির স্ট্যান্ড হতে যাচ্ছে সাতরাস্তা সংলগ্ন আনিসুল হক সড়ক। প্রায় পুরো রাস্তা ট্রাক লরির দখলে যাওয়ার পথে। অথচ তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড অপসারণে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড পুরোপুরি আগের চেহারায়। গাবতলীর অবস্থা সহনীয়, তবে আগের অবস্থায় যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
ইউ ল্যুপে অগ্রগতি নেই। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, একজন কর্মকর্তা এখনও লেগে আছেন ইউ ল্যুপ বাস্তবায়নে। কিন্তু ডিএনসিসির ভেতর থেকে খুব একটা সমর্থন পাচ্ছেন না। ইশতেহারে ছিল, 'শহর বিনির্মাণের দর্শন হচ্ছে সবার জন্য মানবিক ঢাকা। যেখানে নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে সবার ওপরে। মানুষের অধিকার হবে সুরক্ষিত'।

ডিএনসিসি এখন কেমন চলছে? জানতে কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোন করেছিলাম। সবাই জানালেন, প্রাত্যহিক কাজ চলছে। কিন্তু নতুন কোনও উদ্যোগ ও উদ্যম নেই। মেয়র চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বহু স্বপ্ন, সাধ, ইচ্ছেও মাটিচাপা পড়েছে। অথচ এসব কাজের সঙ্গে নাগরিক কল্যাণের পাশাপাশি রাজনৈতিক অর্জনেরও অনেক কিছু ছিল। যে কারণে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অব্যাহত সমর্থন পেয়েছিলেন আনিসুল হক। ঘুষ, দুর্নীতি, ইউনিয়নবাজি, কাজ ফাঁকির প্রশ্নে ছিলেন জিরো টলারেন্স। এ সময়ে ডিএনসিসি উৎপাদনশীল, কর্মমুখী, নাগরিকবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
নাগরিক অ্যাপ চালু আছে কিন্তু কোনও ফিডব্যাক নেই। দেয়ালে দেয়ালে চিকা ও পোস্টার ফিরে আসছে। মেয়র মারা যাওয়ার পর একটি পাবলিক টয়লেটও নির্মিত হয়নি। যানজট কমাতে সমন্বিত বাস ব্যবস্থা চালুর যে উদ্যোগ সেটিও বন্ধ। ফুটপাতে অবৈধ দখলদাররা ফিরতে শুরু করেছে। ডিএনসিসি কর্মকর্তারাই জানাচ্ছেন, প্রয়াত মেয়র সব কাজের ফলোআপ করতেন, তাগিদ দিতেন। জনদুর্ভোগ হতে পারে এমন সব প্রকল্পে বিশেষ নজর রাখতেন। কর্মকর্তাদের লাগিয়ে রাখতেন। চাপের মধ্যে রাখতেন ঠিকাদারদের। তার অগ্রাধিকার ছিল নাগরিক সেবা এবং গতিশীল ও স্মার্ট শহর প্রতিষ্ঠা।
একজন কর্মকর্তা জানাচ্ছিলেন, 'প্রয়াত মেয়র যেসব কাজ ডিএনসিসির এজেন্ডাভুক্ত করেছিলেন সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা আছে। তবে, ব্যক্তিভাবেও তিনি অনেক এজেন্ডা নিয়েছিলেন। যেমন সমন্বিত বাস প্রকল্প, স্কুলে স্কুলে গাছ বিতরণ, দরিদ্রদের জন্য আবাসন ইত্যাদি। বেঁচে থাকলে, কোনও সন্দেহ নেই ব্যক্তিগত কারিশমা, পরিচিতি ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে এসব করেও ফেলতেন। তিনি ভিশনারি মানুষ, তার সমকক্ষ করপোরেশনে আর কেউ নেই। ফলে এসব এজেন্ডাও থেমে গেছে।'
মেয়রশিপ নিয়ে আনিসুল হকের চিন্তা পরিষ্কার ছিল। যেটি তার ইশতেহারে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘মেয়র বলতে আমি বুঝি, সবশ্রেণির নাগরিকদের সেই প্রতিনিধি, যিনি নাগরিকদের হয়ে শহরে সমতা, কল্যাণ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন'। তার চেষ্টাই ছিল, সচল, সবুজ, নিরাপদ, স্মার্ট এবং অংশগ্রহণমূলক, সুশাসিত ঢাকা গড়ার। সে লক্ষ্যেই কর্মসূচি নিয়েছিলেন। মেয়র পদটিকে আকর্ষণীয় করে গেছেন অন্যদের জন্য। মেয়রদের জন্য এমন একটি মান সেট করে গেছেন, যেখানে পৌঁছানোর কথা খুব কম মানুষই ভাবে।
তিনি চাইতেন নাগরিকদের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। যার মাধ্যমে সব নাগরিক শহর বিনির্মাণে অংশ নেবে। শহরের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হবে। শহরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সাহায্য করবে।
মেয়র নির্বাচনের আগে নগরবাসীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি দিয়েছিলেন প্রয়াত আনিসুল হক। শেষ করতে চাই সেই চিঠির কয়েকটি লাইন দিয়ে….
'এ চিঠি একটি বাড়ির গল্প। প্রতিদিন আমরা মুখোমুখি এ বাড়ির। দেখি বাড়িটির নেই স্নিগ্ধতা, নেই সেই সবুজ। অপরিচ্ছন্ন রুক্ষ এক ইট-কাঠ-পাথরের বাক্স। খাবারে জীবাণু। নেই ভালো টয়লেট, ড্রেন, বর্জ্য ব্যবস্থা কিংবা হাঁটার মতো সহজ পথ। যখন তখন জট, ঠাসাঠাসি, মশা আর মাদকের আক্রমণ। নিরাপত্তাহীনতার ভয়। যে হাওয়া-জল বাঁচিয়ে রাখে আমাদের বাড়ি, তাও দূষিত।

ভালো না বাসলে যেমন সম্পর্ক বাচে না, বাড়ি বাঁচে না, তেমনি নগরও বাঁচে না।
তাই যখন প্রতিদিন এ বাড়ির মতো নগরের মুখোমুখি হই, তখনই বুঝি, এ নগরে আজ যা সমস্যা, তা অন্য কারো নয়। অন্য কেউ এসে ঠিকও করে দেবে না। এ সমস্যা আমাদের, এর সমাধানও আমাদেরই হাতে। দাঁড়াতেই হবে আমাদের। যেমন দাঁড়ায় মর্যাদাবান মানুষ ভালোর জন্য, প্রিয়জনের জন্য।'
আমরা কি দাঁড়াবো না আমাদের প্রিয় শহরের জন্য? যেমন দাঁড়িয়েছিলেন আনিসুল হক। না কি খুবলে খাওয়া সড়ক, যানজট, বিশৃঙ্খলা, অমানবিকতা, জনদুর্ভোগ নিয়তি বলে মেনে নেবো?

সাংবাদিক
[email protected]

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X